আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

নির্বাচনি প্রচারে এআই ভিডিওর অপব্যবহার, নেই নীতিমালা

আল-আমিন

নির্বাচনি প্রচারে এআই ভিডিওর অপব্যবহার, নেই নীতিমালা
ছবি: সংগৃহীত

‘আপা ফিরবে’ নামে ফেসবুক পেজে একটি এআই ভিডিও অ্যাপলোড করা হয়েছে। সেখানে দেখা যায়, জুলাই বিপ্লবে গণরোষে ভারতে পালিয়ে যাওয়া ক্ষমতাতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি জন ব্লিঙ্কেনের সঙ্গে বৈঠক করছেন। ওই বৈঠকে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর, বিদেশে পলাতক সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতা হাছান মাহমুদকে উপস্থিত দেখা গেছে। ভিডিওটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যে, সেটি নকল ভিডিও বলে ভাবছে না সাধারণ মানুষ। এতে বলা হচ্ছে, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনকে স্থগিতের জন্য বাংলাদেশ সরকারকে আমেরিকা চিঠি দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু ফ্যাক্ট চেকিংয়ে দেখা গেল ভিডিওটি নকল।

দুই সপ্তাহ আগে সারা দেশে বিভ্রান্তি তৈরি করার জন্য একটি চক্র সেটি তৈরি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে অ্যাপলোড করে। এসব এআই ভিডিও সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে ভুয়া ফটোকার্ডে বিভ্রান্ত হচ্ছেন অনেকে। কোন কার্ড নকল আর আসল সেটি নির্ণয় করতে সময় নিতে হচ্ছে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের। এতে গুজব বাড়ছে। পাশাপাশি তৈরি হচ্ছে সামাজিক অস্থিরতা, বিঘ্ন হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। এসব ভিডিও বন্ধের উদ্যোগ নিচ্ছে না বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। এছাড়া বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার এআই নীতিমালার উদ্যোগ নিলেও সেটি বাস্তবায়ন করতে পারেনি। ইউনেস্কোর সহযোগিতা নিয়ে এআই নীতিমালা বাস্তবায়ন হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিজ্ঞাপন

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. ওমর ফারুক জানান, ভুয়া ভিডিওতে সামাজিক অস্থিরতা বাড়ছে। মানুষ সঠিক তথ্য পাচ্ছে না।

তিনি আরো বলেন, বিটিআরসির বিষয়টি নিয়ে কাজ করা দরকার। পাশাপাশি পুলিশের সিআইডিও ভুয়া ভিডিওর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে।

এ বিষয়ে আইজিপি বাহারুল আলম গত সোমবার রাতে আমার দেশকে জানান, এআই নিয়ে আইসিটি মন্ত্রণালয় কাজ করছে। আমাদের এক্সপার্ট নেই এবং এখন এখানে নজর দেওয়ার সময়ও নেই।

এর ফলে নির্বাচনে ভয়াবহ নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে উদ্বেগ আছে অপরাধবিজ্ঞানীদের। ইতোমধ্যে নির্বাচনের প্রচার শুরু হয়ে গেছে। এআই ব্যবহার করে ভোট চাচ্ছেন প্রার্থীরা। এআই দিয়ে নারী, ধর্মীয় সংখ্যালঘু চরিত্র তৈরি করে বিপক্ষ দলের সমালোচনা করা হচ্ছে। এছাড়া মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর, পক্ষপাতমূলক, বিদ্বেষপূর্ণ, অশ্লীল, কুরুচিপূর্ণ এবং মানহানিকর কনটেন্ট তৈরি করছে চক্রটি। দেশের প্রায় সাড়ে সাড়ে কোটি মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করেন। তাদের শতকরা ৭০ জনই সামাজিকমাধ্যমে সক্রিয়। এ কারণে বিভ্রান্তিকর তথ্য দ্রুত ছড়ানোর সুযোগ বেশি। অনেক মিথ্যা ভিডিও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। এতে বিভ্রান্ত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, দুষ্কৃতকারীরা সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন টিভির লোগো ব্যবহার করছে। এটিএন বাংলা, এনটিভি, দীপ্ত টিভি, চ্যানেল ওয়ানের সংবাদ পাঠকদের দৃশ্য কেটে নিয়ে তাতে নির্বাচন স্থগিত বা বাতিলের কথা বলা অডিও সংযোজন করা হয়েছে। অডিওর সঙ্গে ঠোঁটের নড়াচড়া ও দেহভঙ্গির কোনো মিল নেই। পাশাপাশি ভিডিওতে অপ্রাসঙ্গিক ছবি ও দৃশ্য জুড়ে দিয়ে বিভ্রান্তি আরো বাড়ানো হয়েছে। এছাড়া মানুষের অবিকল চেহারা ও কণ্ঠে তৈরি এসব এআই চরিত্র নিজেদের সাধারণ ভোটার পরিচয় দিয়ে নির্দিষ্ট প্রতীকে ভোট দেওয়ার ঘোষণা দিচ্ছে। এছাড়াও এআই দিয়ে তৈরি ভিডিও ব্যবহার করে রাজনৈতিক নেতাদের নামে ভুয়া গল্প ও বক্তব্য ছড়ানো হচ্ছে, যা অনেক ভোটার যাচাই না করেই সত্য বলে বিশ্বাস করছেন। বিভিন্ন মূলধারার গণমাধ্যমের নাম ও লোগো ব্যবহার করে তৈরি একাধিক নকল ফটোকার্ড ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে ভাইরাল হয়েছে, যেগুলোয় নির্বাচনসংশ্লিষ্ট বিভ্রান্তিকর ও মিথ্যা তথ্য দেওয়া হচ্ছে।

অপরাধ বিজ্ঞানীরা বলছেন, নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, তত ভুয়া তথ্যের ছড়াছড়ি হচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হচ্ছেন। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করে যেসব ভুয়া ভিডিও তৈরি করা হচ্ছে, এতে সামাজিক অস্থিরতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে এ বিষয়ে উদ্যোগ নিতে হবে।

ফ্যাক্টচেকিং ডিসমিস ল্যাবের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন বলছে, রাজনীতি, নির্বাচন, দুর্যোগ, আন্তর্জাতিক সংঘাত ও পরিবেশ-সব ক্ষেত্রেই এআই নির্মিত ভুয়া ছবি এবং ভিডিও ছড়িয়েছে। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, রাজনৈতিক অপতথ্যের বিস্তারও তত বাড়ছে। বিশেষ করে বিএনপি, জামায়াত ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগসংশ্লিষ্ট ঘটনায় এআই নির্মিত ছবি ও ভিডিও ব্যাপকভাবে ছড়ানো হচ্ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সিআইডির ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা আমার দেশকে জানান, এখন পর্যন্ত সিআইডি হেডকোয়ার্টারে ভুয়া ভিডিওর মাধ্যমে প্রতারণার শিকার হওয়া অথবা আর্থিক ক্ষতিগ্রস্ত কেউ অভিযোগ করেননি। কেউ অভিযোগ করলে ওই ভিডিওর ফরেনসিক পরীক্ষা করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি আরো জানান, তবে সাম্প্রতিক সময়ে তারা সাইবার মাধ্যমে নজরদারি বাড়িয়েছেন। রাষ্ট্রে কেউ যাতে অস্থিরতা তৈরি করতে না পারে, সেদিকে লক্ষ রয়েছে সিআইডির।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...