ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে পটুয়াখালী-৩ (গলাচিপা-দশমিনা) আসনের রাজনৈতিক অঙ্গন। একসময় আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই আসনে এবার বইছে পরিবর্তনের হাওয়া। দলীয় সমঝোতা, বিদ্রোহ, বহিষ্কার, পাল্টাপাল্টি বক্তব্য আর মাঠের মেরুকরণ—সব মিলিয়ে নির্বাচনি পরিস্থিতি এখন টানটান।
এই আসনে সবচেয়ে আলোচিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে উঠেছে গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি ও ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নুর এবং বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত ও স্বতন্ত্র প্রার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রনেতা হাসান মামুনের মধ্যে। বিএনপির সমর্থনে নুরুল হক নুর ট্রাক প্রতীকে নির্বাচন করলেও দলের একটি বড় অংশ মাঠে নেমেছে বহিষ্কৃত নেতা হাসান মামুনের পক্ষে, যিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ঘোড়া প্রতীক নিয়ে ভোটের লড়াইয়ে আছেন।
উত্তেজনার মধ্যেই নির্বাচনি প্রচার
নির্বাচনের শুরু থেকেই এই আসনে ছিল অনিশ্চয়তা। বিএনপি দলীয় প্রার্থীর নাম ঘোষণা বিলম্বিত হওয়া, স্থানীয় নেতাকর্মীদের মনোনয়ন বঞ্চনা নিয়ে ক্ষোভ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য, দুই দফা সংঘর্ষ, ১৪৪ ধারা জারি এবং শেষ পর্যন্ত উপজেলা কমিটি বিলুপ্ত—সবকিছু মিলিয়ে নির্বাচন ঘিরে তৈরি হয়েছে তীব্র উত্তেজনা। এর মধ্যেই চলছে প্রার্থীদের গণসংযোগ, সভা-সমাবেশ ও প্রচার কার্যক্রম।
এই আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী সাবেক জেলা আমির অধ্যাপক শাহ আলম সুসংগঠিতভাবে প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন। পাশাপাশি ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের হাতপাখা প্রতীকের প্রার্থী মুফতি আবু বকর সিদ্দিক নিজস্ব ভোটব্যাংক নিয়ে মাঠে রয়েছেন।
বিএনপির ভেতরে বিভক্তি
স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এ আসনের মূল লড়াই শেষ পর্যন্ত নুরুল হক নুর ও স্বতন্ত্র প্রার্থী হাসান মামুনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। তবে দিন যত এগোচ্ছে, লড়াই ততই কঠিন হয়ে উঠছে নূরের জন্য। গলাচিপা ও দশমিনা উপজেলা বিএনপির সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকসহ বড় একটি অংশ প্রকাশ্যেই কাজ করছেন দলের বিদ্রোহী প্রার্থী হাসান মামুনের পক্ষে।
দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করায় হাসান মামুনকে বিএনপি থেকে বহিষ্কার করা হলেও তৃণমূলের বড় অংশ সেই সিদ্ধান্ত মানতে নারাজ। তাদের বক্তব্য, দল যা-ই সিদ্ধান্ত নিক, তারা হাসান মামুনের সঙ্গেই থাকবেন।
এমন পরিস্থিতিতে নুরুল হক নুরের পক্ষে সাংগঠনিকভাবে কাজ না করায় বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটি গলাচিপা ও দশমিনা উপজেলা কমিটি বিলুপ্ত করে। তাতেও কাঙ্ক্ষিত সাড়া মেলেনি নুরের পক্ষে। বরিশাল বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট বিলকিস জাহান শিরীনসহ জেলা বিএনপির পক্ষ থেকে একাধিকবার সমঝোতার চেষ্টা করা হলেও তা সফল হয়নি। ফলে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা আরো বেড়ে গেছে।
এ ব্যাপারে গলাচিপা উপজেলা বিএনপি সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বলেন, অন্য দলের লোক এনে এমপি বানালে কী হয়—তা আমরা আগেও দেখেছি। ২০১৮ সালে গোলাম মাওলা রনিকে ধরে এনে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল; কিন্তু সাত বছরে এলাকায় তার চেহারাই দেখা যায়নি। এবার আমরা বুঝে-শুনে সিদ্ধান্ত নিয়েছি। দশমিনা উপজেলার তিন নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা টিটু হাওলাদার বলেন, এবার আমরা মানুষ দেখে-বুঝে ভোট দিমু।
প্রার্থীদের বক্তব্য
এদিকে দল থেকে বহিষ্কৃত হয়েও জয়ের ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী স্বতন্ত্র প্রার্থী হাসান মামুন বলেন, কোনো চাপ বা ভয় নেই। জনগণের ঐক্যই আমার সবচেয়ে বড় শক্তি। সমঝোতার কোনো সুযোগ নেই। আগামী ১২ তারিখ মানুষ নির্ভয়ে ভোট দিয়ে ফলাফল নির্ধারণ করবে।
অন্যদিকে নুরুল হক নুর বলেন, বিএনপি জিতলে জোট সরকার গঠন হবে এবং সেখানে আমার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকবে। তিনি বিএনপি নেতাকর্মীদের দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান। তবে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের বিষয়ে দেওয়া তার বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী অধ্যাপক শাহ আলম বলেন, অবহেলিত গলাচিপা ও দশমিনার উন্নয়নে সবকিছু করা হবে। এখানে কোনো ধরনের বৈষম্য করা হবে না। দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ গড়াই আমাদের লক্ষ্য।
ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের প্রার্থী মুফতি আবু বকর সিদ্দিক বলেন, এই আসনে আমাদের শক্ত ভোটব্যাংক আছে। বড় দুই প্রার্থীর কাদা ছোড়াছুড়িতে সাধারণ মানুষ বিরক্ত। যার কারণে ইনশাআল্লাহ আমরা শতভাগ আশাবাদী বিজয় আমাদেরই হবে।
সব মিলিয়ে গলাচিপা-দশমিনার নির্বাচনি মাঠ এবার বহুমুখী প্রতিযোগিতা ও জটিল সমীকরণে ভরপুর। জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের জোটে ভাঙন, আওয়ামী লীগের সাধারণ ভোটার ও তরুণ ভোটারদের ভূমিকা—সবকিছুই ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা সুষ্ঠু, অবাধ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন, যাতে তারা নির্ভয়ে নিজেদের প্রতিনিধি বেছে নিতে পারেন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


নতুন সরকারের শপথের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন
ভয়াবহ তুষারঝড়ে বিপর্যস্ত যুক্তরাষ্ট্র, নিহত অন্তত ৩০