লাবিবের সততা

শারমিন নাহার ঝর্ণা

লাবিবের সততা

যাত্রাবাড়ী শহরের ব্যস্ত মেইন রাস্তার সঙ্গে জামিয়া ইসলামিয়া বাইতুন নূর মাদরাসা। প্রতিদিন সকালে এখানে ভিড় জমে ছোট্ট ছোট্ট মাদরাসার ছাত্র ও পথচারীদের পদচারণায়। তাদের মধ্যেই একজন ছাত্র লাবিব। সে খুব শান্ত স্বভাবের, পড়াশোনায় মনোযোগী এবং সবার প্রিয়।

একদিন সকালবেলা মাদরাসার ক্লাস শুরু হওয়ার কিছুক্ষণ পরেই হঠাৎ করে হইচই শুরু হলো। লাবিবের সহপাঠী হাফেজ রায়হান দৌড়ে এসে কাঁপা-কাঁপা গলায় বলল, ‘আমার তিন হাজার টাকা হারিয়ে গেছে। আমি তো আমার পকেটের ভেতরেই রেখেছিলাম। কোথায় গেল?’

বিজ্ঞাপন

রায়হান টাকাগুলো দিয়েই আজ পরীক্ষার ফি আর কিছু প্রয়োজনীয় বই কিনবে বলে ঠিক করেছিল। তাই সে খুব ভয় আর দুশ্চিন্তায় কেঁদে ফেলল। শিক্ষকরা বিষয়টি শুনে ক্লাসের সবাইকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমাদের কেউ কি টাকা দেখেছ বা পেয়েছ? ভুলবশত পেলেও জানিয়ে দেবে। এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ রায়হানের কাছে।’

সবাই মাথা নাড়ল; বলল, ‘না, পাইনি হুজুর।’

ক্লাসের ভেতর একটা ভারী নিস্তব্ধতা নেমে এলো। ঠিক সেই সময় ক্লাসের সামনের বেঞ্চে বসে থাকা লাবিবের হঠাৎ মনে পড়ল, কিছুক্ষণ আগে যখন সে সিঁড়ি দিয়ে নেমে ক্লাসে যাচ্ছিল, তখন সিঁড়িতে একটা খাম পড়ে থাকতে দেখে সে তুলে নেয়। ভেবেছিল পরে কারো কাছে জিজ্ঞেস করবে; কিন্তু এখন বুঝতে পারল খামটিতেই হয়তো রায়হানের টাকা ছিল। তখন সে খামটি খুলেই ভেতরে দেখে টাকা। লাবিব ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল আর বলল, ‘হুজুর, আমি একটা খাম পেয়েছিলাম। তখন খুলে দেখিনি। এখন খামটি খুলে দেখলাম এর মধ্যে টাকা আছে। হয়তো এটা রায়হানের টাকাই হবে।’

হুজুর খামটি হাতে নিয়ে দেখলেন সত্যি সত্যিই ভেতরে তিন হাজার টাকা রয়েছে।

রায়হান খামটা দেখে আনন্দে কেঁদে ফেলল—‘এটাই আমার টাকা!’ আলহামদুলিল্লাহ বলে সে লাবিবকে জড়িয়ে ধরল।

হুজুর লাবিবের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘মাশাআল্লাহ! তুমি খুব ভালো কাজ করেছ লাবিব। সততা বজায় রেখেছ। সততা মানুষকে মহান করে তোলে। তুমি সবাইকে একটি শিক্ষা দিলে যে পাওয়া জিনিস ফেরত দেওয়া সবচেয়ে বড় গুণ এবং মহৎ কাজ।’

ক্লাসের সবাই মাশাআল্লাহ বলে উঠল। লাবিব মুচকি মুচকি হাসল। সে কখনো ভাবেনি, এত ছোট একটি কাজ এত বড় প্রশংসা এনে দিতে পারে।

সেদিন আসরের নামাজের পর মাদরাসার সব ছাত্রকে একত্র করে প্রধান মুহতামিম ঘোষণা করলেন, ‘আজ আমাদের মাদরাসার ছাত্র লাবিব একটি মহৎ কাজ করেছে। সে তার সততা দিয়ে প্রমাণ করেছে, ভালো মানুষ হতে বড় কিছু করতে হয় না; নিজেকে সবসময় সৎ পথে পরিচালিত করতে হয়। জীবনের সব পরিস্থিতিতেই ন্যায় ও সততা নিয়ে চলতে হয়।’

মাদরাসার সব ছাত্র লাবিবকে এই মহৎ কাজের জন্য অভিনন্দন জানাল। রায়হান লাবিবকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘তুই সত্যিই আমার ভালো বন্ধু। আজ তোর জন্যই আমার টাকাগুলো ফিরে পেলাম।’

সন্ধ্যায় বাসায় ফেরার পথে লাবিব আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে মনে খুব ভালো লাগা অনুভব করল। সেদিন সে বুঝতে পারল—‘সততা শুধু অন্যকে খুশি করে না, নিজের মনকেও আলোকিত করে তোলে।’

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন