আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

আদালতের রায়ের অপব্যাখ্যা

পুরুষের জন্য দ্বিতীয় বিয়ে এত সহজ নয়

এম এ নোমান

পুরুষের জন্য দ্বিতীয় বিয়ে এত সহজ নয়
প্রতীকী ছবি

হাইকোর্ট ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশটি বহাল রাখার পক্ষে রায় দিয়েছে। এতে কোনো পুরুষ চাইলেই যেনতেনভাবে প্রথম স্ত্রীর অনুমতি নিয়েও দ্বিতীয় বিয়ে করতে পারবেন না। এজন্য তাকে নির্দিষ্ট ফি পরিশোধ করে এ সংক্রান্ত সালিশি কাউন্সিলের অনুমোদনও নিতে হবে। এ অভিমত আইন বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীদের।

আইন মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, বিয়ে সংক্রান্ত একটি রিটের রায়ের উদ্ধৃতি দিয়ে গণমাধ্যমগুলো ভুল ও অপতথ্য ছড়িয়েছে। গণমাধ্যমগুলো ‘পুরুষের জন্য দ্বিতীয় বিয়েতে লাগবে না প্রথম স্ত্রীর অনুমতি’ সংক্রান্ত প্রতিবেদনটি আদালত অবমাননার শামিল। হাইকোর্ট এমন কোনো রায় দেয়নি বলেও জানান ওই কর্মকর্তা।

বিজ্ঞাপন

হাইকোর্টের রায় ও দ্বিতীয় বিয়ে সংক্রান্ত প্রতিবেদনের বিষয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীরাও। তাদের অভিমত, হাইকোর্টের রায়ে নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্যই পারিবারিক জীবন ও অধিকারকে সমানভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে। রায়ে রিট খারিজ হয়ে যাওয়ার কারণে ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশটি হুবহু প্রতিপালনের বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়েছে।

দ্বিতীয় বিয়ে বা বহুবিবাহের বিষয়ে ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইনের ৬(১) ধারায় বলা হয়েছে, ‘কোনো ব্যক্তির বিবাহ বলবত থাকিতে সে সালিশি কাউন্সিলের লিখিত পূর্বানুমতি ব্যতীত কোনো বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হইতে পারিবে না বা ঐরূপ অনুমতি ছাড়া অনুষ্ঠিত কোনো বিবাহ ১৯৭৪ সনের মুসলিম বিবাহ ও তালাক (রেজিস্ট্রিকরণ) আইন-এর অধীনে রেজিস্ট্রিকৃত হইবে না।’

একই আইনের একই ধারার ২ নম্বর উপধারায় বলা হয়েছে, ‘১ নং উপধারা অনুযায়ী অনুমতির দরখাস্ত নির্ধারিত ফিস-সহ চেয়ারম্যানের নিকট নির্দিষ্ট দপ্তরে দাখিল করিতে হইবে ও উহাতে প্রস্তাবিত বিবাহের কারণসমূহ এবং এই বিবাহের ব্যাপারে বর্তমান স্ত্রী অথবা স্ত্রীগণের সম্মতি লওয়া হইয়াছে কি না উহার উল্লেখ থাকিবে।’

সালিশি কাউন্সিলে আবেদন করার প্রক্রিয়া সম্পর্কে একই ধারার ৩ নম্বর উপধারায় বলা হয়েছে, ‘দরখাস্ত গ্রহণ করিবার পর চেয়ারম্যান আবেদনকারীকে ও বর্তমান স্ত্রী অথবা স্ত্রীগণের প্রত্যককে একজন করিয়া প্রতিনিধি মনোনীত করিতে বলিবেন। উক্তরূপে গঠিত সালিশি কাউন্সিল প্রস্তাবিত বিবাহ প্রয়োজনীয় ও ন্যায়সংগত বলিয়া মনে করিলে যুক্তিযুক্ত বলিয়া মনে হইতে পারে এমন সকল শর্ত থাকিলে তৎসাপেক্ষে প্রার্থিত আবেদন মঞ্জুর করিতে পারেন।

৪ নম্বর উপধারায় বলা হয়েছে, ‘দরখাস্তের বিষয় নিষ্পত্তি করিবার নিমিত্ত সালিশি কাউন্সিল নিষ্পত্তির কারণাদি লিপিবদ্ধ করিবেন। নির্দিষ্ট সময় মধ্যে যে কোন পক্ষ নির্দিষ্ট ফিস প্রদানক্রমে নির্দিষ্ট দপ্তরে সংশ্লিষ্ট সহকারী জজের নিকট পুনর্বিবেচনার নিমিত্ত দরখাস্ত দাখিল করিতে পারে এবং তাহার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হইবে ও কোন আদালতে এ সম্বন্ধে প্রশ্ন উত্থাপন করা যাইবে না।’

অনুমোদন ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ের শাস্তি

সালিশি কাউন্সিলের অনুমোদন না নিয়ে কোনো পুরুষ দ্বিতীয় বিয়ে করলে তা হবে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এমনটি উল্লেখ করা হয়েছে আইনের ৬ ধরার (৫)(ক) উপধারায়। এতে বলা হয়েছে, ‘কোনো ব্যক্তি যদি সালিশি কাউন্সিলের অনুমতি ব্যতীত অন্য বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়, তবে সে বর্তমান স্ত্রী অথবা স্ত্রীগণের তলবী ও স্থগিত দেনমোহরের সম্পূর্ণ টাকা তৎক্ষণাৎ পরিশোধ করিতে হইবে। উক্ত টাকা উক্তরূপে পরিশোধ না করা হইলে বকেয়া ভূমি রাজস্বরূপে আদায়যোগ্য হইবে; এবং অভিযোগে অপরাধী সাব্যস্ত হলে এক বৎসর পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড অথবা দশ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় প্রকার দণ্ডনীয় হইবে।’

হাইকোর্টের রায় ও বিভ্রান্তি

মুসলিম পারিবারিক আইনের ৬ ধারাটি চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টের একজন আইনজীবী ২০২১ সালের ডিসেম্বরে হাইকোর্টে রিট করেন। এতে বলা হয়, একজন পুরুষের একাধিক স্ত্রী রাখার বিধান এ আইনে রাখা হলেও তাদের প্রতি ন্যায়বিচার ও সমঅধিকার নিশ্চিত করার বিষয়ে কোনো বিধান নেই। সালিশি কাউন্সিলের অনুমতি নিয়ে একাধিক বিয়ে করার বিধান রাখা হয়েছে। তবে স্ত্রীদের ভরণ-পোষণসহ অন্যান্য বিষয়গুলো যাচাই-বাছাই করার ক্ষমতা এ কাউন্সিলকে দেওয়া হয়নি। এতে নারীর অধিকার ক্ষুণ্ণ হচ্ছে বলেও রিটে দাবি করা হয়।

এ রিটের ওপর শুনানি শেষে হাইকোর্টের একটি ডিভিশন বেঞ্চ ২০২২ সালের ৫ জানুয়ারি রুল জারি করে। এতে ‘স্ত্রীদের মধ্যে সমঅধিকার নিশ্চিত না করে বিয়ে বলবৎ থাকা অবস্থায় আরেকটি বিয়ের অনুমতি দেওয়ার প্রক্রিয়া কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না’ সে কারণ জানতে চাওয়া হয়। পাশাপাশি ‘পারিবারিক জীবনের বৃহত্তর প্রয়োজনে বহুবিবাহ আইনের ক্ষেত্রে নীতিমালা প্রণয়ন করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না’—সে বিষয়টিও জানতে চাওয়া হয় রুলে।

সরকারপক্ষের আইনজীবীরা এ রুলের জবাব দেওয়ার পর পূর্ণাঙ্গ শুনানি শেষে হাইকোর্ট রিট আবেদনটি খারিজ করে দেয়। গত বছর ২০ আগস্ট হাইকোর্ট রায় ঘোষণা করার পর ডিসেম্বরে লিখিত রায় প্রকাশ হয়। রায়ে বলা হয়েছে, ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইনের ৬ ধারা বহুবিবাহের অনুমতি প্রক্রিয়ায় দেশের নারীদের কোনো মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন করে না। রুলের পক্ষে উত্থাপিত যুক্তির সারবত্তা নেই। তাই রুল ডিসচার্জ (খারিজ) করা হলো।

রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, আইনটি নারী কিংবা পুরুষের অধিকার খর্ব করে না। এটি সালিশি কাউন্সিলের অনুমতি দেওয়া বা প্রত্যাখ্যানের ক্ষেত্রে কোনো বাধা সৃষ্টি করে না। কাউন্সিল কারো উপরই বিয়ের বিষয়ে একতরফা সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয় না।

হাইকোর্টের এ পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর দেশের অধিকাংশ গণমাধ্যমে ‘দ্বিতীয় বিয়ে করতে স্ত্রীর অনুমতি লাগবে না’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ করে। কোনো কোনো সংবাদপত্র হাইকোর্টের রায়ের উদ্ধৃতি দিয়েও এ ধরনের সংবাদ প্রকাশ করে। কোনো কোনো গণমাধ্যম এমন সংবাদের ফটোকার্ড করে সামাজিক যোগাযোগ মধ্যমে প্রকাশ করে। এতে হাইকোর্টের রায় নিয়ে দেশব্যাপী বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয় বলে জানিয়েছেন আইন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।

গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে হাইকোর্টের রায়ের ভুল ব্যাখ্যা করা হয়েছে উল্লেখ করে আইন মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আমার দেশকে বলেন, হাইকোর্ট তার রায়ে মুসলিম পারিবারিক আইনকে পুরোপুরি বহাল রেখেছে। যেখানে স্বামী ও স্ত্রীর অধিকার পুরোপুরি সংরক্ষণ করা হয়েছে।

তিনি বলেন, সংবাদমাধ্যমগুলোর ভুল রিপোর্ট হাইকোর্ট সম্পর্কে জনমনে একটি ভুল ধারণ তৈরি করতে পারে। শুধু আদালতই নয়, যেকোনো সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে গণমাধ্যমগুলোর আরো যাচাই-বাছাই করা উচিত।

সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ সালেহউদ্দিন আমার দেশকে বলেন, আদালতের রায়কে ভুলভাবে উপস্থাপনের ফলে জনমনে যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে তার পুরো দায় সংবাদমাধ্যমুগলোর। কারণ আদালত যে রায় দেয়নি, সেটাকে আদালতের রায়ের কথা বলে পত্রিকাগুলো হেডলাইন করে সংবাদ প্রকাশ করে দিয়েছে। তিনি বলেন, সংবাদমাধ্যমগুলো যে সংবাদ প্রকাশ করেছে তাতে রায় ও আইনের বিষয়ে কিছু না লিখে সরাসরি মুসলিম ঐতিহ্য ও ইসলামিক রীতির ওপর সরাসরি আঘাত করা হয়েছে। আর এর দায় দেওয়া হয়েছে আদালতের ওপর। এটি সুস্পষ্টভাবে আদালত অবমাননার শামিল।

অ্যাডভোকেট সালেহউদ্দিন বলেন, হাইকোর্টের রায়ের কথা বলে গণমাধ্যমে মিথ্যা রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। আর একশ্রেণির আলেম এ সংবাদগুলোকে যাচাই-বাছাই না করেই আদালত ও সরকারের বিরুদ্ধে বিষোদগার শুরু করে দিয়েছেন। কেউই প্রকৃত তথ্য যাচাই-বাছাই করেননি। এভাবেই সামাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...