ডালে ডালে ছেয়ে গেছে সোনালু ফুল। রোদের আলো পড়তেই চকচক করে ওঠে গাছগুলো। দূর থেকে তাকালে সহজেই চোখ আটকে যাবে যে কারো। গ্রীষ্মের আগমনে ক্যাম্পাসজুড়ে সোনালু ফুল তার সবটুকু সৌন্দর্য ছড়িয়ে দিয়েছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠের পূর্বাংশে এই সোনালু গাছগুলোর অবস্থান। বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাকেন্দ্রের সীমানাপ্রাচীর ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা এই গাছগুলো এখন নবীন শিক্ষার্থীদের কাছে প্রিয় জায়গা। এখানে একই সঙ্গে খোলা সবুজ প্রকৃতি ও পাহাড়ের দেখা মেলে।
সরেজমিনে দেখা যায়, ভোরের আলো ফুটতেই ক্যাম্পাসের এই সড়কজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকে হলুদ রঙের ফুল। কোলাহলমুক্ত সেই পরিবেশের স্নিগ্ধতা আঁচড় কাটবে যে কারো মনে। দুপুর পেরোতেই সোনালি আভায় ছেয়ে যায় পুরো সড়ক। ফুলের পাপড়িগুলো সড়কের পাশের ঘাসে পড়ে যেন হলুদ গালিচায় রূপ নেয়।
ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীরা বিকালের শীতল হাওয়া উপভোগ করতে ঘুরতে বের হন এই আঙিনায়। পাহাড়, ঝরনা ও সবুজ প্রকৃতি দেখতে কেউ কেউ পরিবার-পরিজন নিয়ে আসেন। আবার কারো সঙ্গে থাকে প্রিয়জন, কেউবা একা এসে নিজেকেই খুঁজে ফেরেন প্রকৃতির মাঝে। এই সুন্দর মুহূর্তগুলো স্মরণীয় করে রাখতে অনেকেই ফটোগ্রাফি করেন এবং বিভিন্ন ধরনের ছবি তোলেন।
শুধু ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীরাই নন, তাদের অভিভাবক এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও ফুরসত পেলে পরিবার ও স্বজনদের নিয়ে এখানে ঘুরতে আসেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের উঁচুনিচু পাহাড়ি পথ ধরে সামনে এগোলে নজরে পড়ে প্রকৃতির এই অসাধারণ দৃশ্য। ফুলগুলো যেন পাপড়ি মেলে দিয়েছে, যেন অভ্যর্থনা জানাচ্ছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সোনালু ফুলগুলো। এই সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতিদিন ভিড় জমে শত মানুষের।
বিশ্ববিদ্যালয়-সংলগ্ন স্থানীয় বাসিন্দারাও সকালে কিংবা বিকেলে হাঁটতে বের হয়ে কিছু সময় দাঁড়িয়ে উপভোগ করেন ফুলের সৌন্দর্য। আয়তনের দিক থেকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ক্যাম্পাস। এটি দেশের অন্যতম প্রধান ও স্বায়ত্তশাসিত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান। হাটহাজারী উপজেলার ফতেপুর ইউনিয়নের জোবরা গ্রামসংলগ্ন পাহাড়ঘেরা ২ হাজার ৩০০ একর উঁচুনিচু ভূমিতে ১৯৬৬ সালের ১৮ নভেম্বর প্রতিষ্ঠিত হয় বিশ্ববিদ্যালয়টি। বর্তমানে দেশের একমাত্র শাটল ট্রেনভিত্তিক ক্যাম্পাস হিসেবে এর পরিচিতি রয়েছে।
দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় দেশের অন্যতম বৃহৎ এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান। পাহাড়, টিলা ও সবুজে ঘেরা এই বিশ্ববিদ্যালয় কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, বরং জ্ঞান, গবেষণা ও সাংস্কৃতিক বিকাশের এক আদর্শ কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থী নুসরাত সুলতানা বলেন, ‘প্রকৃতির বহুরূপে বারবারই আমরা মুগ্ধ হই। আর সেটা যদি হয় প্রাচ্যের রানি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, তাহলে সেই সৌন্দর্য যেন দ্বিগুণ লাগে। প্রকৃতির রূপ পরিবর্তনের পালাক্রমে গ্রীষ্মের তপ্ত রোদ উপেক্ষা করে চবির কেন্দ্রীয় মাঠের একপাশে সোনালু ফুল তার সৌন্দর্য দিয়ে সবাইকে মুগ্ধ করছে। সারা দিনের ক্লাস ও পরীক্ষার ক্লান্তি দূর করতে সোনালু ফুলের অপরূপ সৌন্দর্যই যথেষ্ট। তাই তো বিকাল হলেই শিক্ষার্থীরা ভিড় জমায় কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে। উদ্দেশ্য, সোনালু ফুলের সঙ্গে সুন্দর কিছু মুহূর্ত ফ্রেমবন্দি করা। সোনালু ফুলের এই সৌন্দর্য হয়তো ঋতুর পরিবর্তনে চলে যাবে, কিন্তু বছরজুড়ে আমাদের হৃদয়ে রয়ে যাবে কিছু সুন্দর স্মৃতি।’
ভোরের আলো ফুটতেই ক্যাম্পাসে ঘুরতে বের হয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান রিফাত। তিনি বলেন, ‘ছোটবেলায় সোনালু ফুল অনেক দেখেছি, তবে কখনো সেভাবে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়নি, বিস্মিতও হইনি। কিন্তু আজ ফজরের নামাজ শেষে কেন্দ্রীয় খেলার মাঠের দিকে হাঁটতে গিয়ে যখন সোনালু ফুলগুলো চোখে পড়ল, তখন মনে হলো যেন হঠাৎ করেই কোনো ফুলের রাজ্যে প্রবেশ করেছি। চারপাশজুড়ে ঝরে থাকা হলুদ আভা এক অদ্ভুত মুগ্ধতায় ভরিয়ে দিচ্ছিল মনকে। কাকতালীয়ভাবে সেদিন আমার জামার রঙও মিশে গিয়েছিল সোনালুর রঙের সঙ্গে, যেন প্রকৃতি নিজেই এক নিঃশব্দ মিলনের আয়োজন করে রেখেছিল।’
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সোহেল রানা বলেন, ‘গ্রীষ্ম এলেই ক্যাম্পাস যেন নতুন এক রূপে সেজে ওঠে সোনালু ফুলের ছোঁয়ায়। হলুদ রঙের ঝরনাধারার মতো ফুটে থাকা ফুলগুলো পথচলতি মানুষকেও কিছুক্ষণ থমকে দাঁড়াতে বাধ্য করে। ব্যস্ত একাডেমিক জীবনের ফাঁকে সোনালুর এই সৌন্দর্য ক্যাম্পাসে এনে দেয় অন্যরকম প্রাণচাঞ্চল্য।’
বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের শিক্ষার্থী রিয়াদ উদ্দিন বলেন, ‘ক্যাম্পাসের সোনালু ফুল এখন শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের কাছে অন্যতম আকর্ষণীয় অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে। প্রতিদিন পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে অনেকেই এখানে ঘুরতে আসেন। প্রকৃতির এই মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্যের মাঝে আনন্দঘন মুহূর্তগুলো স্মরণীয় করে রাখতে ছবি তুলতেও দেখা যায় দর্শনার্থীদের।’
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

