ফুটবল বিশ্বকাপ মানেই বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া উৎসব। যেখানে ভাষা, সংস্কৃতি আর সীমান্তের দেয়াল ভেঙে কোটি মানুষ এক হয়ে যায় একই আবেগে। কিন্তু ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপকে ঘিরে সেই চেনা উন্মাদনার আড়ালে বাড়ছে নতুন এক বিতর্ক। অনেকের চোখে এটি হতে যাচ্ছে ইতিহাসের সবচেয়ে ‘বৈষম্যমূলক’ বিশ্বকাপ।
যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো যৌথভাবে আয়োজন করছে এবারের আসর। প্রথমবারের মতো অংশ নেবে ৪৮টি দল। ফিফা এটিকে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপ হিসেবে তুলে ধরলেও, বাস্তবতা বলছে ভিন্ন গল্প। আকাশছোঁয়া টিকিট মূল্য, কড়া ভিসানীতি, দীর্ঘ ভ্রমণ দূরত্ব এবং যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অভিবাসন পরিস্থিতি সাধারণ সমর্থকদের জন্য বিশ্বকাপকে প্রায় নাগালের বাইরে নিয়ে গেছে।
বিশ্বকাপের ম্যাচ দেখতে এবার সমর্থকদের শুধু টিকিট পেলেই হচ্ছে না, গুনতে হচ্ছে বিপুল ভ্রমণ ব্যয়ও। তিনটি বিশাল দেশে ছড়িয়ে থাকা ভেন্যুগুলোর কারণে এক শহর থেকে আরেক শহরে যেতে লাগছে দীর্ঘ বিমানযাত্রা। অনেক সমর্থককে একই টুর্নামেন্টে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর মধ্যে যাতায়াত করতে হতে পারে। ফলে আবাসন, পরিবহন ও খাবার মিলিয়ে খরচ পৌঁছে যাচ্ছে কয়েক হাজার ডলারে।
টিকিটের দাম নিয়েও তীব্র সমালোচনা তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন ম্যাচের টিকিটের মূল্য কয়েক হাজার ডলার ছাড়িয়ে গেছে। এমনকি মেক্সিকোয় উদ্বোধন ম্যাচের টিকিটও তিন থেকে ১০ হাজার ডলারের মধ্যে বিক্রি হয়েছে বলে জানা গেছে। নিউ ইয়র্কের মেটলাইফ স্টেডিয়ামে সাধারণ দর্শকদের জন্য স্বল্পমূল্যের কিছু টিকিট ছাড়লেও, বিশাল ধারণক্ষমতার তুলনায় সেই সংখ্যা ছিল নগণ্য।
শুধু ব্যয় নয়, বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কড়া ভিসা নীতিও। আফ্রিকা, এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বহু দেশের সমর্থকদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে। আবেদনকারীদের আর্থিক তথ্য, চাকরির বিবরণ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কার্যক্রম পর্যন্ত যাচাই করা হচ্ছে। এমনকি কিছু দেশের নাগরিকদের জন্য পাঁচ থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ‘ভিসা বন্ড’ চালু করেছিল যুক্তরাষ্ট্র।
বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া কিছু দেশের নাগরিকদের ক্ষেত্রেও ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি ছিল। হাইতি ও ইরানের ওপর পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা, সেনেগাল ও আইভরি কোস্টের ওপর আংশিক বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। পরে টুর্নামেন্ট ঘিরে কিছু নিয়ম শিথিল করা হলেও উদ্বেগ কাটেনি সমর্থকদের।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোও পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রে চলমান অভিবাসন অভিযান, আইসিইর তৎপরতা এবং বর্ণগত প্রোফাইলিংয়ের আশঙ্কা বিদেশি সমর্থকদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করেছে। এমনকি ম্যাচ চলাকালীন স্টেডিয়াম এলাকায়ও অভিবাসন সংস্থার অভিযান হতে পারে কি না—সেই নিশ্চয়তাও দিতে পারেনি মার্কিন প্রশাসন।
বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বকাপ ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের উৎসব থেকে করপোরেট ও ধনীদের প্রদর্শনীতে পরিণত হচ্ছে। ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো যেখানে ১১ বিলিয়ন ডলার আয়ের সম্ভাবনার কথা বলছেন, সেখানে অসংখ্য ফুটবলপ্রেমী শুধু খরচের কারণে প্রিয় দলের খেলা মাঠে বসে দেখার স্বপ্নই দেখতে পারছেন না।
তবু ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা থেমে নেই। সমালোচনা, বৈষম্য আর অনিশ্চয়তার মাঝেও বিশ্বজুড়ে কোটি মানুষ অপেক্ষা করছে ‘দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’-এর জন্য। কারণ সব বিতর্ক ছাপিয়ে বিশ্বকাপ এখনো ফুটবলপ্রেমীদের সবচেয়ে বড় আবেগের নাম।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

