ব্যাংকের সুশাসন নিশ্চিত করতে পরিচালকরা বছরে টানা তিন মাসের বেশি ছুটি নিতে পারবেন না—এমন বিধান যুক্ত করার প্রস্তাব করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বর্তমান আইনে পরিচালকদের ছুটির নির্দিষ্ট সময়সীমা না থাকায় রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অনেকেই দীর্ঘদিন অনুপস্থিত থেকেও পর্ষদে বহাল রয়েছেন, যা ব্যাংক পরিচালনা ও আমানতকারীদের স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর হয়ে উঠছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যবস্থা নিতে চাইলেও বিদ্যমান আইনের সীমাবদ্ধতার কারণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া যাচ্ছে না।
এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংক কোম্পানি (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর একটি খসড়া তৈরি করেছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ খসড়াটি ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে অংশীজনদের মতামত গ্রহণ করেছে। গত বুধবার আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেকের সভাপতিত্বে সংশ্লিষ্টদের নিয়ে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে তাদের দোসরদের মধ্যে মধুমতি ব্যাংকের শেখ সালাউদ্দিন জুয়েল, শেখ ফজলে নূর তাপস ও সৈয়দ রেজাউর রহমানসহ প্রায় ৫০ জন পরিচালক আত্মগোপনে রয়েছেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ বিদেশে অবস্থান করছেন। দীর্ঘ সময় ধরে তারা কোনো বোর্ডসভায় উপস্থিত না থাকলেও পরিচালক পদে বহাল রয়েছেন।
ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী, পর্ষদের অনুমোদন ব্যতীত কোনো পরিচালক টানা তিনটি বোর্ডসভা বা তিন মাসের বেশি সময় অনুপস্থিত থাকলে তার পদ শূন্য হওয়ার কথা। তবে বাস্তবে চেয়ারম্যান ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর পর্ষদ ছুটি বাড়িয়ে এসব পরিচালককে পদে বহাল রাখছে। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ মধুমতি ব্যাংক।
মধুমতি ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, ১৬ মাস ধরে ব্যাংকের পরিচালক শেখ সালাউদ্দিন জুয়েল ও শেখ ফজলে নূর তাপস কোনো বোর্ডসভায় অংশ নেননি। তবুও ব্যাংকের চেয়ারম্যান হুমায়ূন কবীর নিয়মিতভাবে তাদের ছুটি অনুমোদন দিয়ে পরিচালক পদে বহাল রেখেছেন। অনেক সময় ই-মেইল ও হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে ছুটির আবেদন পাঠানো হয়, আবার কখনো আবেদন ছাড়াই ছুটি বাড়ানো হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, টানা তিন মাস বিদেশে অবস্থান করলে বিকল্প পরিচালক নিয়োগের বিধান থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। চেয়ারম্যানরা ইচ্ছামতো ছুটি বাড়িয়ে পরিচালকদের অবৈধভাবে বোর্ডে থাকার সুযোগ করে দিচ্ছেন। নতুন আইন কার্যকর হলে দীর্ঘদিন বোর্ডসভায় অনুপস্থিত থাকলে সংশ্লিষ্ট পরিচালকের পদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে। তাই আইনটি দ্রুত পাস হওয়া জরুরি বলে মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
খসড়া সংশোধনী আইনে বলা হয়েছে, কোনো ব্যাংক কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ কোনো পরিচালককে টানা তিন মাসের বেশি সময় সভায় অনুপস্থিত থাকার অনুমতি দিতে পারবে না। বছরে সর্বোচ্চ একবার এ ধরনের অনুমতি দেওয়া যাবে।
এছাড়া খসড়া আইনে ব্যাংকে ব্যক্তি, পরিবার ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শেয়ারধারণের ওপর সীমা আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রস্তাব অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি, পরিবার বা প্রতিষ্ঠান সরাসরি বা পরোক্ষভাবে একাধিক ব্যাংকে একসঙ্গে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ শেয়ার ধারণ করতে পারবে না। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যদি একটি ব্যাংকের মোট শেয়ারের ২ শতাংশ বা তার বেশি ধারণ করে, তবে একই সময়ে অন্য কোনো ব্যাংকের ২ শতাংশ বা তার বেশি শেয়ার রাখতে পারবে না। সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংক খাতে অনিয়ম ও দুর্বলতার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে কোনো একক গোষ্ঠীর অতিরিক্ত প্রভাব কমাতেই এ প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
তবে শেয়ার মালিকানার সীমা আরোপের প্রস্তাব নিয়ে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশ (এবিবি) এ প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছে। এবিবির প্রতিনিধিদের যুক্তি, সাধারণ শেয়ারহোল্ডাররা ব্যাংকের নীতিনির্ধারণে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারেন না, এ ক্ষমতা পরিচালনা পর্ষদের হাতে থাকে। পাশাপাশি একই পরিবারের একাধিক সদস্যের পর্ষদে থাকার সংখ্যা কমানোর প্রস্তাব আগেই আসায় শেয়ার মালিকানায় আলাদা সীমা আরোপ অপ্রয়োজনীয়।
তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, অতীতে কিছু বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী একসঙ্গে একাধিক ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে খাতটির ব্যাপক ক্ষতি করেছে। উদাহরণ হিসেবে তারা এস আলম গ্রুপের কথা উল্লেখ করেন। গ্রুপটি একাধিক ব্যাংকে সংখ্যাগরিষ্ঠ শেয়ারধারণ করে নীতিনির্ধারণে প্রভাব বিস্তার করেছে, যার ফলে হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ হয়েছে এবং অসংখ্য আমানতকারী চরম বিপাকে পড়েছেন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


যুক্তরাষ্ট্র সফর করবেন ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট
গাজা ‘শান্তি বোর্ডে’ যোগ দিলো পাকিস্তান