দালাল-সিন্ডিকেটের দখলে মিটফোর্ড হাসপাতাল

গোলাম মোস্তফা

দালাল-সিন্ডিকেটের দখলে মিটফোর্ড হাসপাতাল

পুরান ঢাকার স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতালের পেইং শিশু ওয়ার্ড। গতকাল শনিবার দুপুর ১২টায় ৭০৪ নম্বর রুমে জনি মিয়া নামের একজনকে ঘিরে আছে কয়েকজন রোগী ও তাদের স্বজন। তার হাতে থাকা রোগীদের ফাইলগুলো দেখছেন, আর কখন কোন টেস্ট করতে হবে, কত খরচ হবে এবং কার কাছে কোথায় যেতে হবে— তা বিস্তারিত বুঝিয়ে দিচ্ছেন। একই সঙ্গে রোগীদের হাতে ছোট্ট টোকেনে মোবাইল নম্বরসহ ক্লিনিকের ঠিকানাও লিখে দিচ্ছেন তিনি।

এ সময় সাংবাদিক পরিচয় গোপন করে রোগীর স্বজন পরিচয়ে সিবিসি (রক্ত পরীক্ষা), এক্স-রে (বুকের) এবং সিরাম বিলিরুবিন (জন্ডিস)-সহ বিভিন্ন টেস্টের খরচ জানতে চাওয়া হয় তার কাছে । তখন তিনি প্রথমে জানতে চান আপনার রোগী কোথায়, কোন ওয়ার্ডে ভর্তি রয়েছে। কথাবার্তার একপর্যায়ে তার সন্দেহ হলে নানান প্রশ্ন শুরু করেন এবং বলেন, ‘ভাই মনে হয় আপনি সাংবাদিক, প্লিজ আমার পেটে লাথি দেবেন না। আপনার যদি এই হাসপাতালে কোনো সাহায্যের প্রয়োজন হয় তাহলে আমি সব করে দেব’ এই বলে তিনি সরে যান এবং কোনো কথা বলতে রাজি হননি।

বিজ্ঞাপন

পরে ওয়ার্ডে থাকা রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জনি মিয়া হাসপাতালের কোনো কর্মচারী নয়। তিনি আশপাশে প্রাইভেট হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে কমিশনের ভিত্তিতে রোগীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানোর ব্যবস্থা করে দেন। এছাড়া রোগীদের হাসপাতাল থেকে ভাগিয়ে আশপাশে ভর্তির ব্যবস্থা করে দেন।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ড, বহির্বিভাগ ও জরুরি বিভাগে প্রতিদিন চিকিৎসাসেবা নিতে ভিড় করছেন হাজারো মানুষ। এখানে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের অধিকাংশই স্বল্প ও নিম্নআয়ের মানুষ। টিকিট কাউন্টার থেকে শুরু করে ব্যাংকে টাকা জমা দেওয়া, প্যাথলজি বিভাগে বিভিন্ন পরীক্ষা, নিরীক্ষা, এমআরই, সিটিস্ক্যান কিংবা ডায়ালাইসিস, চিকিৎসকের রুমের সামনে রোগীদের উপচে পড়া ভিড়। কোথাও পা ফেলার জায়গা নেই। ঘণ্টার পর ঘণ্টা দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে দেখা গেছে। আবার শয্যার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি রোগী থাকায় বাধ্য হয়ে হাসপাতালের বারান্দা ও মেঝেতে চিকিৎসা নিচ্ছেন অনেকে। আর মেঝেতে থাকায় চিকিৎসা পেতে নানা ভোগান্তি ও বিড়ম্বনার শিকার হতে হচ্ছে তাদের।

অপরিচ্ছন্ন মেঝেসহ বিভিন্ন ওয়ার্ডের শৌচাগার নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন অনেকেই। হাসপাতালের কয়েকটি ভবন অনেক পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ। এসব ভবনে চিকিৎসাসেবা দেওয়ায় রোগী চিকিৎসক-কর্মকর্তা ও নার্সরাও আতঙ্কে থাকেন সব সময়। এছাড়া স্বল্প ব্যয়ে উন্নত চিকিৎসার প্রত্যাশায় আসা এসব রোগীর বড় একটি অংশ টিকিট কাটা থেকে চিকিৎসক দেখানো, সিট পাওয়াসহ বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষায় দালাল চক্রের বিড়ম্বনার শিকার হন বলেও অভিযোগ করেছেন রোগী ও তাদের স্বজনরা।

এতে একদিকে রোগীদের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে, অন্যদিকে সরকারি হাসপাতালের সেবাব্যবস্থাও প্রশ্নের মুখে পড়ছে। শুধু তাই নয়, রোগীদের বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও রয়েছে। আর দালালচক্রের তৎপরতার বিষয়টি স্বীকারও করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

ভুক্তভোগীরা জানান, হাসপাতালের গেট, জরুরি বিভাগ ও বহির্বিভাগে দালালরা সব সময় অবস্থান করেন। দ্রুত সময়ের মধ্যে রোগীদের চিকিৎসাসেবা প্রদান, টিকিট সংগ্রহ, সিরিয়াল, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, সিটের ব্যবস্থা ও চিকিৎসক দেখানোর জন্য দালালচক্র তাদের দৌরাত্ম্য চালায়। নানা প্রলোভন ও ভুল তথ্য দিয়ে তারা রোগীদের আশপাশের নির্দিষ্ট ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে উৎসাহিত করে। কমিশনের বিনিময়ে রোগী পাঠানোর এই প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। আর বেসরকারি সেবা প্রতিষ্ঠানের নিয়োগকৃত এসব দালালের সঙ্গে সরাসরি যোগসাজশ রয়েছে হাসপাতালের চিকিৎসক থেকে শুরু নার্স, ওয়ার্ডবয়, অফিস সহকারী, আয়া কিংবা নিরাপত্তাকর্মীরা। যদিও সম্প্রতি যৌথ বাহিনীর অভিযানে ৩০ দালালকে আটক করা হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে হাসপাতালের এক কর্মচারী আমার দেশকে জানান, হাসপাতালে কয়েকটি দালালচক্র সক্রিয় রয়েছে। একটি চক্র গ্রাম থেকে আসা অসহায় রোগী ও স্বজনদের টার্গেট করে হাসপাতালের নানা ভোগান্তির কথা বলে বেসরকারি ক্লিনিকে নিয়ে যায়। আরেকটি চক্র চিকিৎসকের কক্ষের সামনে অবস্থান নিয়ে ব্যবস্থাপত্র দেখেই তদারকি শুরু করে। তারা বলেন, সিট নাই, ভর্তি হতে কয়েকদিন লেগে যাবে। আবার রোগীদের বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা লেখা থাকলে তাদের বাইরে থেকে কম টাকায় করে দেওয়া যাবে এমন আশ্বাসে নির্দিষ্ট ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঠিয়ে দেয়। এছাড়া কিছু দালাল ওয়ার্ড ও বিভিন্ন পরীক্ষাকেন্দ্রের সামনে ঘুরে রোগীদের প্রভাবিত করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়ে যায়। বিনিময়ে তারা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান থেকে কমিশন পায় এবং রোগীদের কাছ থেকেও ৫০০, ১০০০, ২০০০ টাকা ক্ষেত্রবিশেষে আরো বেশি টাকা আদায় করে। এমনকি হাসপাতালের সিরিয়াল এড়িয়ে দ্রুত পরীক্ষা করিয়ে দেওয়ার নামেও টাকা নেওয়া হয়।

হাসপাতালের প্যাথলজি বিভাগে গিয়ে দেখা যায়, বিভিন্ন পরীক্ষার জন্য রোগী ও স্বজনদের দীর্ঘ সারি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও সেবা পেতে হিমশিম খেতে হচ্ছে অনেককে। এরই মধ্যে কিছু স্টাফ কিছুক্ষণ পরপর একাধিক ব্যবস্থাপত্র নিয়ে সরাসরি কক্ষে প্রবেশ করছেন। তাদের দ্রুত টাকা জমা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা করতে দেখা যায়। যা নিয়ে সাধারণ রোগীদের মধ্যে ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা গেছে।

কেরানীগঞ্জ থেকে আসা রোগী মোমেনা খাতুন আমার দেশকে বলেন, এক পরীক্ষার জন্য কয়েকবার ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়াতে হয়। তাই এখানকার এক কর্মচারীকে দিয়ে দ্রুত ব্যাংকে জমাসহ সব ব্যবস্থা করেছি। তিনি আমার কাছে ২০০ টাকা নিয়েছেন। দ্রুত না করলে দেখা যায় এক পরীক্ষাতে দিন পার হয়ে যায়। তাই টাকা দিয়ে দ্রুত করিয়েছি। তারা যার কাছ থেকে যেমন নিতে পারে। বেশি পরীক্ষা থাকলে বেশি টাকা লাগে।

মেডিসিন বিভাগে ভর্তি হওয়া আমিনুল ইসলাম নামের এক রোগী আমার দেশকে বলেন, হাসপাতালে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও রিপোর্ট পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। জরুরি রিপোর্টের প্রয়োজন হলে অপেক্ষা করতে হয়। তিনি জানান, প্রতিদিনই ওয়ার্ডের মধ্যে ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের লোকেরা আসে। তারা তাদের কার্ড কিংবা মোবাইল নাম্বার দিয়ে যায়। সেই নাম্বারে যোগাযোগ করলে তারাই লোক পাঠিয়ে রোগী নিয়ে যায়, অথবা রোগী গিয়ে টেস্ট করে আসে। তাতে টাকা বেশি খরচ হলেও ভোগান্তি কমে এবং রিপোর্টও দ্রুত পাওয়া যায়।

মিটফোর্ডের নানা সংকটের সুযোগে আশপাশে অন্তত অর্ধশত প্রাইভেট হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার গড়ে উঠেছে এবং তারা রমরমা ব্যবসা করছে বলেও জানা গেছে। এছাড়া হাসপাতালের কিছু চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর বিরুদ্ধেও রোগীদের নির্দিষ্ট ফার্মেসি থেকে ওষুধ কিনতে প্রভাবিত করার অভিযোগ উঠেছে।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, ৯০০ শয্যার বিপরীতে রোগী ভর্তি থাকে প্রায় এক থেকে দেড় হাজার। ইতোমধ্যে দুই হাজার শয্যায় উন্নীত করতে সরকারের কাছে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। বহির্বিভাগে দৈনিক তিন হাজার এবং জরুরি বিভাগে হাজারের বেশি রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। আর ৩৭৫টি পদের বিপরীতে চিকিৎসক ৩৫৯ জন এবং ৭৭৬টি পদে মধ্যে নার্স রয়েছে ৬৩৮ জন। হাসপাতালে সপ্তাহে ছোট-বড় ৪৫০ অপারেশন করা হয়। তবে অপারেশনের সিরিয়াল পেতে এক থেকে দেড় সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হয়। ডায়ালাইসিস মেশিনসহ বেশ কিছু যন্ত্রপাতি নষ্ট রয়েছে। আবার আইসিইউ, পিআইসিইউ এবং এনআইসিইউর সিট সংকটে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয় রোগীদের। তবে সিন্ডিকেট ও তদবির ছাড়া কখনই এখানে সিট পাওয়া যায় না বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ বিষয়ে হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এটিএমএ রুস্তম আমার দেশকে বলেন, এটি দেশের অন্যতম পুরোনো হাসপাতাল, যা ১৮৫৮ সালে চালু হয়। এখানে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ সেবা নেয়। রোগীদের চাহিদার তুলনায় জনবল সংকট রয়েছে। এছাড়া বেশ কিছু ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে চিকিৎসা চলছে। ফলে সবাই এক ধরনের আতঙ্কে থাকেন। কয়েকটি বহুতল ভবন নির্মাণসহ বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ চালু করা গেলে আরো রোগীর চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হবে। এসব সংকট নিরসনে ইতোমধ্যে সরকারের কাছে প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে।

দালাল চক্রের বিষয়ে তিনি বলেন, এটা অস্বীকার করছি না। অনেক দিন ধরেই তা চলছে। দেখা গেছে, আমরা অভিযান চালিয়ে পুলিশে দিই, তারপর বের হয়ে আবার শুরু করে। আমাদের এখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষার কোনো ঘাটতি নেই। হয়তো কিছু ভোগান্তি আছে। তবু সহজ-সরল রোগীদের ভাগিয়ে নিয়ে কিছু লোক নানা ধরনের অপকর্ম করছে। তবে আমরা আস্থার জায়গা থেকে সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর চেষ্টা করছি।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...