আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

বাংলা সাহিত্যে প্রথম ঈদকবিতা ও ঈদসংখ্যা

মুহতারিম মুহাম্মাদ গিয়াসুদ্দিন হাদি

বাংলা সাহিত্যে প্রথম ঈদকবিতা ও ঈদসংখ্যা

‘ইংরেজ প্রায় দুশো বছরের শাসন-শোষণে একটা জিনিস করতে সক্ষম হয়েছিল যে, মুসলমানরা মধ্যযুগে বাংলা সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতায় এবং চর্চায় একটা যে বিরাট ভূমিকা রেখেছিল, সেটা প্রায় মুছে ফেলা। সেই যে পিছিয়ে গেল এদেশের মুসলমান, এদেশের সাহিত্য-সংস্কৃতি আজও তার জের টানছে।’ (ভূমিকা, বাংলা সাহিত্যে মুসলমান, আবদুল মান্নান সৈয়দ)

মান্নান সৈয়দের এই মন্তব্য যে এখনো প্রাসঙ্গিক, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক কালের ঈদ সংখ্যাগুলোর সাহিত্য আয়োজন দেখলে এটা বিশেষভাবে নজরে পড়ে। ব্রিটিশবাহিত ও পাশ্চাত্য প্রভাবিত আধুনিক বাংলা সাহিত্যের লেখকদের উল্লেখযোগ্য অংশ সাহিত্য-সংস্কৃতি-চিন্তায় এখনো আত্মবিমুখ। নিজস্ব সংস্কৃতির লালন ও পরিপালন এখনো অধিকাংশের রচনায় অনুপস্থিত। জাতীয় সংস্কৃতিকে গৌরববোধ নিয়ে ধারণ করে সাহিত্যে তার নান্দনিক প্রকাশের যে আত্মবিশ্বাসী জাতি জাগানিয়া পদক্ষেপ, ঢাকার সাহিত্যে এই ধারা এখনো সাধারণ বাস্তবতা হয়ে ওঠেনি।

বিজ্ঞাপন

অথচ ১৮ ও ১৯ শতকের কলকাতা ছিল এর ব্যতিক্রম। কলকাতার পর ঢাকার বিকাশ বা বাঙালি মুসলমানের সাংস্কৃতিক জাগরণ নিয়ে মান্নান সৈয়দ আরো বলেন, ‘দেশ বিভাগের পর পূর্ববঙ্গের মফস্বল শহর ঢাকা রূপান্তরিত হলো বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির নতুন রাজধানীতে। তাই দেখা যাবে ১৯৪৭-এর পর ঢাকায় সাহিত্য-সংস্কৃতি-শিল্পের এক সার্বিক জাগরণ। বাংলা সাহিত্যের হাজার দেড়েক বছরের ইতিহাসে বাঙালি-মুসলমানের জন্য এত বড় জাগরণ আর হয়নি। ঊনবিংশ শতাব্দীতে শিল্প-সাহিত্য সংস্কৃতির কেন্দ্রভূমি হিসেবে কল্লোলিনী কলকাতার যে-ভূমিকা ছিল, মধ্য-বিংশ শতাব্দীতে ঢাকা গ্রহণ করল সেরকম একটি ভূমিকা। যদিও ঢাকা শূন্য থেকে শুরু করেনি—তার একটি দীর্ঘ পূর্ব-ঐতিহ্য ছিল।’ (ওই, আবদুল মান্নান সৈয়দ)

’৪৭-পরবর্তীকালে ঢাকাকেন্দ্রিক পূর্ব বাংলা তথা বাঙালি মুসলমানের সাহিত্যিক অগ্রযাত্রা শুরু হবার পরেই বাংলা সাহিত্য পেয়েছে ইতিহাসের প্রথম ঈদ কবিতা। লিখেছেন ঢাকার কবি সৈয়দ এমদাদ আলী (১৮৮০-১৯৫৬)। এর আগে বাংলা সাহিত্যের হাজার বছরের ইতিহাসে কোনো ঈদের কবিতা কেন পাওয়া যায় না, এর অন্যতম কারণ মান্নান সৈয়দের প্রথম মন্তব্যে পাওয়া যায়। পাওয়া যায়নি বলে যে মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে ঈদ নিয়ে কবিতা লেখা হয়নি, সেটি অনুমান করা দুষ্কর। কিন্তু সংরক্ষণের অভাব ও অপ্রাপ্তি এই বিরাট শূন্যতাকে সত্যের মতো প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে।

সৈয়দ এমদাদ আলী সম্পর্কে আহমদ শরীফ বলেন, ‘তিনি উনিশ শতকের শেষ পাদে মুসলিম জাগরণের উন্মেষকালের আবহাওয়ায় বর্ধিত। তার মন-মননের ওপর জাতীয় হিতৈষণা ও কল্যাণকামিতার যে-প্রভাব পড়ে, তার তাগিদে—অন্তরজাত প্রতিভার আবেগে নয়—তিনি সাহিত্যসাধনায় আত্মনিয়োগ করেন। তার মনের পরিচয় মিলবে তার বাঙলা ও ইংরেজি প্রবন্ধগুলোতে আর তার নবযুগ নামক অসমাপ্ত উপন্যাসে।’ (সৈয়দ এমদাদ আলীর সাধনা)

সৈয়দ এমদাদ আলী ১২৮২ বঙ্গাব্দের ১ আশ্বিন ঢাকা জেলার বিক্রমপুরের খিলগাঁও গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পৈতৃক নিবাস বিক্রমপুরের দামপাড়ায়। মুন্সীগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৮৯৫ সালে তিনি এন্ট্রান্স এবং পরে জগন্নাথ কলেজ থেকে আইএ পাস করেন। কর্মজীবনের শুরুতে তিনি নেত্রকোনা দত্ত হাইস্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন এবং পরে পুলিশ বিভাগে সাব-ইনস্পেক্টর ও ইনস্পেক্টর নিযুক্ত হন।

সৈয়দ এমদাদ আলী ছিলেন কবি, ঔপন্যাসিক ও সম্পাদক। তার অসমাপ্ত উপন্যাস নবযুগ, দুইমাত্র জীবনী গ্রন্থ হাজেরা ও তাপসী রাবেয়া এবং একটি মাত্র কবিতার বই ডালি। তাপসী রাবেয়া প্রকাশিত হয়েছে ১৯১৭, হাজেরা ১৯২৯ আর ডালি ১৯১২ খ্রিষ্টাব্দে। ১৯৬৬ খ্রিষ্টাব্দে ডালির দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়। ঈদ নিয়ে এতে দুটি কবিতা পাওয়া যায়। একটি হলো—

কুহেলি তিমির সরায়ে দূরে

তরুণ অরুণ উঠিছে ধীরে

রাঙিয়া প্রতি তরুর শিরে

আজ কি হর্ষ ভরে।

আজি প্রভাতের মৃদুল বায়

রঙ্গে নাচিয়া যেন কয়ে যায়

‘মুসলিম জাহান আজি একতায়

দেখ কত বল ধরে?’ (আংশিক)

এই কবিতার নিচে টীকা হিসেবে সৈয়দ এমদাদ আলী দাবি করেছেন, ‘১৯০৩ সালের ডিসেম্বর মাসে প্রথম বর্ষ নবনূরের সংখ্যায় প্রকাশিত। ইহাই মুসলিম বাংলার প্রথম ঈদ কবিতা।’

দুই

বাংলাদেশের সংবাদপত্রের ইতিহাসে প্রথম ঈদ সংখ্যা প্রকাশের কৃতিত্বও সম্ভবত সৈয়দ এমদাদ আলীর। “১৯০৩ সালে প্রকাশিত সৈয়দ এমদাদ আলী-সম্পাদিত ‘নবনূর’ পত্রিকাই খুব সম্ভবত প্রথমবার ঈদ সংখ্যা প্রকাশ করে। ১৯০৩, ১৯০৪, ১৯০৫—পরপর এই তিন বছরই ‘নবনূর’ ঈদ সংখ্যা প্রকাশ করে; এই অর্থে অন্তত যে প্রত্যেক বছরই এই পত্রিকায় ঈদ-সংক্রান্ত লেখা প্রকাশিত হয়েছে।” (বাংলা সাহিত্যে ঈদ-উৎসব, বাংলা সাহিত্যে মুসলমান, আবদুল মান্নান সৈয়দ)

এই পত্রিকায় বিশেষভাবে লিখতেন স্বয়ং সৈয়দ এমদাদ আলী, কবি কায়কোবাদ (১৮৫৭-১৯৫১) এবং বেগম রোকেয়া (১৮৮০-১৯৩২)। পৌষ ১৩১১ বঙ্গাব্দ সংখ্যায় কায়কোবাদ লেখেন ‘ঈদ’ নামে কবিতা।

বাঙালি মুসলমান লেখকদের পাশাপাশি ‘নবনূর’-এর ঈদ সংখ্যায় ঈদ বিষয়ে বাঙালি হিন্দুকেও গদ্য-পদ্য লিখতে দেখা যায়। “বিখ্যাত ঐতিহাসিক রামপ্রাণ গুপ্ত (১৮৬৯-১৯২৭) ‘নবনূর’-এর ফাল্গুন ১৩১১ সংখ্যায় লিখেছিলেন ‘ঈদুজ্জোহা’ নামক প্রবন্ধ। ‘নবনূর’-এর পৌষ ১৩১২ সংখ্যায় একই সঙ্গে ঈদ-সম্পর্কিত তিনটি লেখা প্রকাশিত হয়। সৈয়দ এমদাদ আলীর ‘ঈদ’ কবিতা, জীবেন্দুকুমার দত্তের ‘ঈদ সম্মিলন’ কবিতা এবং মিসেস আরএস হোসেন অর্থাৎ বেগম রোকেয়ার ‘ঈদ সম্মিলন’ গদ্যপ্রবন্ধ।” (বাংলা সাহিত্যে ঈদ-উৎসব, বাংলা সাহিত্যে মুসলমান, আবদুল মান্নান সৈয়দ)

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, বাংলাদেশের বর্তমান সময়ের প্রকাশিত ঈদ সংখ্যাগুলোতে মুসলমান কবিদেরও ঈদ নিয়ে কবিতা লিখতে দেখা যায় না। বর্তমান সময়ের ঈদ সংখ্যাগুলোতে বিষয় হিসেবে ঈদ প্রায় অনুপস্থিত।

দ্বিতীয় ঈদ সংখ্যা হিসেবে মাসিক আল ইসলাহ ১৯৩৬ সালের ডিসেম্বর মাসে প্রকাশিত হয়। আল ইসলাহ পত্রিকাটি সিলেট থেকে প্রকাশিত একটি অন্যতম জনপ্রিয় মাসিক পত্রিকা। কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ (কেমুসাস) থেকে এটি প্রকাশিত হয়। ঈদুল ফিতর উপলক্ষে প্রকাশিত এই সংখ্যার সম্পাদক ছিলেন মোহাম্মদ নূরুল হক।

এই সংখ্যার মোটামুটি সব লেখাই ছিল ঈদকেন্দ্রিক। লেখার নামের মধ্যেই বিষয়বস্তুর পরিচয় পাওয়া যায়, যেমন সুফিয়া কামালের (তখন সুফিয়া এন হোসেন নামে লিখতেন) কবিতা ‘আমাদের ঈদ’, মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকার কবিতা ‘চাঁদ রাত’, মুহাম্মদ আব্দুল বারীর গল্প ‘সার্থক ঈদ’ ও ‘পবিত্র ঈদুল ফেতর’ নামক প্রবন্ধ।

তৃতীয় ঈদ সংখ্যাটি সাপ্তাহিক মোহাম্মদীর। ১৯৩৮ সালের নভেম্বর মাসে এই ঈদ সংখ্যাটি বের হয়। পত্রিকা শুরু হয়েছে বজলুর রহমানের ‘ঈদের মোনাজাত’ শীর্ষক কবিতা দিয়ে। এ ছাড়া শাহাদাৎ হোসেন, সুফিয়া কামাল ও আজিজুর রহমান ঈদ নিয়ে কবিতা লেখেন। অন্যান্য বিষয়ের কবিতাগুলোর মধ্যে জসীম উদ্দীনের ‘জলের ঘাটে’, সিরাজুল আলমের ‘কালো’, শ্রীমণীন্দ্র দত্তের অনুবাদ কবিতা ‘কারখানার হুইসল’ উল্লেখযোগ্য। আজহারুল ইসলাম বিএ কর্তৃক রুবাইয়াৎ-ই-সাইফ উদদীন বাখারজীর মূল ফারসি থেকে অনুবাদ ছিল।

১৯৪৬ সালে প্রকাশিত হয় মিল্লাতের ঈদ সংখ্যা। পত্রিকাটির সম্পাদক ছিলেন বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক ও দার্শনিক আবুল হাশিম ও ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ছিলেন প্রখ্যাত সাংবাদিক কাজী মোহাম্মদ ইদরিস। ১৯৪৫ সালের ১৬ নভেম্বর ঈদুল আজহার দিনে বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের মুখপত্র হিসেবে সাপ্তাহিক মিল্লাতের যাত্রা শুরু হয়।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন