পরাজিত আধিপত্যবাদী শক্তির ফাঁদ থেকে বাঁচতে পুরো বাংলাদেশকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী।
তিনি বলেন, যখন একটা আধিপত্যবাদী সংস্কৃতি ও রাজনীতি থেকে বের হতে চাইবেন, পরাজিত আধিপত্যবাদী রাজনীতির সঙ্গে যারা জড়িত ছিল তারা কখনো ভালোভাবে নিবে না । তারা আপনাকে নানান রকমভাবে ফাঁদে ফেলার চেষ্টা করবে। সেই ফাঁদটা সম্পর্কে আমাদের সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। তাই জুলাই বিপ্লবের পরে মন্দিরগুলো যে ধারণা ও সচেতনতা থেকে আপনারা রক্ষা করেছেন, সেই ধারণা ও সচেতনতা এখন এবং আগামী দশ বছর অব্যাহত রাখতে হবে।
সোমবার রাজধানীর বাংলা একাডেমিতে আমার দেশ পাঠক মেলা আয়োজিত সৃজনশীল রচনা, ছোটগল্প ও কবিতা প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের পুরষ্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি একথা বলেন৷
মোস্তফা সারোয়ার ফারুকী বলেন, আপাতদৃষ্টে মনে হয় ‘সংস্কৃতি’ একটা নিরীহ ব্যাপার। কিন্তু এটা নিরীহ ব্যাপার না এটা সবচেয়ে বড় ব্যাপার। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলো আমরা এইটা ঠিকঠাক মতো বুঝতে পারি না। ৫৪ বছর আগ থেকেও সংস্কৃতি কিভাবে আমাদের জীবন এবং মৃত্যু নির্ধারণ করে দেয় সেটা এখন আমরা বুঝতে পারছি। সংস্কৃতিই নির্ধারণ করে দেয় কিভাবে মানুষ মারা যাবে এবং আরমানরা কতদিন গুম থাকবে।
সিনেমা, সাহিত্য, নাটক ও গান নানা কিছুর মধ্য দিয়ে গত ৭০ - ৮০ বছর ধরে হাই কালচার এবং লো কালচারের একটা ধারণা তৈরি করে রেখেছিল বলে মনে করেন তিনি। তিনি বলেন, এই ধারণাটাই তৈরি করা হয় আপনার ইতিহাস লুট করার মধ্য দিয়ে। জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া, বিএনপি ও জামায়াত হাইকালচার না। কোনো ইসলামিক রাজনৈতিক দল হাই কালচার না। আর এই কালচারের মাধ্যমে এমনভাবে ঘৃণার রাজনীতি তৈরি করে, মধ্যবিত্তের মনকে নিয়ন্ত্রণ করে।
শাহবাগ নিয়ে এই উপদেষ্টা বলেন, আমি শাহবাগে এসে দেখলাম যে এখানে পূজা নিয়ে কথা বলা যাবে, বড়দিন নিয়েও কথা বলা যাবে, বৌদ্ধ পূর্ণিমা নিয়েও বলা যাবে -কিন্তু আপনি যদি ঈদ ও শবে বরাত -অর্থাৎ ইসলাম ধর্মের কিছু নিয়ে কোনো কথা বলেন, তাহলে আপনি খ্যাত। ‘ইউ আর নট কালচারড এনাফ’ ।
রাজনৈতিক লড়াইয়ে জিততে হলে আগে সাংস্কৃতিক লড়াইয়ে জিততে হবে বলে মনে করেন অনুষ্ঠানের সভাপতি ও আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান। তিনি বলেন, সাংস্কৃতিক ন্যারেটিভে পরাজিত হলে রাজনৈতিক লড়াইয়ে জয়লাভ করা কঠিন হয়ে পড়ে। বাংলাদেশের ৫৪ বছরের ইতিহাসে আমরা একই অবস্থা দেখেছি, তবে অতি সম্প্রতি মহান জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে আমাদের তরুণ প্রজন্ম এই সাংস্কৃতিক লড়াইয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। তারা ভারতীয় আধিপত্য ও ফ্যাসিবাদকে চ্যালেঞ্জ করেছে। কারণ তাদের মধ্যে অজান্তেই একটা বিরাট সাংস্কৃতিক পরিবর্তন হয়ে গেছে। গত ১৫ বছর তাদের মাথায় বিজাতীয় সংস্কৃতি ঢুকিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হলেও আমাদের স্মার্ট তরুণ প্রজন্ম তা প্রত্যাখ্যান করেছে এবং আমাদের প্রকৃত সংস্কৃতিকে চিনতে পেরেছে। তারা আমাদের একটি নতুন বাংলাদেশ উপহার দেবে বলে আমি খুবই আশাবাদী।
শরীফ ওসমান হাদি সাংস্কৃতিক লড়াই বুঝতেন বলেই কালচারাল সেন্টার করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন বলে জানান আমার দেশ সম্পাদক। তিনি বলেন, আমাদের উদ্দেশ্য হলো তরুণ প্রজন্মকে ইতিহাস ও সাহিত্য চর্চার দিকে ঠেলে দেওয়া। যাতে একটি ইতিহাস সচেতন জাতি গড়ে ওঠে। আমাদের যাত্রা অনেক দীর্ঘ। জুলাই বিপ্লবে পরাজিত সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী এই পরাজয় সহজে মেনে নেবে না এবং তারা তাদের হারানো সাম্রাজ্য আবার দখলের চেষ্টা করবে। আমাদের বিজয়কে ধরে রাখতে হলে আমাদের সাহিত্য, সংগীত, বই পড়া ও লেখার মতো সাংস্কৃতিক চর্চা চালিয়ে যেতে হবে।
আমার দেশ-এর নির্বাহী সম্পাদক আবদাল আহমদ বলেন, আমাদের প্রকৃত ইতিহাস - ঐতিহ্য জানতে হলে অবশ্যই এসব বিষয়ে পড়তে হবে৷ বাংলাদেশের সপক্ষের শক্তির, আধিপত্যবাদ বিরোধী লড়াইয়ের সম্মুখ সারির যোদ্ধাদের এবং জুলাই শহীদদের বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা সমৃদ্ধ বই পড়তে হবে।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে আমার দেশ পাঠক মেলা সভাপতি সাজ্জাদ ইউনুস শহীদ শরীফ ওসমান বিন হাদির শাহাদাত কবুলের জন্য দোয়া করেন এবং অতিদ্রুত শহীদ হাদি হত্যাকারীদের বিচার দাবি করেন। তিনি বলেন, আমাদের বিরুদ্ধে যে আগ্রাসন, সে আগ্রাসনের বিরুদ্ধেই ছিল হাদি ভাইয়ের লড়াই। আমাদের পাঠক মেলার এখন মূল কাজ হলো এই লড়াইয়ের জন্য নিজেকে তৈরী করা এবং সাংস্কৃতিকসহ সকল আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাওয়া।
আমার দেশ- এর মাল্টিমিডিয়া ইনচার্জ তামান্না মিনহাজের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য রাখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান, ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আরিফুল ইসলাম অপু। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন, আমারদেশ -এর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক জাহেদ চৌধুরী, সহযোগী সম্পাদক আলফাজ আনাম, সাহিত্য সম্পাদক মুহিম মাহফুজ ও পাঠকমেলা পরিবারের সদস্যরা।
কবিতা প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অর্জন করে বিজয়ী হন সৈয়দ সুরাইয়া, দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন ইফতেখারুল হক মামুন এবং তৃতীয় স্থান অর্জন করেন নাবিল আহমেদ নিশাত। এছাড়া কবিতা প্রতিযোগিতায় অন্য বিজয়ীরা হলেন হুসাইন রিহান, জান্নাতুল নাঈম বুশরা, আরিফুল ইসলাম, তানভীর হোসেন সিহান, নাফিউল ইসলাম নাহিদ, আমিরুল ইসলাম এবং আরিফুজ্জামান সোহাগ।
ছোটগল্প প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অর্জন করে বিজয়ী হন চন্দ্রিকা বড়ুয়া টিনা, দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন আমানুর রহমান এবং তৃতীয় স্থান অর্জন করেন কানিজ ফাতেমা নূরী। এছাড়া ছোটগল্প প্রতিযোগিতায় অন্য বিজয়ীরা হলেন জুনায়েদ সিদ্দিক, অপূর্ব প্রসাদ পাল, মোঃ খালেদ সাইফুল্লাহ, সায়মা সুইটি, মীর তারেক, নিবিড় আহমেদ গল্প ও সিনথিয়া আফরিন তমা
প্রবন্ধ প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অর্জন করে বিজয়ী হন জাহিদ হাসান নয়ন, দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন মোফাজ্জল হোসেন এবং তৃতীয় স্থান অর্জন করেন সাদিক জাফরুল্লাহ নাবিল। এছাড়া প্রবন্ধ প্রতিযোগিতায় অন্য বিজয়ীরা হলেন মুজাহিদ ইসলাম, আব্দুল আলিম, এম সাব্বির আহমেদ, উসমান গনী, সৈকত মল্লিক, ওমর ফারুক ও শাহরিয়ার রহমান।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

