গণহত্যার কুশীলব ৮০ পুলিশ কর্মকর্তার বিদায় চূড়ান্ত

* তালিকায় বিপ্লব, প্রলয়, নুরুল, হারুন, এহসানউল্লাহ

* তিন কর্মকর্তার চাকরিচ্যুতির প্রজ্ঞাপন

ওয়াসিম সিদ্দিকী ও বেলাল হোসেন

গণহত্যার কুশীলব ৮০ পুলিশ কর্মকর্তার বিদায় চূড়ান্ত

বিগত ফ্যাসিবাদী আওয়ামী শাসনামলের দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশের জনসাধারণের ওপর চেপে বসা ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের অন্যতম প্রধান লাঠিয়াল ও খুনি বাহিনী হিসেবে কাজ করেছে পুলিশ বাহিনীর একটি নির্দিষ্ট দলদাস অংশ। জনগণের ট্যাক্সের টাকায় লালিত-পালিত হয়েও এরা লিপ্ত ছিল বিরোধী মত নিশ্চিহ্ন করার পৈশাচিক খেলায়। বিশেষ করে তৎকালীন বিরোধী দল বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ দেশের স্বাধীনতাকামী ও গণতন্ত্রমনা মানুষের কণ্ঠরোধ করতে এদের বর্বরতা সব ধরনের নৃশংসতাকে হার মানিয়েছিল।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঐতিহাসিক বিপ্লবের সময় রাজধানীসহ সারা দেশে ছাত্র-জনতার ওপর গণহত্যা চালানোর পেছনে অন্যতম মূল কারিগর ছিল এই ‘জল্লাদ’ কর্মকর্তারা। নিরীহ ছাত্র ও সাধারণ মানুষের বুকে সরাসরি স্নাইপার ও স্বয়ংক্রিয় রাইফেলের গুলি চালিয়ে শেখ হাসিনার ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করতে চেয়েছিলেন তারা। দীর্ঘদিন পরে হলেও বর্তমান সরকার সেসব খুনি ও দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাকে চূড়ান্তভাবে চাকরিচ্যুত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

মন্ত্রণালয় ও গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, আওয়ামী লীগের অতি উৎসাহী অনুগত হিসেবে পরিচিত ডিআইজি থেকে শুরু করে সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) পদমর্যাদার সর্বসাকুল্যে ৮০ জন বিতর্কিত কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়েছে। রাষ্ট্রপতির বিশেষ আদেশক্রমে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় খুব দ্রুত ক্রমান্বয়ে এ-সংক্রান্ত চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করতে যাচ্ছে। এই শুদ্ধি অভিযানের অংশ হিসেবে গতকাল বৃহস্পতিবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি আদেশে ৩৩তম বিসিএসের মিশু বিশ্বাস, জুয়েল চাকমা এবং ৩৬তম বিসিএসের মাহমুদুল হাসানকে চূড়ান্তভাবে বরখাস্ত বা চাকরিচ্যুত করা হয়। এই তিন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলনে নির্বিচারে গুলি চালানো এবং অতীতে বিএনপি-জামায়াতকর্মীদের গুম ও খুনের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ততার অকাট্য প্রমাণ মিলেছে।

অভিশপ্ত তালিকায় ফ্যাসিবাদের মূল হোতারা

অনুসন্ধানে জানা গেছে, তালিকায় থাকা ৮০ কর্মকর্তার অধিকাংশই বর্তমানে সরকারি খাতায় ‘পলাতক’ হিসেবে চিহ্নিত। তাদের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন থানায় আন্তর্জাতিক অপরাধসহ হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে বহু মামলা দায়ের করা হয়েছে। বিশেষ করে জুলাই বিপ্লবের সময় রাজধানীর প্রবেশদ্বার যাত্রাবাড়ী, পল্টন, উত্তরা ও মোহাম্মাদপুর এলাকায় ছাত্র-জনতার ওপর সরাসরি স্নাইপার দিয়ে ও খুব কাছ থেকে গুলি করার হুকুমদাতা ছিলেন তারা। এসব কর্মকর্তার অধিকাংশই গত ১৫ বছর ধরে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতিকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিয়েছিলেন।

এ তালিকার অন্যতম দুই শীর্ষ নাম হলো ডিএমপির সাবেক বিতর্কিত যুগ্ম কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার এবং ডিবিপ্রধান হিসেবে পরিচিত হারুন অর রশিদ। ‘বিপ্লব-হারুন’ সিন্ডিকেটের এসব কর্মকর্তা তখনকার বিরোধী দলের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলন দমনে ছিলেন সাক্ষাৎ যমদূত। তাদের নির্দেশে ও প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে বিএনপি ও জামায়াতের অসংখ্য নেতাকর্মীকে টর্চার সেলে নিয়ে অমানুষিক নির্যাতন করা হতো। তাদের যৌথ প্রযোজনায় নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ভাঙচুর, লুটপাট এবং নেতাকর্মীদের পকেটে জোর করে ককটেল পুরে দিয়ে গ্রেপ্তারের নাটক সাজানো হতো। রাতের আঁধারে বিরোধী দলের তরুণ ও উদীয়মান নেতাকর্মীদের তুলে নিয়ে মাসের পর মাস ‘আয়নাঘরে’ বন্দি রাখা এবং আদালত চত্বরে বিরোধীদলীয় সিনিয়র আইনজীবীদের ওপর পুলিশের বুট দিয়ে লাঞ্ছিত করার নেপথ্য মাস্টারমাইন্ড ছিলেন এসব কর্মকর্তা।

বিপ্লব কুমার সরকার বর্তমানে সাময়িক বরখাস্ত হয়ে বরিশাল রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয়ে সংযুক্ত থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে কর্মস্থলে অনুপস্থিত ও পলাতক রয়েছেন। জানা গেছে, ৫ আগস্টের পর সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে চলে যান তিনি। সেখান থেকে যুক্তরাষ্ট্রে চলে গেছেন। অন্যদিকে ডিবি হারুন বিরোধী মতের ও সাধারণ নিরীহ বহু মানুষকে ডিবি কার্যালয়ে তুলে এনে নির্যাতন চালাতেন। জুলাই বিপ্লবের সময় আন্দোলনের সমন্বয়কদের তুলে এনে নির্যাতন করেছিলেন। নির্যাতনের মুখে তাদের দিয়ে আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণা দেওয়ার সব ধরনের অপচেষ্টা করেছিলেন তিনি। ৫ আগস্টের পর পালিয়ে প্রথমে ভারতে এবং পরে দুবাই হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান হারুন।

একই তালিকায় রয়েছেন ফ্যাসিবাদের অন্যতম ‘মাস্টারমাইন্ড’ হিসেবে পরিচিত অতিরিক্ত ডিআইজি প্রলয় কুমার জোয়ার্দার, যাকে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর খুব বিশ্বস্ত কর্মকর্তা হিসেবে মনে করা হতো খোদ আওয়ামী আমলেই। গোপালগঞ্জ ও শরীয়তপুরে এসপি থাকাকালে তিনি পুরো জেলাকে বিএনপি ও জামায়াতমুক্ত করার ঘোষণা দিয়ে হাজার হাজার কর্মীকে ঘরছাড়া ও পঙ্গু করে দিয়েছিলেন। তার ইশারায় পুলিশের একটি বিশেষ স্কোয়াড ছাত্র আন্দোলনেও গণহত্যার মিশন বাস্তবায়ন করেছিল। বর্তমানে তিনিও সাময়িক বরখাস্ত অবস্থায় রয়েছেন। পলাতক রয়েছেন জুলাই বিপ্লবের পর থেকে।

সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ও ঢাকা রেঞ্জের সাবেক ডিআইজি সৈয়দ নুরুল ইসলামও রয়েছেন এ তালিকায়। রাজধানী ঢাকা ও এর আশপাশের জেলাগুলোয় বিরোধী দলগুলোর প্রতিটি রাজনৈতিক কর্মসূচিতে তার নির্দেশেই পুলিশ বেপারোয়াভাবে লাইভ বুলেট ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করত। ডিএমপিতে যুগ্ম কমিশনার থাকাবস্থায় বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে বর্বরোচিত হামলা ও ভাঙচুরের অন্যতম মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন তিনি।

এছাড়াও এ তালিকায় রয়েছেন বিএনপি অফিসে তাণ্ডব চালিয়ে আলোচনায় আসা বিতর্কিত কর্মকর্তা এসএম মেহেদী হাসান (সাবেক যুগ্ম কমিশনার, ডিএমপি) এবং কিছুদিন আগে রাজশাহীর সারদা পুলিশ একাডেমি থেকে রাতের অন্ধকারে পালিয়ে যাওয়া ডিআইজি কেএম এহসানউল্লাহ।

২০০৯ সাল থেকে আওয়ামী লীগ যখনই ক্ষমতা হারানোর ভয়ে ভুগেছে, তখনই এই দলদাস কর্মকর্তারা রক্ষক থেকে ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। বিএনপি ও জামায়াতকে রাজনৈতিকভাবে নিশ্চিহ্ন করার জন্য প্রতিটি আন্দোলন দমনে তারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নিজেদের ব্যক্তিগত জমিদারিতে পরিণত করেছিলেন।

জুলুমবাজ কর্মকর্তাদের মধ্যে আরো রয়েছেন—

মিশু বিশ্বাস (অতিরিক্ত এসপি) : চাকরিচ্যুত এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে রাজধানীর শাহবাগ ও পল্টন থানায় একাধিক সুনির্দিষ্ট হত্যা মামলা রয়েছে। হত্যা, হত্যাচেষ্টা এবং নারকীয় তাণ্ডবের অভিযোগ আনা হয়েছে তার বিরুদ্ধে। তিনি ২০২৪ সালের ২৬ অক্টোবর থেকে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত।

এসএম শামীম (অতিরিক্ত এসপি) : গাইবান্ধার ইন সার্ভিস ট্রেনিং সেন্টারের এই কর্মকর্তার (সাবেক এডিসি, ডিএমপি) বিরুদ্ধে যাত্রাবাড়ী থানায়ই অন্তত ১১টি সুনির্দিষ্ট হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ফ্যাসিবাদের পতনের শেষ মুহূর্তেও তিনি নির্বিচারে সাধারণ মানুষের ওপর গুলি চালান।

গোলাম রুহানী (সহকারী কমিশনার, ডিএমপি) : ৩৬তম বিসিএসের এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলার সংখ্যা দেখে তদন্ত কর্মকর্তারাও স্তব্ধ হয়ে গেছেন। যাত্রাবাড়ী, আদাবর, রমনা, পল্টন, খিলগাঁও, কাফরুল, মুগদা এবং ভাটারা থানায় তার বিরুদ্ধে এ পর্যন্ত ২২টির বেশি মামলা দায়ের হয়েছে। বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের ভুয়া ও সাজানো মামলায় ফাঁসানো এবং সরাসরি বুকে গুলি করার ক্ষেত্রে তার বিশেষ কুখ্যাতি ছিল।

মো. আরিফুজ্জামান (এএসপি) : ২৮তম বিসিএসের এই কর্মকর্তা রংপুরের তাজহাট ও কোতোয়ালি থানায় আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডসহ মোট সাতটি হত্যা মামলার প্রধানতম আসামি। শহীদ আবু সাঈদের ওপর পুলিশ যখন গুলি চালায়, তখন তিনি ফ্রন্টলাইনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

এছাড়া তালিকায় থাকা রাজশাহী রেঞ্জের সাবেক ডিআইজি আনিসুর রহমান এবং সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি জায়েদুল আলমের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ—তারা উত্তরবঙ্গ ও নারায়ণগঞ্জে বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীদের ওপর এমন ক্র্যাকডাউন চালিয়েছিলেন, যাতে পুরো এলাকা পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছিল। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের প্রহসনের নির্বাচনের আগে জেলাগুলোয় যে ‘ট্রিগার হ্যাপি’ স্কোয়াড গঠন করে মানুষ হত্যা করা হয়েছিল, তার কমান্ডিং পজিশনে ছিলেন এই বিতর্কিতরাই।

চাকরিচ্যুতির চূড়ান্ত অপেক্ষায় আরো যারা

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্রমতে এ তালিকায় আরো রয়েছেন—বিপ্লব বিজয় তালুকদার (ডিআইজি, পুলিশ টেলিকম), টুটুল চক্রবর্তী (অতিরিক্ত ডিআইজি, বর্তমানে সাময়িক বরখাস্ত), নূরে আলম মিনা (সাবেক ডিআইজি, চট্টগ্রাম রেঞ্জ), সুদীপ কুমার চক্রবর্তী (যুগ্ম কমিশনার, ডিএমপি), মানস কুমার পোদ্দার (অতিরিক্ত ডিআইজি, বরিশাল রেঞ্জ, বর্তমানে পলাতক), গোলাম মোস্তফা রাসেল (সাবেক এসপি, নারায়ণগঞ্জ, বর্তমানে পলাতক), কাজী আশরাফুল আজীম (সাবেক উপকমিশনার, ডিএমপি), রিফাত রহমান শামীম (সাবেক যুগ্ম কমিশনার, ডিএমপি)।

নথিপত্রে এদের সিংহভাগকেই ‘অনুপস্থিত ও পলাতক’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হলেও বেশিরভাগই জুলাই বিপ্লবের পর ভারতে পালিয়ে গেছেন। এসব কর্মকর্তার মধ্যে যাদের হাতে রক্তের দাগ লেগে আছে, তাদের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের অধীনে এনে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে বিচারের আওতায় আনা হয়েছে। আরো অনেককে আনা হতে পারে বলে জানা গেছে। একই সঙ্গে গত ১৫ বছরে পুলিশি ক্ষমতার অপব্যবহার করে তারা যে হাজার হাজার কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ দেশে ও বিদেশে পাচার করেছে, তা বাজেয়াপ্ত করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা করার দাবিও রয়েছে বিভিন্ন মহলে।

এ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (শৃঙ্খলা) কাজী মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম আমার দেশকে বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর পুলিশের ৮০ জন ক্যাডার কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা চলমান। এর মধ্যে তিন পুলিশ কর্মকর্তাকে চূড়ান্ত বরখাস্ত করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে বৃহস্পতিবার (গতকাল)। আরো পুলিশ সদস্যের বরখাস্তের (চাকরিচ্যূতি) তালিকা পাইপলাইনে আছে। পর্যায়ক্রমে তাদের বরখাস্ত করা হবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...