শাহজালালে ঝুঁকিতে উড়োজাহাজ

রাডার ভেহিক্যাল ট্র্যাকিং সিস্টেম মানছে না এয়ারলাইনসগুলো

কবিতা
কবিতা

রাডার ভেহিক্যাল ট্র্যাকিং সিস্টেম মানছে না এয়ারলাইনসগুলো

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের এয়ারসাইড এলাকায় চলাচলকারী যানবাহনে বাধ্যতামূলকভাবে ব্যবহৃত রাডার ভেহিক্যাল ট্র্যাকিং সিস্টেম (ভিটিএস) ব্যবহার না করায় ঝুঁকিতে ওঠানামা করছে উড়োজাহাজ। বিভিন্ন এয়ারলাইনস ও সেবা সংস্থার এসব যানবাহনে ভিটিএস না থাকায় বাড়ছে দুর্ঘটনার আশঙ্কা।

তবে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) বলছে, সম্প্রতি ভিটিএস স্থাপনের নির্দেশনা জোরদার করেছে তারা। সংস্থাটি জানিয়েছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্দেশনা বাস্তবায়ন না হওয়ায় সংশ্লিষ্টদের আবার সতর্ক করে দ্বিতীয় দফায় চিঠি দেওয়া হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

বেবিচক জানায়, বিমানবন্দরের রানওয়ে, ট্যাক্সিওয়ে ও অ্যাপ্রোন এলাকায় চলাচলকারী যানবাহনের অবস্থান, গতি ও গতিপথ কেন্দ্রীয়ভাবে পর্যবেক্ষণের জন্য ভিটিএস স্থাপন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। প্রথম দফায় গত ১৫ জানুয়ারির মধ্যে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে বলা হলেও অধিকাংশ সংস্থা তা বাস্তবায়ন করেনি। এরপর গত ২০ মে বেবিচক আবার নতুন আরেকটি চিঠি ইস্যু করে। সেখানে বিভিন্ন এয়ারলাইনস ও অন্যান্য সংস্থার যানবাহনে আগামী ১৫ জুনের মধ্যে প্রয়োজনীয় তথ্য ও কার্যক্রম সম্পন্ন করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়। এছাড়া সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, ভিটিএস না থাকার কারণে কোনো ধরনের দুর্ঘটনা বা নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হলে সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও অপারেটরদেরই দায় বহন করতে হবে।

জানা গেছে, বিমানবন্দরের সংরক্ষিত এয়ারসাইড এলাকায় প্রতিদিন বেশকিছু সংখ্যক গাড়ি চলাচল করলেও সেগুলোর বড় অংশ এখনো আধুনিক নজরদারি ব্যবস্থার বাইরে রয়েছে। বিমানবন্দরের রানওয়ে, ট্যাক্সিওয়ে ও অ্যাপ্রোন এলাকায় প্রতিদিন বেশকিছু গাড়ি যাতায়াত করে, যা বিমান চলাচলের জন্য বিপজ্জনক। ট্র্যাকিং সিস্টেম না থাকায় এসব গাড়ির গতিবিধি রাডার শনাক্ত করতে পারে না, যে কারণে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

বেবিচকের কর্মকর্তারা বলছেন, ভিটিএস চালু হলে এয়ারসাইড এলাকায় চলাচলকারী প্রতিটি অনুমোদিত যানবাহনের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে সরাসরি দেখা যাবে। কোনো গাড়ি নির্ধারিত রুট থেকে বিচ্যুত হলে, অননুমোদিত এলাকায় প্রবেশ করলে কিংবা রানওয়ের ঝুঁকিপূর্ণ অংশে চলে গেলে সঙ্গে সঙ্গে সতর্কবার্তা দেওয়া সম্ভব হবে।

বেবিচক সূত্র জানায়, এয়ারলাইনস, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং প্রতিষ্ঠান, কার্গো অপারেটর, ক্যাটারিং সেবা সংস্থা এবং বিমানবন্দরের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোকে তাদের ব্যবহৃত যানবাহনে ভিটিএস স্থাপনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সিএনএস-এটিএম ব্যবস্থার আওতায় এয়ারসাইড ও অ্যাপ্রোন এলাকার যানবাহনকে কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার কাজ চলমান রয়েছে।

সূত্র জানায়, দীর্ঘ ৫৫ বছরেও এ অবস্থার উন্নতি করতে পারেনি বেবিচক। এছাড়া ভিটিএস স্থাপনের নির্দেশনা মানছে না অধিকাংশ এয়ারলাইনস ও সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান। নির্ধারিত সময় পার হলেও কোনো প্রতিষ্ঠান তাদের ব্যবহৃত যানবাহনে ভিটিএস স্থাপনের পূর্ণাঙ্গ তথ্য বেবিচকের কাছে জমা দেয়নি। ফলে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দরের নিরাপত্তাব্যবস্থায় ঘাটতি থেকে যাচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বেবিচকের সদস্য এয়ার কমডোর মো. নূর-ই-আলম (এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট) আমার দেশকে বলেন, বিশ্বের আধুনিক বিমানবন্দরগুলোয় এ ধরনের প্রযুক্তি বহু বছর ধরে ব্যবহার হচ্ছে। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ভিটিএস চালু হলে এয়ারসাইড এলাকায় চলাচলকারী সব অনুমোদিত যানবাহনকে কেন্দ্রীয়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে। প্রতিটি যানবাহনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা যাবে। এতে আধুনিক নিয়ন্ত্রণ টাওয়ারের পূর্ণ সক্ষমতা ব্যবহার করা যাবে এবং বিমান ওঠানামার নিরাপত্তা আরো জোরালো হবে।

বিমানবন্দরসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভিটিএস না থাকায় অতীতে একাধিক দুর্ঘটনা ঘটেছে। গত বছরের নভেম্বরে একটি পুশকার্টের ধাক্কায় এয়ার ইন্ডিয়ার একটি উড়োজাহাজের নোজ হুইল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ওই ঘটনার কারণে বিমান সংস্থাটির একটি ফ্লাইট বাতিল করতে হয়েছিল। ২০২২ সালে বিমান বাংলাদেশের হ্যাঙ্গার থেকে একটি বোয়িং-৭৩৭ বের করার সময় সেটি সেখানে অবস্থানরত আরেকটি বোয়িং-৭৭৭ উড়োজাহাজকে ধাক্কা দেয়। ওই বছরই ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের একটি ট্রলি বিমান বাংলাদেশের একটি উড়োজাহাজে আঘাত করে। এসব ঘটনায় বড় ক্ষয়ক্ষতি না হলেও সংশ্লিষ্টদের মতে, এ থেকে বিমানবন্দরের গ্রাউন্ড অপারেশনে বিদ্যমান ঝুঁকির স্পষ্ট ইঙ্গিত মেলে।

বেবিচক সূত্র জানায়, শাহজালাল বিমানবন্দরে অ্যাডভান্সড সারফেস মুভমেন্ট গাইডেন্স অ্যান্ড কন্ট্রোল সিস্টেম (এএসএমজিসিএস) এবং ভেহিকেল ট্র্যাকিং সিস্টেম স্থাপন করা হয়েছে। এ প্রযুক্তির মাধ্যমে এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল টাওয়ারে কর্মরত নিয়ন্ত্রকরা রানওয়ে, ট্যাক্সিওয়ে, অ্যাপ্রোন ও সংলগ্ন এলাকায় অবস্থানরত কিংবা চলাচলরত বিমান এবং অন্যান্য যান্ত্রিক যান শনাক্ত করতে পারেন। যাত্রীবাহী উড়োজাহাজে প্রয়োজনীয় শনাক্তকরণ প্রযুক্তি নির্মাণের সময় থেকেই সংযোজিত থাকে। তবে গাড়ি, বাস বা অন্য সেবাযান শনাক্ত করতে সেগুলোর গায়ে বিশেষ ভেহিকেল ট্র্যাকার স্থাপন করতে হয়। ইতোমধ্যে ৮০টি ভেহিকেল ট্র্যাকার ও সংশ্লিষ্ট শনাক্তকরণ ব্যবস্থা সংগ্রহ করা হয়েছে, যা প্রয়োজন অনুযায়ী আরো বাড়ানো সম্ভব।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের মুখপাত্র বোসরা ইসলাম আমার দেশকে বলেছেন, এ সিস্টেম আমাদের গাড়িতে লাগানো হয়েছে অনেক আগেই, অ্যাপ্রোনে তো আছেই, যেগুলো শহরের মধ্যে চলাচল করে সেগুলোয়ও লাগানো আছে।

অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহেদুল আলম বলেন, রানওয়ে, ট্যাক্সিওয়ে ও অ্যাপ্রোনের মতো সংবেদনশীল এলাকায় প্রতিটি যানবাহনকে প্রযুক্তিনির্ভর পর্যবেক্ষণের আওতায় আনা অত্যন্ত জরুরি। আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার (আইকাও) নিরাপত্তা মান অনুযায়ী আধুনিক বিমানবন্দরে এ ধরনের ব্যবস্থা অপরিহার্য। গ্রাউন্ড সাপোর্ট যানবাহনের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঝুঁকিও বাড়ছে। তাই তাৎক্ষণিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা না থাকলে বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা থেকেই যায়।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...