আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

সরকার যাত্রীদের কাছে যৌক্তিক মুল্যে টিকেট পৌছে দিতে অঙ্গীকারবদ্ধ

স্টাফ রিপোর্টার

সরকার যাত্রীদের কাছে যৌক্তিক মুল্যে টিকেট পৌছে দিতে অঙ্গীকারবদ্ধ

বর্তমান সরকার যৌক্তিক মুল্যে টিকেট যাত্রীসাধারনের কাছে পৌছে দিতে অঙ্গীকারবদ্ধ বলে জানিয়েছেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন উপদেষ্টা শেখ বশির উদ্দিন।

তিনি বলেন, বর্তমান সরকার যৌক্তিক মুল্যে টিকেট যাত্রীসাধারনের কাছে পৌছে দেবার জন্য ট্রাভেল এজেন্সি (নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাদেশ, ২০২৬ গেজেট আকারে প্রকাশিত করেছে । টিকেটের দাম বর্তমানে কিছুটা কমলেও আমরা চাই আরো কমাতে। যাতে প্রয়োজনীয় সংবেদশীলতা তৈরি হয়।

বিজ্ঞাপন

সোমবার সচিবালয়ে ‘ট্রাভেল এজেন্সি (নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬’ নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে উপদেষ্টা এ কথা জানান।

এ সময় বিমান মন্ত্রনালয়ের সচিব নাসরিন জাহান , অতিরিক্ত সচিব ফারহিম ভীনা উপস্থিত ছিলেন।

এ সরকারের আমলে থার্ড টার্মিনাল চালু হবে কি না- জানতে চাইলে উপদেষ্টা বলেন, ‘না, এ সরকারের সময় চালু করতে পারবো না।’

তিনি বলেন, ‘থার্ড টার্মিনাল চালুর জন্য আমাদের প্রাণান্ত চেষ্টা ছিল। আমি নিজে ব্যক্তিগতভাবে জাপানিজ ভাইস মিনিস্টারের সঙ্গে মিটিং করেছি। আমরা দরকষাকষি করেছি। আমরা চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমাদের প্রচেষ্টা সম্ভবত সফল হয়নি।’উপদেষ্টা বলেন, ‘এটার যে পদ্ধতিগত প্রয়োজনগুলো রয়েছে পরবর্তী কর্মকাণ্ডের জন্য, সেই পদ্ধতিগত প্রয়োজনগুলো আমরা সচল করার জন্য বর্তমানে নিয়োজিত আছি। পরবর্তী সরকার এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।’

সংবাদ সম্মেলনে বিমান সচিব নাসরিন জাহান বলেন, গত ১ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে ট্রাভেল এজেন্সি (নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩ সংশোধন করে ট্রাভেল এজেন্সি (নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাদেশ, ২০২৬ গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়েছে। অফলাইন ও অনলাইন ট্রাভেল এজেন্সি ব্যবসা পরিচালনায় গ্রাহকসেবা, টিকেটের ন্যায্যমূল্য, আকাশপথ পরিবহণ খাতে সুশাসন নিশ্চিতকরণ এবং সাধারণ যাত্রীসহ প্রবাসী কর্মীদের বিদেশ গমনে হয়রানি নিবারণকল্পে এই অধ্যাদেশ প্রণয়ন করা হয়েছে।

বিগত ২০২৫ সালে আগস্ট হতে অক্টোবর এই দুই মাসে কতিপয় অনলাইন ট্রাভেল এজেন্সি গ্রাহকের বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্নসাৎ ও প্রতারণা করে বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। ফ্লাইট এক্সপার্ট, এফইবিডি, মক্কা ট্যুরস এন্ড ট্রাভেলস, ফ্লাই ফার ইন্টারন্যাশনাল এবং সর্বশেষ ট্রাভেল বিজনেস পোর্টাল পালিয়ে যায়। এছাড়া বিভিন্ন ট্রাভেল এজেন্সি কর্তৃক গ্রাহকদের অর্থ আত্নসাৎ, চটকদার প্রলোভনের মাধ্যমে প্রতারণা এবং অভিবাসী শ্রমিকদের কাছে অযৌক্তিকমূলে টিকিট বিক্রয়ের অসংখ্যা অভিযোগ সরকারের গোচরীভূত হয়েছে।

ট্রাভেল এজেন্সি সংক্রান্ত আইনের মূল উদ্দেশ্য বৈধ ব্যবসা পরিচালনার পাশাপাশি জনসাধারণ বা গ্রাহকের সুরক্ষা প্রদান তা ২০১৩ সালের আইনে দৃশ্যমান ছিলনা। বর্তমান অধ্যাদেশে প্রধানত অভিবাসী সুরক্ষাসহ গ্রাহক/আকাশপথে যাত্রী সুরক্ষা এবং টিকিটের যৌক্তিকমূল্য নির্ধারণে বিষয়ে বিভিন্ন বিধান সংযোজন করা হয়েছে।

সচিব জানান, নতুন অধ্যাদেশে ব্যাংক গ্যারান্টির পরিমাণ অনলাইন ট্রাভেল এজেন্সির জন্য ১ (এক) কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। কারণ অনলাইন এজেন্সিগুলোর বাজার অনেক বড়, দৈনিক লেনদেনের পরিমাণ বেশি এবং সাধারণ যাত্রী ও প্রবাসী কর্মীদের কাছ থেকে অগ্রিম অর্থ সংগ্রহের ঝুঁকিও তুলনামূলকভাবে বেশি। ফলে ভোক্তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং সম্ভাব্য আর্থিক প্রতারণা ও ঝুঁকি মোকাবিলার জন্য এই উচ্চতর ব্যাংক গ্যারান্টি অত্যাবশ্যক। অন্যদিকে, অফলাইন ট্রাভেল এজেন্সিগুলোর কার্যক্রমের পরিসর সীমিত হওয়ায় তাদের জন্য ব্যাংক গ্যারান্টি ১০ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

তিনি উল্লেখ করেন, অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, বিশেষ করে অভিবাসী কর্মীদের ক্ষেত্রে ট্রাভেল এজেন্সি কর্তৃক অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, ভুয়া বুকিং, টিকিট কনফার্মেশন না থাকা সত্ত্বেও অর্থ আদায় এবং অননুমোদিত এজেন্সির মাধ্যমে টিকিট ক্রয়ের কারণে ব্যাপকভাবে প্রতারণার শিকার হয়েছেন। নতুন আইন এই ধরনের অনিয়ম বন্ধ করতে এবং প্রবাসী কর্মীদের আকাশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সুরক্ষা প্রদানের ক্ষেত্রে অধিকতর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। অধ্যাদেশের ৯ এর (অ) উপধারার (৩) অনুযায়ী টিকিটের গায়ে ট্রাভেল এজেন্সির নাম, নিবন্ধন নম্বর এবং টিকিটের প্রকৃত মূল্য লেখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এতে ভোক্তাদের জন্য নির্ভরযোগ্য এবং জবাবদিহি তথ্যপ্রাপ্তি নিশ্চিত করা হয়েছে।

নাসরিন জাহান বলেন, নতুন অধ্যাদেশে সাধারণ যাত্রীদের স্বার্থ রক্ষার জন্য বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংজ্ঞা ও বিধান সংযোজন করা হয়েছে। বিশেষভাবে অগ্রিম অর্থ আদায়ের মাধ্যমে ছোট এজেন্সিগুলোকে জিম্মি করার প্রবণতা রোধ, ভুয়া বা ফলস বুকিংয়ের মাধ্যমে আসন ব্লক করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি বন্ধ করা এবং এজেন্সি-টু-এজেন্সি (বিটুবি) লেনদেনকে স্বচ্ছ করার বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এতে প্রত্যেক এজেন্সিকে সরাসরি এয়ালাইন্স বা নির্ধারিত সোর্স (জিডিএস, এনডিসি, ওয়েব পোটাল) হতে টিকিট সংগ্রহ করতে হবে। ফলে এতে টিকিট সিন্ডকেটশন প্রতিহত করার পাশাপাশি হাত বদল বন্ধ হওয়ার ফলে টিকিটের যৌক্তিক মূল্য নির্ধারিত হবে। এ অধ্যাদেশে ফলস বুকিং বা বানোয়াট তথ্য দিয়ে আসন আটকে রাখাকে অপরাধ হিসাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে এবং জিডিএসের আইডি বা পাসওয়ার্ড শেয়ার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ফলে সিন্ডিকেট কর্তৃক টিকিটের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকে প্রতিহত করা সম্ভব হবে।

নিবন্ধন শর্তাবলি ও আর্থিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে কতিপয় পরিবর্তন আনা হয়েছে। ঋণখেলাপি ব্যক্তিকে নিবন্ধন না দেওয়া, প্রতারণামূলক কার্যক্রমে জড়িত না থাকার কঠোর হলফনামা, একই পরিবারের নামে একাধিক এজেন্সির প্রকৃত মালিকানা ও অর্থের উৎস প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে সৎ ব্যবসায়ীদের সুরক্ষা এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।

নিবন্ধন নবায়নের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হয়েছে। প্রতিটি এজেন্সিকে নিয়মিত আর্থিক বিবরণী ও কার্যক্রম প্রতিবেদন দাখিল করতে হবে এবং সন্তোষজনক হলে প্রতি ৩ বছর পর নবায়ন করা যাবে। বিলম্বের ক্ষেত্রে জরিমানা দিয়ে নবায়নের সুযোগ বহাল রাখা হয়েছে, যাতে ব্যবসা বন্ধ না হয়ে বরং নিয়মের আওতায় আসে।

সমম্মেলনে সচিব জানান, ভুয়া বুকিং, অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, মিথ্যা বিজ্ঞাপন, প্রবাসী কর্মীদের টিকেটিংয়ে অনিয়ম, এয়ারলাইন্স সিস্টেম অবৈধভাবে ব্যবহার, লগইন আইডি ও পাসওয়ার্ড শেয়ার ইত্যাদির ক্ষেত্রে সরকার নিবন্ধন সনদ স্থগিত বা বাতিলের বিষয়ে বিধান সংযোজন করেছে। এ কঠোরতার উদ্দেশ্য কোনো সৎ ব্যবসায়ীকে হয়রানি করা নয়, বরং বাজারকে স্বচ্ছ, প্রতিযোগিতামূলক ও প্রতারণামুক্ত রাখা।

প্রবাসী কর্মীদের টিকিটিং বিষয়ে বিশেষ সুরক্ষা বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। উৎস ও গন্তব্য দেশ ব্যতীত তৃতীয় দেশ থেকে টিকিট ক্রয়-বিক্রয়, গ্রুপ বুকিংয়ে যাত্রীর তথ্য পরিবর্তন, কনসলিডেটেড পেমেন্টের মাধ্যমে অর্থ আদায় এবং টিকিটে এজেন্সির নাম, নিবন্ধন নম্বর ও প্রকৃতমূল্য উল্লেখ না করা এসব বিষয়কে শাস্তিযোগ্য করা হয়েছে, যাতে প্রবাসী কর্মীরা প্রতারণার শিকার না হন এবং সহজেই দায়ী এজেন্সি শনাক্ত করা যায়।

শাস্তি ও জরিমানার বিধান কঠোর করা হয়েছে। সর্বোচ্চ ১ বছরের কারাদণ্ড বা ১০ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান করা হয়েছে। গুরুতর অপরাধ ও প্রতারণার ক্ষেত্রে এই অধ্যাদেশে নিবন্ধন সনদ সাময়িকভাবে স্থগিত করাসহ জনস্বার্থে অভিযুক্ত ব্যক্তির দেশত্যাগ রোধে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাথে পরামর্শক্রমে সাময়িক ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন