দেশে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে ধর্ষণের ঘটনা। বয়স্ক থেকে শুরু করে শিশুরাও ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। বিচারের শ্লথগতি ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি, সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধের অভাব, রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব বেড়ে যাওয়া ও অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় নারী নির্যাতনের ঘটনা বাড়ছে। ভিকটিমের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা নিম্ন হওয়ায় মামলাগুলো গুরুত্ব না পাওয়ায় এই অপরাধ বাড়ছে। এছাড়াও সংশ্লিষ্টদের সমন্বয়হীনতারও কাজের জন্য এ ধরনের ঘটনা বাড়ছে।
একাধিক মানবাধিকার সংস্থার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারিতে ৩৫টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ জানিয়েছে, জানুয়ারিতে ঢাকাসহ সারাদেশে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৩১টি। চলতি ফেব্রুয়ারিতে নরসিংদীর মাধবদীতে আমেনা নামে এক কিশোরীকে একাধিকবার গণধর্ষণ শেষে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। এছাড়াও পাবনার ঈশ্বরদীতে মধ্যরাতে বাড়িতে ঢুকে দাদিকে হত্যা এবং নাতনিকে অপহরণের পর ধর্ষণ করে হত্যার অভিযোগে চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ বলছে, ধর্ষণের ঘটনায় তারা ত্বরিত ব্যবস্থা নিচ্ছেন। কোনো ছাড় দেওয়া হচ্ছে না।
এ বিষয়ে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান গতকাল শনিবার সকালে ঝিনাইদহ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, চাঞ্চল্যকর নরসিংদীর ধর্ষণ মামলায় যারা জড়িত তাদের যদি কেউ আশ্রয় দেয়, তাদের শেকড় ধরে উপড়ে ফেলা হবে।
এ বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন শনিবার সন্ধ্যায় আমার দেশকে জানান, হত্যা ও ধর্ষণ খুবই গুরুতর অপরাধ হিসেবে দেখে পুলিশ। এসব ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে মামলা রুজু হয় এবং তদন্ত প্রক্রিয়া শুরু হয়।
এ বিষয়ে সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, ধর্ষণের ঘটনায় রাজনৈতিক বিবেচনা, সম্পর্কগত বিবেচনা, এলাকাপ্রীতি, ভয়ভীতিসহ নানাবিধ কারণে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় না। এসব কারণে অপরাধীর বেপরোয়া হয়ে ওঠে। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় বাড়ছে এ ধরনের ঘটনা।
জানা গেছে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি পাবনার ঈশ্বরদীতে মধ্যরাতে বাড়িতে ঢুকে দাদিকে হত্যা এবং নাতনিকে অপহরণের পর ধর্ষণ করে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। সকালে উপজেলার দাশুড়িয়া ইউনিয়নের দিইশাইল গ্রাম থেকে তাদের লাশ উদ্ধার করে ঈশ্বরদী থানা পুলিশ।
নিহতরা হলেনÑ ভবানিপুর উত্তরপাড়ার মৃত নাজিম উদ্দিনের স্ত্রী সুফিয়া বেগম (৬৫) এবং তার ছেলে জয়নাল খার মেয়ে জামিলা আক্তার (১৫)। জামিলা দিকশাইল দাখিল মাদরাসার দশম শ্রেণির ছাত্রী।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শনিবার গভীর রাতে হঠাৎ কান্নাকাটির শব্দ শুনে স্থানীয় কয়েকজন বাড়ির সামনে রাস্তায় বের হন। তবে কিছুক্ষণ পর শব্দ থেমে গেলে তারা নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে যান। সকালে বাড়ির উঠানে সুফিয়া বেগমের রক্তাক্ত লাশ পড়ে থাকতে দেখা যায়। এ সময় জামিলা আক্তারকে খুঁজে না পেয়ে পরিবারের সদস্যরা আশপাশে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। পরে বাড়ির পাশের একটি সরিষা ক্ষেতে তার বিবস্ত্র লাশ উদ্ধার করা হয়।
বিষয়টি নিশ্চিত করে ঈশ্বরদী থানার ওসি মো. মমিনুজ্জামান বলেন, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠিয়েছে। নিহতের শরীরে ও মুখে একাধিক আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনে তদন্ত শুরু হয়েছে।
নিহত জামিলার মা শিরিনা খাতুন জানান, পাঁচ বছর আগে তার বাবার সঙ্গে আমার বিবাহ বিচ্ছেদ হয়। এরপর থেকে জামিলা বাবা ও দাদির কাছেই থাকত। গত তিন দিন আগে তার বাবা জরুরি কাজে ঢাকা যাওয়ায় দাদি ও জামিলা একাই বাড়িতে ছিল।
এর একদিন আগে, গত ২৭ ফেব্রুয়ারি নরসিংদীর মাধবদীতে আমেনা আক্তার (১৫) নামে একজনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। নরসিংদী সদর উপজেলার মাধবদী থানাধীন মহিষাশুড়ার বিলপাড় এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। একই এলাকার কোতালিরচর দড়িকান্দী এলাকার একটি সরিষা ক্ষেত থেকে গলায় ওড়না প্যাঁচানো অবস্থায় তার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
নিহতের পরিবারের দাবি, আগের ধর্ষণের ঘটনাকে ধামাচাপা দিতে পরিকল্পিতভাবে আমেনাকে তুলে নিয়ে হত্যা করা হয়েছে। তারা জানান, প্রায় ১৫ দিন আগে স্থানীয় বখাটে নূরার নেতৃত্বে ৫-৬ জনের একটি দল আমেনাকে রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে সংঘবদ্ধভাবে ধর্ষণ করে। ঘটনাটি পরিবার জানতে পেরে স্থানীয় ইউপি সদস্য আহমদের কাছে বিচার চান।
অভিযোগ রয়েছে, বিচারের আশ্বাস মিললেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। উল্টো অভিযুক্তরা দফায় দফায় হুমকি ও হেনস্তা করে। পরিবার সূত্রে জানা যায়, নিরাপত্তার কারণে আমেনাকে প্রতিদিন রাতে পার্শ্ববর্তী খালার বাড়িতে রাখা হতো। গত বুধবার রাতে সৎ বাবা আশরাফ হোসেন কর্মস্থল থেকে ফিরে মেয়েকে নিয়ে খালার বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেন। বড়ইতলা এলাকায় পৌঁছালে নূরার নেতৃত্বে কয়েকজন তাদের পথরোধ করে এবং জোরপূর্বক আমেনাকে ছিনিয়ে নিয়ে যায় বলে অভিযোগ। রাতভর খোঁজাখুঁজির পরও তাকে না পেয়ে পরিবার স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের জানায়।
মাধবদী থানার ওসি মো. কামাল হোসেন জানান, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে লাশ উদ্ধার করে নরসিংদী সদর হাসপাতালে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠিয়েছে। প্রাথমিক সুরতহাল প্রতিবেদনে হত্যার আগে ধর্ষণের আলামত পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় একজনকে আটক করা হয়েছে।
গত ২৬ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর হাতিরঝিল এলাকা থেকে অষ্টম শ্রেণির এক স্কুলছাত্রীর লাশ উদ্ধারের ঘটনায় দুই যুবক গ্রেপ্তার হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, তারা সংঘবদ্ধ ধর্ষণের পর কিশোরীকে হত্যা করে লাশ ফেলে দেয়।
মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) জানিয়েছে, জানুয়ারিতে দেশে ৩৫টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। শুধু নারী নির্যাতনের ক্ষেত্রে জানুয়ারিতে ৩১টি পারিবারিক পরিবেশে চালানো সহিংসতা, ৩৫টি ধর্ষণের, ২টি যৌন হেনস্থার এবং ৬টি কন্যা বিয়ে ও দাম্পত্যবিষয়ক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে।
প্রতিবেদনটিতে নারী নির্যাতনের ধরন অনুযায়ী দেখা গেছে, গৃহহিংসার সংখ্যা সবচেয়ে বেশি; ৩১টি, যা পরিবার ও সমাজে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থতার প্রমাণ। ধর্ষণের ৩৫টি ঘটনা এবং যৌন হেনস্তার দুটি ঘটনা নারী নির্যাতনের ভয়াবহতা তুলে ধরেছে। পাশাপাশি, যৌতুক সম্পর্কিত সহিংসতার ঘটনা ছয়টি এবং গৃহকর্মী নারীর ওপর সহিংসতার ঘটনা একটি। তবে এসিড হামলার ঘটনা ঘটেনি।
এছাড়া শিশু নির্যাতনেও উদ্বেগজনক পরিস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। জানুয়ারি মাসে শিশুদের ওপর সহিংসতার ৩৫টি ঘটনা ঘটেছে এবং শিশু হত্যার ঘটনা ২৫টি হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছে। এটি সমাজের সবচেয়ে দুর্বল অংশের নিরাপত্তা সংকটে থাকার চিত্র তুলে ধরে।
আসক জানায়, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের এক ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে, যেখানে মোট ৩৫ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। মোট আক্রান্তদের মধ্যে ২৫ জন একক ধর্ষণের শিকার হয়েছেন এবং ১০ জন দলগত ধর্ষণের শিকার হয়েছেন।
বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১২ বছর বা তার কম বয়সি শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে রয়েছে। যেখানে ৬ বছরের নিচে ২ জন এবং ৭ থেকে ১২ বছর বয়সি ১১ জন শিশু এই নিষ্ঠুরতার শিকার হয়েছে। এছাড়া ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সি ৩ জন, ১৯ থেকে ২৪ বছর বয়সি ২ জন, ২৫ থেকে ৩০ বছর বয়সি ২ জন এবং ৩০ বছরের ঊর্ধ্বে দুজন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। আর ১৩ জন ভুক্তভোগীর বয়স সম্পর্কে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। এই সহিংসতার পরিণতি ছিল অত্যন্ত মর্মান্তিক।
তথ্যানুযায়ী, ধর্ষণের পর দুজন ভুক্তভোগীকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়েছে এবং একজন ধর্ষণের গ্লানি সইতে না পেরে আত্মহত্যা করেছেন। এছাড়া আরো আটজন নারী ও শিশুকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে।
আসক জানায়, আইনি পদক্ষেপের ক্ষেত্রে দেখা যায়, মোট ৩৫টি ঘটনার মধ্যে ২৮টি ঘটনায় মামলা দায়ের করা সম্ভব হয়েছে, তবে পাঁচটি ঘটনার ক্ষেত্রে মামলা দায়ের সংক্রান্ত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
সূত্র জানায়, এই তথ্যগুলো নির্দেশ করেছে সমাজে নারী ও শিশুদের নিরাপত্তাব্যবস্থা এখনো চরম সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিচারহীনতা বা লোকলজ্জার ভয়ে অনেক তথ্য অগোচরেই থেকে যাচ্ছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

