ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিল ২৫৬৮ জন প্রার্থী। নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তারা যাচাই-বাছাইয়ে বৈধ প্রার্থী হয়েছে ১৮৪২জন এবং নানা ত্রুটির কারণে বাতিল করা হয়েছে ৭২৬জনের মনোনয়নপত্র। চারদিন যাচাই-বাছাই শেষে রোববার নির্বাচন কমিশন ( ইসি) থেকে গ্রহণ ও বাতিল প্রার্থীর সংখ্যা জানায়।
সোমবার থেকে প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র গ্রহণ ও বাতিলের বিরুদ্ধে ইসিতে আপিল করতে পারবেন। আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে অঞ্চলভিত্তিক ১০ বুথে সংক্ষুদ্ধরা আবেদন করতে পারবেন। এসব আবেদনের উপরে শুনানি গ্রহণ করা হবে আগামী ১০ থেকে ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত।
এদিকে, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টির একাংশের চেয়ারম্যান আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, স্বতন্ত্র তাসনিম জারাসহ ৭২৬ প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিলের খবর পাওয়া গেছে। এর আগে শনিবার পর্যন্ত অন্তত সাড়ে ৩০০ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়। হলফনামায় তথ্যে গলদ, তথ্য গোপন, ঋণখেলাপি, দ্বৈত নাগরিকত্বের জটিলতা, স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ক্ষেত্রে সমর্থনকারী ভোটারের তথ্যে গরমিলসহ নানা অসংগতির কারণে এসব প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। তবে তাঁদের আপিল করার সুযোগ রয়েছে।
ঢাকা-৯ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ও সাবেক এনসিপি নেত্রী তাসনিম জারার মনোনয়নপত্র বাতিল প্রসঙ্গে ঢাকা বিভাগের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (রাজস্ব) মো. আজমল হোসেন বলেন, মোট ভোটারের মধ্যে ৪ হাজার ৩০০ জনের স্বাক্ষর প্রয়োজন ছিল। সেটা ঠিকই ছিল। বরং কিছু বেশি ভোটারের স্বাক্ষর ছিল। তবে যাচাইয়ে দেখা যায়, প্রস্তাবক ও সমর্থক হিসেবে নাম দেওয়া ১০ জনের মধ্যে ৮ জন ঢাকা-৯ আসনের ভোটার। বাকি ২ জন ওই আসনের ভোটার না হওয়ায় নির্বাচনবিধি অনুযায়ী তাঁর মনোনয়নপত্র বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে তাঁর আপিলের সুযোগ আছে। এ বিষয়ে তাসনিম জারা এক ভিডিও বার্তায় বলেছেন, তিনি মনোনয়নপত্র বাতিলের বিরুদ্ধে আপিল করবেন। ঢাকা মহানগরের ১৫টি আসনে ৬৩ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। এই ১৫ আসনে বিএনপির সব প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। জামায়াতের একজন প্রার্থীসহ দুজনের মনোনয়ন স্থগিত করা হয়েছে। এসব আসনে ১৯৪ জন মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন।
প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র যাচাইয় রোববার শেষ হয়েছে। তবে ঢাকা মহানগর ও জেলায় ২০টি আসনে শনিবারের মধ্যে এই প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে। মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়া প্রার্থীরা ৫ থেকে ৯ জানুয়ারির মধ্যে আপিল করতে পারবেন। ১০ থেকে ১৮ জানুয়ারির মধ্যে আপিল নিষ্পত্তি করা হবে। তফসিল অনুযায়ী, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ভোট গ্রহণ হবে।
চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী) আসনে আনিসুল ইসলাম মাহমুদের মনোনয়নপত্র বাতিলের বিষয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তা ও চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার মো. জিয়াউদ্দীন জানান, মনোনয়নপত্রের স্বাক্ষরের সঙ্গে নির্বাচন কমিশন থেকে পাঠানো দলীয় মনোনয়নপত্রের স্বাক্ষরের মিল না থাকায় তাঁর মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। আনিসুল ইসলামের আইনজীবীর অভিযোগ, প্রার্থীর প্রস্তাবক ও সমর্থনকারীকে সম্মেলনকক্ষে ঢুকতে বাধা দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে তাঁরা আপিল করবেন।
সমর্থনকারী ভোটারদের স্বাক্ষরে গরমিলের অভিযোগে কিশোরগঞ্জ-৫ (বাজিতপুর-নিকলী) আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভাপতি ও গণতন্ত্র মঞ্চের সমন্বয়ক হাসনাত কাইয়ূমের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। এ বিষয়ে হাসনাত কাইয়ূম বলেন, ‘শুনেছি, দৈবচয়ন পদ্ধতি অনুসরণ করে ১০ জনের স্বাক্ষর যাচাই করা হয়েছে। এর মধ্যে ছয়জনের স্বাক্ষরে অমিল পায় অনুসন্ধান টিম। তবে আমি এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করব।
শেরপুর-২ (নকলা-নালিতাবাড়ী) আসনে নাগরিকত্ব জটিলতায় বিএনপির প্রার্থী ফাহিম চৌধুরীর মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ফাহিম চৌধুরী অস্ট্রেলিয়ার নাগরিকত্ব ত্যাগের দাবি করলেও এর সপক্ষে কোনো দালিলিক প্রমাণ সংযুক্ত করেননি। ময়মনসিংহ-৭ (ত্রিশাল) আসনে ৯ জন প্রার্থীর মধ্যে ৬ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। হলফনামায় একটি মামলার তথ্য গোপন করায় বিএনপির প্রার্থী মাহবুবুর রহমানের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়। তিনি এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করবেন বলে জানিয়েছেন।
স্বাক্ষর–সংক্রান্ত ত্রুটির কারণে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী চাঁদপুর–২ আসনের মোহাম্মদ আব্দুল মবিন ও জামালপুর-৩ আসনের মজিবুর রহমানের এবং ঋণ খেলাপে ঢাকা–২ আসনের কর্নেল (অব.) আবদুল হকের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। আবদুল হক জানিয়েছেন, তিনি ওই প্রতিষ্ঠান থেকে আগেই পদত্যাগ করেছেন। ওই প্রতিষ্ঠানের নামে কেউ ঋণ নিতে পারেন। তবে তিনি এসবের সঙ্গে জড়িত নন।
এর আগে শুক্রবার মামলা–সংক্রান্ত তথ্যের ঘাটতির কারণে কক্সবাজার-২ আসনে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদের মনোনয়নপত্র বাতিল এবং দ্বৈত নাগরিকত্ব–সংক্রান্ত জটিলতায় কুড়িগ্রাম-৩ আসনের মাহবুবুল আলম সালেহীর মনোনয়নপত্র স্থগিত করেছে নির্বাচন কমিশন।
পঞ্চগড়ের দুটি আসনে সাতজনের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। মনোনয়নপত্রে হলফনামা না থাকায় পঞ্চগড়-১ আসনে (সদর, তেঁতুলিয়া ও আটোয়ারী) জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির মুখপাত্র (জাগপা) আল রাশেদ প্রধানের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়। রাশেদ প্রধান জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১–দলীয় জোটের প্রার্থী। তিনি পঞ্চগড়-২ আসনেও ( বোদা ও দেবীগঞ্জ) মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। রাশেদ প্রধান বলেন, মনোনয়নপত্র বাতিলের বিষয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে আমাদের একটি সার্টিফাই কপি দেবে। এরপর আপিল করব।
গাজীপুরের ৫টি আসনে ৫৩ প্রার্থীর মধ্যে ১৯ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। এর মধ্যে গাজীপুর-২ আসনে গণফ্রন্টের আতিকুল ইসলাম, খেলাফত মজলিসের খন্দকার রুহুল আমিন, গণ অধিকার পরিষদের মাহফুজুর রহমান খান, জাপার ইসরাফিল মিয়া, জনতার দলের শরিফুল ইসলাম; গাজীপুর-১ আসনে জাপার শফিকুল ইসলাম, গাজীপুর-৩ আসনে ইসলামী ঐক্যজোটের মুফতি শামীম আহমদ; গাজীপুর-৪ আসনে আমজনতার দলের জাকির হোসেন, ইসলামী আন্দোলন কাজিম উদ্দিন; গাজীপুর-৫ আসনে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের রুহুল আমিনের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে।
রাজশাহীর ৬টি আসনের ৩৮ প্রার্থীর মধ্যে ১৯ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। একজনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ স্থগিত রয়েছে। এর মধ্যে রাজশাহী-১ (গোদাগাড়ী-তানোর) আসনে সুলতানুল ইসলাম তারেক, রাজশাহী-৫ (পুঠিয়া-দুর্গাপুর) আসনের রেজাউল করিম, ইসফা খায়রুল হক শিমুল, জুলফার নাঈম মোস্তফার (ঋণ খেলাপের দায়ে) মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। বিএনপি দলীয় এসব নেতা দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছিলেন।
দলীয় প্রার্থীদের মধ্যে রাজশাহী-১ আসনে গণ অধিকার পরিষদের মীর মো. শাহাজান, রাজশাহী-২ আসনে এলডিপির প্রার্থী মো. ওয়াহেদুজ্জামান, রাজশাহী-৩ আসনে ইসলামী আন্দোলনের ফজলুর রহমান, আমজনতার দলের সাঈদ পারভেজ, রাজশাহী-৪ (বাগমারা) আসনের জাপার ফজলুল হক, ইসলামী আন্দোলনের তাজুল ইসলাম খান, রাজশাহী-৫ আসনের ইসলামী আন্দোলনেরে রুহুল আমিন এবং রাজশাহী-৬ (বাঘা-চারঘাট) আসনের জাপার ইকবাল হোসেনের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

