খাবারের দাম নেওয়া হয় না, তবু রেস্তোরাঁ মালিকের লাভ

আমার দেশ অনলাইন
আমার দেশ অনলাইন

খাবারের দাম নেওয়া হয় না, তবু রেস্তোরাঁ মালিকের লাভ

সাধারণ ব্যবসায়িক ধারণার সম্পূর্ণ বিপরীতে গিয়ে এক রেস্তোরাঁ মালিক খাবারের জন্য মূল্য নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন। অবাক করার বিষয় হলো, এতে ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়ে বরং আরও সফল হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের মিনিয়াপোলিস শহরের ‘পোস্ট মডার্ন টাইমস’ নামের একটি ক্যাফে এখন আলোচনার কেন্দ্রে, যেখানে গ্রাহকরা খাবার খাওয়ার পর নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী অনুদান দেন অথবা কিছুই না দিলেও চলে।

বিজ্ঞাপন

রেস্তোরাঁটির মালিক ডিলান অ্যালভারসন ১৫ বছর ধরে ‘মডার্ন টাইমস’ নামে ক্যাফেটি পরিচালনা করছিলেন। চলতি বছরের শুরুতে অভিবাসনবিরোধী ফেডারেল অভিযানের সময় সংঘটিত সহিংসতা ও এক ব্যক্তির মৃত্যুর ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি একটি ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত নেন। সরকারের কাছে বিক্রয় কর (সেলস ট্যাক্স) না দেওয়ার প্রতিবাদ হিসেবে তিনি ঘোষণা করেন, পরবর্তী সময়ে তার রেস্তোরাঁ হবে সম্পূর্ণ ‘ফ্রি অ্যান্ড ডোনেশন-বেইজড’।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া সেই ঘোষণার পর ক্যাফেটির নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘পোস্ট মডার্ন টাইমস’। শুরুতে এটি ছিল রাজনৈতিক প্রতিবাদের অংশ, কিন্তু ধীরে ধীরে তা পরিণত হয় এক সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরীক্ষায়।

বর্তমানে রেস্তোরাঁটির ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ গ্রাহক কোনো অর্থ পরিশোধ না করেই খাবার খান। তবু ব্যবসা আগের তুলনায় ভালো চলছে বলে দাবি করেন অ্যালভারসন।

তার ভাষায়, প্রচলিত ব্যবসা পরিচালনা করে ২২ জন কর্মী নিয়ে যতটা সফল হতে পারিনি, এখন তার চেয়ে বেশি সফল হয়েছি। এটা প্রমাণ করে যে বর্তমান ব্যবস্থায় কোথাও না কোথাও সমস্যা রয়েছে।

রেস্তোরাঁটিতে প্রতিদিন সকাল থেকেই ভিড় জমে। কেউ বিনামূল্যে খাবারের জন্য আসেন, কেউ আবার সামাজিক সংহতির এই উদ্যোগকে সমর্থন করতে। স্থানীয় বাসিন্দা সোফিয়া প্যাডিলা বলেন, শীতকালের অস্থিরতার পর আমাদের এলাকাকে আবার একত্রিত করার চেষ্টা করছে এই প্রতিষ্ঠান। আমি এমন একটি ব্যবসাকে সমর্থন করতে চাই, যারা সত্যিই মানুষের কথা ভাবে।

রেস্তোরাঁটিতে খাবারের মানেও কোনো ছাড় দেওয়া হয়নি। ঘরে তৈরি রুটি, স্থানীয় উপকরণ এবং অর্ডার অনুযায়ী প্রস্তুত করা খাবার এখনো তাদের বিশেষত্ব। প্রথমবার সেখানে গিয়ে জুভি হার্পার বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, আমি ভেবেছিলাম হয়তো সাধারণ খাবারের দোকানের মতো প্রস্তুত প্যাকেটজাত খাবার পাব। কিন্তু এখানে সব খাবারই তাজা ও অর্ডার অনুযায়ী তৈরি।

খাওয়া শেষে গ্রাহকদের কোনো বিল দেওয়া হয় না। শুধু অনুদানের সুযোগ রাখা হয়। অর্থ দিতে না পারলেও কাউকে বিব্রত করা হয় না। সম্প্রতি এক বৃদ্ধ ট্রাকচালক অর্থ দিতে না পারলেও কর্মীরা তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বিদায় জানান। তিনি মন্তব্য করেন, এটি সত্যিই আশীর্বাদস্বরূপ একটি জায়গা।

অ্যালভারসনের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের রেস্তোরাঁ শিল্প বর্তমানে গভীর সংকটে রয়েছে। বাড়তি শ্রম ব্যয়, ভাড়া, খাদ্যপণ্যের মূল্য এবং বিভিন্ন সেবামূল্যের চাপে ছোট ব্যবসাগুলো টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছে। গত বছর তার রেস্তোরাঁর বিক্রি ছিল ১৩ লাখ ডলার, তবুও বছরের শেষে ১৮ হাজার ৫০০ ডলার লোকসান গুনতে হয়েছে।

তবে নতুন মডেল চালুর পর রেস্তোরাঁর পরিচিতি বেড়ে যায়। শিল্পীদের নকশায় তৈরি টি-শার্ট বিক্রি এবং বিভিন্ন স্থান থেকে পাওয়া অনুদানও আয়ের নতুন উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগে যেখানে বছরে প্রায় ৬০ হাজার ডলারের পণ্য বিক্রি হতো, সেখানে চলতি বছরের এপ্রিল মাসেই বিক্রি হয়েছে ২৫ হাজার ডলারের বেশি।

যদিও উদ্যোগটি সবাই ইতিবাচকভাবে দেখছেন না। কিছু প্রতিবেশী অভিযোগ করেছেন, বিনামূল্যে খাবারের কারণে এলাকায় অপরাধপ্রবণ মানুষ জড়ো হতে পারে। তবে রেস্তোরাঁ কর্তৃপক্ষের দাবি, তারা নিরাপত্তা ও সামাজিক সহায়তার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে।

অ্যালভারসনের বিশ্বাস, এই উদ্যোগ শুধু একটি রেস্তোরাঁ পরিচালনার নতুন পদ্ধতি নয়; বরং অর্থনৈতিক বৈষম্য কমিয়ে মানুষের মর্যাদা ও সমতার ভিত্তিতে নতুন ধরনের সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তোলার একটি প্রচেষ্টা।

তিনি বলেন, আমরা এমন একটি জায়গা তৈরি করেছি যেখানে অর্থনৈতিক অবস্থান নির্বিশেষে সবাই সমান মর্যাদা পায়। এই অভিজ্ঞতা থেকে ভবিষ্যতের জন্য অনেক কিছু শেখার আছে।

বর্তমানে ‘পোস্ট মডার্ন টাইমস’ শুধু একটি রেস্তোরাঁ নয়; এটি হয়ে উঠেছে সামাজিক সংহতি, মানবিকতা এবং বিকল্প অর্থনৈতিক চিন্তার এক অনন্য উদাহরণ।

সূত্র: দ্য নিউইয়র্ক টাইমস

এআরবি

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...