আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

বিটিআরসির টাকায় আমলাদের ভ্রমণবিলাস

আবু সুফিয়ান

বিটিআরসির টাকায় আমলাদের ভ্রমণবিলাস

ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের অধীন সংস্থাগুলোর ওপর প্রভাব খাটিয়ে মন্ত্রণালয়ের কিছু কর্মকর্তা বিদেশ সফরের সুযোগ নিচ্ছেন- নতুন করে এমন অভিযোগ সামনে এসেছে। সংস্থার নিজস্ব অর্থ ব্যবহার করে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণকে ঘিরে প্রশাসন, নীতিনির্ধারক ও সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন উঠছে। মন্ত্রণালয়ের বাজেট ছাড়াই কোন আইনি ভিত্তিতে সংস্থার অর্থে এসব সফর চলছে, তা নিয়েও প্রকাশ্য সমালোচনা রয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, মন্ত্রণালয়ের মনোনয়ন ছাড়া বিদেশ সফরের সরকারি আদেশ (জিও) পাওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা সংস্থাগুলোকে কার্যত নির্ভরশীল ও জিম্মি অবস্থায় ফেলেছে। সাম্প্রতিক সময়ে এ বিতর্ক আরো তীব্র হয়েছে বিটিআরসির দুই কর্মকর্তা ও মন্ত্রণালয়ের একাধিক যুগ্ম সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তার আজারবাইজান ও জার্মানি সফরকে কেন্দ্র করে। এ নিয়ে সংস্থাটির ভেতর-বাইরে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। বিটিআরসির নিজস্ব কর্মকর্তাদের বাদ দিয়ে বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন সফরে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের বাধ্য হয়ে নিতে হচ্ছে, যা নিয়ে দেখা দিয়েছে অসন্তোষ।

বিজ্ঞাপন

বিটিআরসি ও মন্ত্রণালয়ের তিন কর্মকর্তার আজারবাইজান সফর

ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত বিদেশ ভ্রমণের সরকারি আদেশে দেখা যায়, গত বছরের নভেম্বর মাসে ‘আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ উন্নয়ন সম্মেলন’-এ অংশ নিতে তিন কর্মকর্তা আজারবাইজান সফর করেন। তারা হলেন- ডাক বিভাগের যুগ্ম সচিব সাইয়েদা আফরোজ, বিটিআরসির পরিচালক কর্নেল রাশেদুজ্জামান এবং উপপরিচালক ফারহান আলম। এদের মধ্যে বিটিআরসির উপপরিচালক পর্যায়ের কর্মকর্তার ব্যয় ইন্টারন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন (আইটিইউ) ফেলোশিপ থেকে বহন করা হলেও বাকি দুজনের পুরো খরচ বহন করে বিটিআরসি। সংস্থার অর্থায়নে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের বিদেশ সফর হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির ভেতরে প্রশ্ন ও সমালোচনা আরো ঘনীভূত হয়েছে।

দুই কর্মকর্তার জন্য ১০ লাখ টাকা ছাড়

আমার দেশ-এর হাতে আসা বিটিআরসির পরিচালক সাজেদা পারভীন স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, আজারবাইজানে অনুষ্ঠেয় কনফারেন্সে অংশ নিতে যাওয়া দুই কর্মকর্তার প্রতিজন হোটেল ভাড়া, দৈনিক ভাতা, টার্মিনাল চার্জ এবং ট্রানজিট ভাতাসহ মোট তিন হাজার ৮১৬ মার্কিন ডলার পাবেন। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় চার লাখ ৭০ হাজার টাকা। চিঠিতে আরো বলা হয়, এ ব্যয় বিটিআরসির ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বৈদেশিক ব্যয় খাত থেকে নির্বাহ করা হবে। সংস্থার অর্থে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের এত উচ্চ ব্যয়ের বিদেশ সফর অনুমোদন করায় প্রশ্ন উঠেছে- এ ব্যয়ের যৌক্তিকতা কতটা সংগত এবং সংস্থার স্বাভাবিক কার্যক্রমে এর প্রভাব কী হতে পারে।

রেডিয়েশন যন্ত্র পরীক্ষা : প্রশাসনিক যুগ্ম সচিবের জার্মানি সফর

বিতর্ক আরো বেড়েছে মন্ত্রণালয়ের আরেক যুগ্ম সচিব নুরুল হকের সাম্প্রতিক জার্মানি সফর নিয়ে। ‘প্রি-শিপমেন্ট ইন্সপেকশন অব ইএমএফ রেডিয়েশন মেজারমেন্ট’ শীর্ষক সফরটি পুরোপুরি কারিগরি, যেখানে টেলিযোগাযোগ খাতে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতির সিগন্যাল, রেডিয়েশন ও প্রযুক্তিগত কার্যকারিতা যাচাই-বাছাই করা হয়। এ ধরনের সফরে সাধারণত প্রকৌশলী বা প্রযুক্তিগত বিশেষজ্ঞদের পাঠানো হয়। কারণ সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতির মান নির্ধারণে বিশেষজ্ঞ দক্ষতা অপরিহার্য। কিন্তু এ সফরে পাঠানো হয়েছে মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন শাখার এক যুগ্ম সচিবকে। কীভাবে প্রশাসনিক শাখার কর্মকর্তা এ প্রযুক্তিগত যাচাই-বাছাইয়ের কাজে ভূমিকা রাখবেন, মন্ত্রণালয় বা বিটিআরসির কেউই এ প্রশ্নের জবাবে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। আজারবাইজান সফরেও মনোনীত সাইয়েদা আফরোজ মন্ত্রণালয়ে ডাক বিভাগের দায়িত্বে আছেন, টেলিকমের নয়।

সংশ্লিষ্ট মহলের মন্তব্য, এ দুই ঘটনাই প্রমাণ করে- মন্ত্রণালয়ের চাপ ও কর্তৃত্ব প্রয়োগ করেই কর্মকর্তাদের এসব সফরে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। ফলে সফর মনোনয়ন এখন দায়িত্বভিত্তিক নয়; বরং প্রভাব ও ক্ষমতার বলয়ে আটকে পড়েছে।

মন্ত্রণালয়ের জিও বাণিজ্য ও বিটিআরসির বক্তব্য

বিটিআরসির প্রশাসন বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, আগে বিদেশ সফরের ক্ষেত্রে বিটিআরসির নিজস্ব কর্মকর্তাদের জন্য জিও জারি করতেন কমিশনের চেয়ারম্যান। তবে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সে ক্ষমতা মন্ত্রণালয়ের হাতে নেওয়া হয়। ফলে এখন মন্ত্রণালয়ের অধীন সব সংস্থার বিদেশ সফরের অনুমোদন ও জিও জারির দায়িত্ব পুরোপুরি তাদেরই হাতে। এ ক্ষমতা হস্তান্তরের পর পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে ওঠে।

ওই কর্মকর্তা আরো জানান, বিদেশ সফরের প্রস্তাব পাঠালেই মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব কর্মকর্তাদের অন্তর্ভুক্ত করার চাপ আসে। তা না হলে জিও ইচ্ছাকৃতভাবে বিলম্বিত করা হয় বা প্রস্তাব আটকে রাখা হয়। অনেক ক্ষেত্রে তদবির বা অনানুষ্ঠানিক প্রভাব ছাড়া অনুমোদন পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এতে সংস্থাগুলো কার্যত নির্ভরশীল ও জিম্মি অবস্থায় পড়েছে, যেখানে দায়িত্ব বা প্রয়োজন নয়; বরং মন্ত্রণালয়ের প্রভাবই নির্ধারণ করছে কে বিদেশ সফরে যাবেন আর কে যাবেন না।

ফ্যাক্টরি টেস্টে সিনিয়র সহকারী সচিব

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রকাশিত বিদেশ ভ্রমণের জিও তালিকা বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিভিন্ন সংস্থার সফরে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের উপস্থিতির মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভ্রমণ হয়েছে বিটিসিএলের কার্যক্রমে। সংস্থাটির প্রকল্প, পরিদর্শন ও প্রশিক্ষণমূলক সফরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে চীন, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া, ভারত, ফ্রান্স, জার্মানিসহ একাধিক দেশে গেছেন বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা। তবে এসব সফরের বড় অংশেই তাদের অংশগ্রহণের কোনো বাস্তব যৌক্তিকতা পাওয়া যায়নি, কার্যসংশ্লিষ্টতা ছিল অত্যন্ত সীমিত অথবা একেবারেই অনুপস্থিত। এসব সফরে প্রকল্প বা সংস্থার কাজে সুনির্দিষ্ট কোনো অবদান বা আউটপুট পাওয়া যায়নি।

সর্বশেষ গত ২৪ ডিসেম্বর মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে বিদেশ ভ্রমণের তালিকায় জারি করা পত্রে দেখা যায়, বিটিসিএলের ‘সুইচিং অ্যান্ড ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক ডেভেলপমেন্ট’ প্রকল্পে সংস্থার দুই কর্মকর্তার সঙ্গে ফ্যাক্টরি এক্সেপটেন্স টেস্টে সাত দিনের সফরে যাচ্ছেন ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব আকরামুল হক চৌধুরী। কারিগরি সফরে প্রশাসনের এ কর্মকর্তার কাজ কী হবে, জানতে চেয়ে বার্তা দিলে তিনি জবাব দেননি।

এছাড়াও সম্প্রতি জারি হওয়া জিওতে দেখা যায়, টেলিটকের নেটওয়ার্ক বিস্তারকরণ প্রকল্পে চীন সফর করেছেন উপসচিব মোখলেসুর রহমান এবং টেশিসের এক প্রকল্পে চায়না সফর করে এসেছেন যুগ্ম সচিব সাইফুল আলম।

বিদেশ ভ্রমণে সরকারি পরিপত্রের লঙ্ঘন

রিজার্ভের ওপর চাপ কমাতে সরকারি অর্থে সেমিনার, ওয়ার্কশপ ও প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ বন্ধ অনেক দিন ধরেই। ব্যয় সংকোচনের লক্ষ্যে এ পরিপত্র জারি করেছিল বিগত সরকার। এতে সেমিনার, সভা ও প্রশিক্ষণের নামে বিদেশ ভ্রমণের উৎসব বন্ধ হয়ে যায় তাদের। তাই নতুন উপায় হিসেবে সংস্থার অর্থে বিদেশ ভ্রমণের ধারা শুরু হয়। এ চিত্র শুধু ডাক ও টেলিযোগাযোগে নয়, অন্য মন্ত্রণালয়গুলোও একই ভাবে সংস্থাগুলোকে বাধ্য করছে বিদেশ ভ্রমণে নিজেদের কর্মকর্তাদের অন্তর্ভুক্ত করতে। যেহেতু সংস্থাগুলোর পদায়ন, বদলিসহ গুরুত্বপূর্ণ অনেক সিদ্ধান্তই তাদের অধীনে, তাই সংস্থাগুলো চাইলেই এর বিরোধিতা করতে পারে না।

কর্মকর্তারা যা বলছেন

সর্বশেষ আজারবাইজান ও জার্মানি সফরে মন্ত্রণালয়ের দুই কর্মকর্তাকে নেওয়া হয়েছে বিটিআরসির খরচে, এর কারণ কীÑএমন প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব আমার দেশকে বলেন, ‘বিটিআরসি ও মন্ত্রণালয় উভয়েরই কর্মকর্তা আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ সংস্থার আজারবাইজান সম্মেলনে গেছেন, এতে উভয়ের জন্য নলেজ শেয়ারিং উইন্ডো তৈরি হয়েছে। এ মিনিস্ট্রিয়াল সফরে মন্ত্রী ও সচিবের যাওয়ার কথা ছিল, তারা না যাওয়ায় মিড ম্যানেজমেন্টের জন্য সুযোগ তৈরি হয়েছে। কাজের চাপ বেশি থাকায় ব্যক্তিগতভাবে আমি ছয়টির বেশি বিদেশ ভ্রমণ বাদ দিয়েছি।

একই প্রশ্নের জবাবে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের উপসচিব (পরিকল্পনা-১) মোকলেছুর রহমান আমার দেশকে বলেন, টেন্ডারে উল্লেখ থাকা যন্ত্রপাতিই সরবরাহ হয়েছে কি না এবং সেগুলো সঠিকভাবে কাজ করছে কি না, তা যাচাই করা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব। প্রযুক্তিগত বিষয় ঠিকভাবে বুঝে দেখার জন্যই যন্ত্রপাতি গ্রহণ ও পরীক্ষার সময় মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি যান।

তিনি জানান, এসব সফর মন্ত্রণালয় বা বিটিআরসি, বিটিসিএল কিংবা টেলিটকের খরচে নয়। টেন্ডার চুক্তি অনুযায়ী গ্রহণযোগ্যতা পরীক্ষা বিনা খরচে হয় এবং সব ব্যয় বহন করে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান। কেবল আন্তর্জাতিক সম্মেলনে সরকারি প্রতিনিধি হিসেবে অংশ নিতে হলে কিছু ক্ষেত্রে বিটিআরসির খরচ হতে পারে। তবে সাধারণভাবে বিটিআরসির অর্থ ব্যয় করে মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি বিদেশ সফরে যান না।

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত ‘একান্ত অপরিহার্য কারণ’ ছাড়া সরকারি কর্মচারীদের বিদেশ ভ্রমণ না করতে নির্দেশ দিয়েছে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়। গত ২১ অক্টোবর প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের সচিব সাইফুল্লাহ পান্নার সই করা এক পরিপত্রে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়।

পরিপত্রে উল্লেখ করা হয়, বিদেশ ভ্রমণ বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় ও অর্থ বিভাগের ৮ জুলাইয়ের ৭ নম্বর স্মারকে সীমিত ভ্রমণসহ যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, তা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে না। একই সময়ে মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ও সচিবদের বিদেশ সফর, একসঙ্গে একই মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তার বিদেশে যাওয়া এবং এ ধরনের প্রস্তাব নিয়মিত পাঠানো নির্দেশনার পরিপন্থী বলে উল্লেখ করা হয়।

এ অবস্থায় আগের সব নির্দেশনা মেনে চলা এবং আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত একান্ত অপরিহার্য কারণ ছাড়া বিদেশ ভ্রমণ পরিহারের অনুরোধ জানানো হয়। তবে বাস্তবে যারা এসব নির্দেশনা দিচ্ছেন, তারাই তা লঙ্ঘন করে ধারাবাহিকভাবে বিদেশ সফর করছেন।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...