আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

কেমন চলছে ঈদ ব্যবসা

সোহেল রহমান

কেমন চলছে ঈদ ব্যবসা

দরজায় কড়া নাড়ছে পবিত্র ঈদুল ফিতর। দিন যত ফুরিয়ে আসছে এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে রাজধানীসহ সারা দেশে বাড়ছে মানুষের কেনাকাটার ধুম। অভিজাত শপিংমল, বিপণিবিতান থেকে শুরু করে ফুটপাতের দোকানগুলোতে ব্যতিব্যস্ত সময় পার করছেন ক্রেতা-বিক্রেতারা। রাজধানীর মোড় থেকে মফস্বলের গলি—সর্বত্র এখন উৎসবের আমেজ। প্রতিটি খাতে বইছে বিকিকিনির হিড়িক।

বিজ্ঞাপন

ব্যবসায়ীরা জানান, এবারের ঈদকে ঘিরে দেশের বাজারে প্রায় দুই লাখ কোটি টাকার বাণিজ্য হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। দুই বছর আগের মন্দাভাব কাটিয়ে এবার দেশীয় বিপণিবিতান ও ফুটপাতের দোকানগুলোতে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে। পোশাক, জুতা, প্রসাধনী, ব্যাগ, ঘড়ি ও উপহারসামগ্রীর দোকানে ক্রেতাদের উপস্থিতিতে জমে উঠেছে কেনাকাটা।

বিগত কয়েক মৌসুমের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা কাটিয়ে এবার ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের বিনিয়োগ করেছিলেন। সেই আস্থার প্রতিদান মিলছে এখন। বিশেষ করে সরকারি ও বেসরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-বোনাস হাতে আসায় বাজারের গতি এসেছে।

রাজধানীর নিউ মার্কেট, গাউছিয়া মার্কেট, এলিফ্যান্ট রোড, বসুন্ধরা সিটি শপিং কমপ্লেক্স ও পুরান ঢাকার বিভিন্ন বিপণিবিতান ঘুরে দেখা গেছে, নারী ও পুরুষসহ বিভিন্ন শ্রেণির ক্রেতাদের উপচেপড়া ভিড়। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর দোকানগুলোতে কেনাকাটার চাপ বেশি থাকে। অনেকে পরিবারের সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে মার্কেটে আসছেন। শিশু ও কিশোরদের পোশাকের দোকানে আগ্রহ তুলনামূলক বেশি লক্ষ করা গেছে।

ব্যবসায়ীরা জানান, ঈদ মৌসুমে বছরের বড় একটি অংশ বিক্রি হয়ে থাকে। ফলে এ সময়টিকে কেন্দ্র করে প্রস্তুতিও নেওয়া হয় আগে থেকেই। দেশীয় ফ্যাশন হাউসগুলো নতুন নতুন নকশার পোশাক বাজারে এনেছে। পাশাপাশি বিদেশি ব্র্যান্ডের পোশাকও পাওয়া যাচ্ছে বিভিন্ন শপিং মলে।

শুধু শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত আধুনিক শপিং মল নয়, সাধারণ মানুষের আস্থার ঠিকানা হয়ে দাঁড়িয়েছে ফুটপাত ও অস্থায়ী বাজারগুলো। নিউ মার্কেট-সংলগ্ন রাস্তার ধারের দোকানগুলোতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত

মানুষের ভিড় চোখে পড়ার মতো। সেখানে সাধ্যের মধ্যে পছন্দের জিনিসটি খুঁজে নিতে ব্যস্ত ক্রেতারা। টি-শার্ট, জিন্স কিংবা বাচ্চাদের রঙিন জামার পসরা সাজিয়ে বসেছেন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা।

বাংলাদেশ দোকান ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সভাপতি নাজমুল হাসান মাহমুদ আমার দেশকে বলেন, বিগত কয়েক বছরের তুলনায় এবার ব্যবসায়ীরা অনেকটা স্বস্তিবোধ করছেন। বিশেষ করে দেশে একটি নির্বাচিত সরকার থাকায় রাজনৈতিক স্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে ব্যবসায় স্বস্তি ফিরেছে। এ বছর সারা দেশে ঈদ উৎসবকে কেন্দ্র প্রায় দুই লাখ কোটি টাকার বাণিজ্যের আশা করা হচ্ছে। গত বছর সারা দেশে প্রায় ১৪০ থেকে ১৫০ হাজার কোটি টাকার ঈদ ব্যবসা হয়েছে। আশা করা যাচ্ছে এ বছর আমাদের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে সেটা পূরণে সক্ষম হব।

তিনি বলেন, কিছুদিন আগেও ব্যবসায়ীরা নানারকম হয়রানি ও মব আতঙ্কে ছিলেন। তবে নির্বাচনের পর পরিস্থিতি পাল্টেছে। হাসিনার ফ্যাসিস্ট সরকারের সময়ে অনেকে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রক্ষার করার জন্য তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করেছে। এজন্য ঢালাওভাবে ব্যবসায়ীদের ওপর কালিমা লেপন করা অনুচিত। এ ধরনের ভুক্তভোগীদের ব্যবসা পরিচালনার সুযোগ করে দিতে হবে। তবে যারা অন্যায়ের সঙ্গে জড়িত ছিল তাদের অবশ্যই আইনের আওতায় আনতে হবে।

নিউ মার্কেট ফুটপাতে পোশাক ব্যবসায়ী মো. মাহবুব বলেন, শুরুতে বিক্রি খুব বেশি ছিল না। তবে গত কয়েক দিনে ক্রেতা বাড়তে শুরু করেছে। সারা দিন কাস্টমার কিছু কম থাকলেও সন্ধ্যার পর ভিড় বাড়তে থাকে। এখন প্রতিদিনই রাত ২টা থেকে ৩টা পর্যন্ত কেনাকাটা হয়।

গাউছিয়া মার্কেটের মেয়েদের পাইকারি থ্রি-পিস ব্যবসায়ী ‘ফেব্রিক্স প্লাস’-এর কর্ণধার শামিম রহমান আমার দেশকে জানান, প্রতি বছর ঈদকে কেন্দ্র আমাদের ব্যবসা ভালো হয়। এ বছরও তার ব্যতিক্রম নয়। অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার খুচরা ব্যবসায়ীদের চাহিদা বেশি । সব মিলিয়ে ব্যবসা আলহামদুলিল্লাহ আশানুরূপ হয়েছে।

পোশাকের পাশাপাশি গহনা এবং প্রসাধনীর কিনতে চাঁদনি চক ও গাউছিয়া মার্কেটে নারী ক্রেতাদের ভিড় থাকে চোখে পড়ার মতো। মেকআপ আইটেম থেকে শুরু করে ইমিটেশন গহনার বিক্রি বেড়েছে কয়েকগুণ। অন্যদিকে, জুতার দোকানগুলোতেও ভিড় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে ব্যবসায়ীরা। বাটা বা এপেক্সের মতো বড় ব্র্যান্ডের পাশাপাশি স্থানীয় কারিগরদের তৈরি জুতাও বেশ জনপ্রিয়তা পাচ্ছে।

গাউছিয়া মার্কেটের গহনা ব্যবসায়ী মো. রাসেল বলেন, আমরা এক মাস ধরে দিন-রাত পরিশ্রম করেছি। ক্রেতাদের যে সাড়া পাচ্ছি, তাতে পেছনের সব ক্লান্তি দূর হয়ে গেছে। এবারের বাণিজ্য আমাদের বিগত সব রেকর্ড ভেঙে দিতে পারে।

ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনেকে আগেভাগেই প্রয়োজনীয় জিনিস কেনার চেষ্টা করছেন, যাতে শেষ মুহূর্তের ভিড় এড়ানো যায়। আবার কেউ কেউ পরিবারের সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে বাজারে আসছেন।

নিউ মার্কেটে কেনাকাটা করতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী জুবায়ের আহমেদ বলেন, পরিবারের সদস্যদের জন্য নতুন পোশাক কেনা ঈদের অন্যতম আনন্দের অংশ। তবে এবার খরচ কিছুটা হিসাব করতে হচ্ছে। দ্রব্যমূল্যের চাপ থাকায় ঈদ বাজেট সীমিত রাখতে হচ্ছে।

ডিজিটালে লেনদেন

এবারের ঈদ বাজারের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো লেনদেনের ডিজিটাল মাধ্যম। নগদ টাকার পরিবর্তে মানুষ এখন মোবাইল ব্যাংকিং ও ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছে। বিভিন্ন ব্যাংক ও পেমেন্ট গেটওয়ে প্রতিষ্ঠানগুলো নানারকম ডিসকাউন্ট ও ক্যাশব্যাক অফার দিচ্ছে, যা কেনাকাটার আনন্দকে আরো বাড়িয়ে তুলছে। অনলাইন শপিং প্ল্যাটফর্মগুলোও পিছিয়ে নেই; ঘরে বসে পছন্দের পণ্য পাওয়ার সুবিধায় ই-কমার্স খাতেও বিক্রি আশানুরূপ হচ্ছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সতর্ক অবস্থান

এদিকে ক্রেতাদের নিরাপদ চলাচল ও ছিনতাই রোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে পুলিশের টহল জোরদার করা হয়েছে। মার্কেট এলাকায় সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে নিউ মার্কেট থানার অস্থায়ী সাব কন্ট্রোল রুমে দায়িত্বরত এএসআই মাহমুদুল আলম আমার দেশকে জানান, পুলিশের নজরদারি বাড়ানোর ফলে এখন পর্যন্ত কোনো বড় ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। বাজারে আসা মানুষজন নির্ভয়ে তাদের পছন্দের জিনিস কিনে বাড়ি ফিরতে পারছেন। যেকোনো ধরনের চুরি বা ছিনতাই রোধে আমরা তৎপর রয়েছি।

বাজার-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঈদকে ঘিরে প্রতি বছরই বড় অঙ্কের লেনদেন হয়। পোশাক খাতের পাশাপাশি জুতা, প্রসাধনী, ইলেকট্রনিক পণ্য, মিষ্টান্ন ও বিভিন্ন উপহারসামগ্রীর বাজারেও বিক্রি বাড়ে।

বণিক সমিতির নেতারা জানান, ঈদের আগে সাধারণত শেষ ৭ থেকে ১০ দিন বাজারে সবচেয়ে বেশি ভিড় দেখা যায়। তখনই বিক্রির বড় অংশ সম্পন্ন হয়। তাই সামনে দিনগুলোতে কেনাকাটা আরো বাড়বে। শেষ মুহূর্তে বাজারে ক্রেতার চাপ বাড়লে এবারের ঈদ মৌসুমে ভালো বিক্রি হবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...