আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

ঢাবি অধিভুক্ত সাত কলেজে চলছে ফাইনাল পরীক্ষার প্রশ্ন বাণিজ্য

ঢাকা কলেজ প্রতিনিধি

ঢাবি অধিভুক্ত সাত কলেজে চলছে ফাইনাল পরীক্ষার প্রশ্ন বাণিজ্য

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত রাজধানীর সরকারি সাত কলেজে দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অনার্স থেকে মাস্টার্স পর্যন্ত ফাইনাল পরীক্ষার প্রশ্ন অর্থের বিনিময়ে ফাঁসের তথ্য উঠে এসেছে ইলিয়াস চক্রের বিরুদ্ধে। যার আওতায় অধিকাংশ শিক্ষার্থী জড়িত বলে দাবি করছে বিশ্বস্ত সূত্র।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, রাজধানীর এই কলেজগুলোতে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অনার্স প্রথম বর্ষ থেকে মাস্টার্সের ফাইনাল পরীক্ষার প্রশ্ন দীর্ঘ সময় ধরে একটি সংঘবদ্ধ চক্রের মাধ্যমে ফাঁস হয়ে আসছে। এই চক্র পরীক্ষার তিন থেকে চার দিন আগে অত্যন্ত গোপনীয়তা বজায় রেখে কলেজগুলোর অধিকাংশ শিক্ষার্থীর মাঝে অর্থের বিনিময়ে প্রশ্ন সরবরাহ করছে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে।

বিজ্ঞাপন

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী জানান, প্রশ্ন নেওয়ার আগে আমাদের কাছ থেকে বিভিন্ন ধর্মীয় গ্ৰন্থ শপথ করানো হয়, এই বিষয়টি যেন অন্য কারও কাছে প্রকাশ না করি। শুরুতে প্রথম দুই দিন বিষয়টি কঠোরভাবে গোপন রাখার চেষ্টা করি। কিন্তু পরীক্ষার হলে গিয়ে বাস্তব চিত্র ভিন্ন দেখা যায়, প্রায় সবার মুখেই একই কথা শোনা যায়। পরীক্ষা শেষে দেখা যায়, সবাই বলছে প্রশ্নগুলো ‘কমন’ পড়েছে। ধীরে ধীরে বিষয়টি সবার কাছে স্বাভাবিক হয়ে যায়।

সূত্র অনুযায়ী, পরীক্ষার পুরো এক সেট প্রশ্নের জন্য শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে দেড় থেকে আড়াই হাজার এবং একেকটি কলেজের প্রতি সেশন থেকে প্রায় দেড় লাখ টাকা করে আদায় করা হচ্ছে। প্রশ্নের দাম নিয়ে দরকষাকষির একটি রেকর্ডের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়েছে। চক্রটি দীর্ঘ সময় ধরে একই কৌশলে প্রশ্ন ফাঁস করে আসলেও এতদিন বিষয়টি প্রকাশ্যে আসেনি।

আরেক শিক্ষার্থী জানান, পরীক্ষার তিন থেকে চার দিন আগেই আমাদের হাতে প্রশ্ন তুলে দেওয়া হতো। একটি সম্পূর্ণ সেট প্রশ্নের জন্য কারো কাছ থেকে দেড় হাজার টাকা, আবার কারো কাছ থেকে দুই হাজার থেকে আড়াই হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে। তারা যে প্রশ্নগুলো দিয়েছিল, পরীক্ষায় তার সবই কমন পড়েছে।

তথ্য অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই প্রশ্ন ফাঁস চক্রের মূল হোতা হিসেবে ঢাকা কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অফিস সহকারী ও সাবেক শিক্ষার্থী ইলিয়াস হোসেনের নাম উঠে এসেছে। তার সঙ্গে ঢাকা কলেজের কিছু শিক্ষার্থী জড়িত আছে বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে।

প্রশ্ন ফাঁসের বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ উঠে আসে অনার্স চতুর্থ ও দ্বিতীয় বর্ষ রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ফাইনাল পরীক্ষায়। অনুসন্ধানে জানা যায়, পরীক্ষার দিন এক শিক্ষার্থীকে বলতে শোনা যায়, “আজকের পরীক্ষায় যে প্রশ্ন এসেছে, সেটা আগেই জানতাম।”

পরবর্তীতে তার মোবাইলে থাকা সরবরাহকৃত প্রশ্নের সঙ্গে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র মিলিয়ে দেখা হলে হুবহু মিল পাওয়া যায়। এতে প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ আরও জোরালো হয়। অনার্স প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় বর্ষের পরীক্ষায়ও একই চিত্র।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, অনার্স প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষাগুলোতেও একইভাবে প্রশ্ন সরবরাহ করা হচ্ছে। প্রতিটি পরীক্ষার জন্য ছয় থেকে সাতটি করে সম্ভাব্য প্রশ্ন আগেই সরবরাহ করা হয়। এখন পর্যন্ত প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ বর্ষের পরীক্ষার প্রশ্নপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সরবরাহকৃত প্রশ্নগুলোর মধ্য থেকেই সব প্রশ্ন পরীক্ষায় এসেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ইলিয়াস ভাইয়ের মাধ্যমে প্রশ্ন ফাঁস হচ্ছে। আমরা কঠোর পরিশ্রম করে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করি, অথচ এই চক্রের কারণে সেই পরিশ্রমের মূল্য নষ্ট হয়ে যায়। প্রশ্ন ফাঁস হলে মেধাবী ও পরিশ্রমী শিক্ষার্থীরা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং পুরো পরীক্ষার ফলাফলের বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়ে ফেলে। এদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্ৰহণ করা দরকার।

প্রশ্ন ফাঁসের বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত ইলিয়াস হোসেন বলেন, এটা মিথ্যা এলিগেশন। আর টাকা নেওয়ার বিষয়টা সম্পূর্ণ মিথ্যা। আমি রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে মাঝখানে দুই বছর ছিলাম না, অর্থাৎ এখানে একটানা থাকা হয়নি। গত ৫ আগস্টের পর পুনরায় ডিপার্টমেন্টে আসা শুরু করেছি।

তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের বিষয়টা হচ্ছে এমন ২৪ সালের পরীক্ষার জন্য ওরা ফলো করে ২২ সাল, ২১ সাল ও ২০ সাল এইভাবে ঘুরে আসে। যেমন, যেটা ২১ সাল, সেটা হচ্ছে ২৩ সাল; যেটা ২২ সাল, সেটা হচ্ছে ২০ সাল। মানে আমাদের ক্ষেত্রে ২২ সালের সিলেবাস পড়লে ওখান থেকে অন্তত চারটা কমন পাওয়া যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেমিস্টারের প্রশ্ন থেকেও ম্যাক্সিমাম প্রশ্ন কমন থাকে।

এবিষয়ে ঢাকা কলেজ রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক মোঃ আবু সালেক খান বলেন, এবিষয়ে আমি অবগত না। ঘটনাটির সত্যতা প্রমাণিত হলে তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক হিমাদ্রি শেখর চক্রবর্তী বলেন, প্রশ্ন ফাঁসের কোনো বিষয় আমার কানে আসেনি। প্রশ্ন ফাঁস হচ্ছে এ ধরনের নির্ভরযোগ্য তথ্য আমাদের কাছে এলে তা অবশ্যই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হবে। উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানোর পর তদন্ত কমিটি গঠন করবে এবং ঘটনার সত্যতা ও এর সাথে যারা জড়িত তাদের বের করবে। এরপর কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এবিষয়ে জানতে চাইলে প্রস্তাবিত ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসক অধ্যাপক এ কে এম ইলিয়াস বলেন, এবিষয়ে আমি অবগত না। আগে এমনটা শুনি নাই। বিষয়টির প্রমাণ পেলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাত কলেজের অধিভুক্ত বাতিল ঘোষণা করে। তবে শিক্ষাবর্ষ ২০২৩-২৪ থেকে বিদ্যমান শিক্ষার্থীদের ঢাবির অধীনেই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন