শাপলা চত্বরেই ৩২ হত্যার প্রমাণ পেল তদন্ত সংস্থা

সাইদুর রহমান রুমী ও আনোয়ারুল আজিম তুহিন

শাপলা চত্বরেই ৩২ হত্যার প্রমাণ পেল তদন্ত সংস্থা

রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের মহাসমাবেশে ৩২ জনকে হত্যার প্রমাণ পেয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) তদন্ত সংস্থা। গণহত্যার এ ঘটনায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর, ডিএমপি কমিশনার বেনজীর আহমেদ, র‌্যাব কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানসহ ২৫ জনকে অভিযুক্ত করে প্রতিবেদন দাখিল করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে চূড়ান্ত এ প্রতিবেদন জমা দেওয়ার প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

বিগত ২০১৩ সালের ৫ মে রাজধানীর মতিঝিলে হেফাজতে ইসলামের মহাসমাবেশে সংগঠিত গণহত্যার ঘটনায় ট্রাইব্যুনালের তদন্ত চলমান রয়েছে। এ ঘটনায় শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকারসহ ১২ জন ট্রাইব্যুনালের গ্রেপ্তারি পরোয়ানাভুক্ত আসামি। এর মধ্যে চারজন গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছেন। তারা হলেনÑ সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, সাবেক আইজিপি এ কে এম শহীদুল হক, বরখাস্ত সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান ও পুলিশের সাবেক উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মোল‍্যা নজরুল ইসলাম।

বিজ্ঞাপন

শেখ হাসিনা ছাড়া পলাতক অপর আসামিরা হলেনÑ সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর, গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকার, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) হাসান মাহমুদ খন্দকার ও সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ।

ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম গতকাল রোববার জানান, ‘ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা দীর্ঘ সময় ধরে শাপলা চত্বরের গণহত্যার ঘটনা তদন্ত করছে। তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। তদন্তে চট্টগ্রামের কিছু কাজ বাকি আছে। এরপর চলতি মাসের শেষে কিংবা আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে সক্ষম হবে। তবে তদন্তের স্বার্থে এখনই সব আসামির নাম প্রকাশ করা ঠিক হবে না। এ হত্যাকাণ্ডে অর্থায়নকারী ও বিভিন্নভাবে সহযোগীদেরও বিচারের আওতায় আনা হবে বলে তিনি জানান।

অধিকারের চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদন

২০১৩ সালের ৫ মে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে হতাহতদের নিয়ে মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’ সরেজমিন তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে অন্তত ৬১ জন নিহতের তথ্য জানিয়েছিল অধিকার। প্রতিবেদনে ‘অপারেশন ফ্ল্যাশ আউট’ নিয়ে চালানো হত্যাযজ্ঞটি তৎকালীন সরকারের

নির্দেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হিসেবে উল্লেখ করা হয়। দোষীদের শাস্তিসহ ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের দাবি জানায় অধিকার।

প্রতিবেদনে জানানো হয়, তৎকালীন হাসিনা সরকারের নির্দেশে পুলিশ, র‍্যাব ও বিজিবি যৌথভাবে এই বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড চালিয়েছিল। তাদের সুপারিশে এই ঘটনার সঠিক তদন্ত, জড়িতদের শাস্তি নিশ্চিত করা এবং এই ঘটনায় দায়ের করা মিথ্যা মামলাগুলো প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়েছিল। চাঞ্চল্যকর ওই প্রতিবেদনে আহত ও নিহতদের তালিকার পাশাপাশি ওই রাতে কীভাবে গুলি চালানো হয়েছে, তার বিবরণ তুলে ধরা হয়েছিল।

অধিকারের সরেজমিন প্রতিবেদনের পর বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। পরবর্তী সময়ে ২০১৩ সালের ১০ আগস্ট রাতে ‘অধিকার’ সম্পাদক আদিলুর রহমান খানকে তার বাসার সামনে থেকে তুলে নেয় পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)। তাকে সারা রাত গুম করে রাখা হয় এবং পরদিন আদালতে তোলা হয়। পরে ৫৪ ধারায় তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে রিমান্ডে নেওয়া হয়।

পরবর্তী সময়ে আদিলুর রহমান খান এবং অধিকারের পরিচালক এএসএম নাসির উদ্দিন এলানকে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন, ২০০৬ (সংশোধিত ২০০৯)-এর আওতায় মামলা দেওয়া হয়। এ মামলায় তারা যথাক্রমে ৬২ দিন এবং ২৫ দিন কারাগারে ছিলেন।

এরপর এ সংক্রান্ত মামলায় ২০২৩ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর ঢাকার সাইবার ট্রাইব্যুনালের বিচারক জুলফিকার হায়াৎ পর্যাপ্ত তথ্যপ্রমাণ ছাড়াই আদিলুর রহমান খান এবং এএসএম নাসির উদ্দিন এলানকে দুই বছরের কারাদণ্ড দেন।

সমবায় উপদেষ্টার উদ্যোগে নিহতদের ক্ষতিপূরণ

অন্তর্বর্তী সরকারের পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার উদ্যোগে গত বছর ১৮ অক্টোবর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে শাপলা চত্বরের শহীদ পরিবারের সদস্যদের মাঝে আর্থিক সহায়তার চেক বিতরণ করা হয়।

শাপলা চত্বর হত্যাযজ্ঞের শিকার ৫৮ পরিবার এবং ২০২১ সালের মার্চে হত্যাকাণ্ডে নিহত ১৯টি পরিবারের সদস্যদের প্রত্যেককে পরিবারপ্রতি ১০ লাখ টাকা করে মোট সাত কোটি ৭০ লাখ টাকার চেক দেওয়া হয়।

হেফাজতের তৎকালীন ১৩ দাবি

হেফাজতে ইসলাম তাদের ১৩ দাবি পূরণের দাবিতে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে সমাবেশ ডেকেছিল। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের কাছে তাদের ১৩ দাবির মধ্যে ছিল সংবিধানে ‘আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ পুনঃস্থাপন এবং কোরআন-সুন্নাহবিরোধী সব আইন বাতিল করা; আল্লাহ্, রাসুল (সা.) ও ইসলাম ধর্মের অবমাননা এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে কুৎসা রোধে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে জাতীয় সংসদে আইন পাস; কথিত শাহবাগী আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী স্বঘোষিত নাস্তিক-মুরতাদ এবং প্রিয় নবীর (সা.) শানে জঘন্য কুৎসা রটনাকারী ব্লগার ও ইসলামবিদ্বেষীদের সব অপপ্রচার বন্ধসহ কঠোর শাস্তিদানের ব্যবস্থা করা; সরকারিভাবে কাদিয়ানিদের অমুসলিম ঘোষণা এবং তাদের প্রচারণা ও ষড়যন্ত্রমূলক সব অপতৎপরতা বন্ধ করা; মসজিদের নগর ঢাকাকে মূর্তির নগরে রূপান্তর এবং দেশব্যাপী রাস্তার মোড়ে ও কলেজ-ভার্সিটিতে ভাস্কর্যের নামে মূর্তি স্থাপন বন্ধ করা; জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমসহ দেশের সব মসজিদে মুসল্লিদের নির্বিঘ্নে নামাজ আদায়ে বাধাবিপত্তি ও প্রতিবন্ধকতা অপসারণ এবং ওয়াজ-নসিহত ও ধর্মীয় কার্যকলাপে বাধাদান বন্ধ করা।

গণহত্যার বিচার নিশ্চিত দাবি হেফাজতের

এদিকে শাপলা চত্বরে সংঘটিত গণহত্যার বিচার নিশ্চিতের জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে দাবি জানিয়েছেন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী ও মহাসচিব আল্লামা সাজেদুর রহমান।

হেফাজত নেতারা বিচার নিশ্চিতের দাবি জানিয়ে বলেন, ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে হেফাজতের লাখো জমায়েতের ওপর ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের পরিকল্পিত নৃশংস গণহত্যায় অগণিত ধর্মপ্রাণ মানুষ শহীদ হন। হাজার হাজার আলেম, হাফেজ ও নবীপ্রেমিক জনতা আহত এবং পঙ্গুত্ব বরণ করেন। আমরা ৫ মের মহান শহীদদের স্মরণে সারা দেশে দোয়া ও আলোচনা সভা আয়োজন করার জন্য হেফাজতের নেতাকর্মীসহ সবার প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।

হেফাজত নেতারা আরো বলেন, ৫ মের গণহত্যার দায়ে পতিত ফ্যাসিস্ট হাসিনাসহ ৫৪ জনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হেফাজতে ইসলামের পক্ষ থেকে করা মামলা বিচারাধীন রয়েছে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমাদের জোর দাবি, দেশে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার স্বার্থে শাপলার খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করুন।

তারা দুঃখের সঙ্গে বলেন, ২০১৩ সালে ৫ মের গণহত্যার প্রতিবাদে সবাই মাঠে নামলে পরবর্তী সময়ে চব্বিশের জুলাই ম্যাসাকার দেখতে হতো না। তৎকালীন রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যর্থতা, ইসলামবিদ্বেষী সেক্যুলারদের উসকানি ও সুশীল সমাজের বড় অংশের নীরবতার মধ্য দিয়েই ফ্যাসিবাদের উত্থান ঘটতে হয়েছিল।

হেফাজত নেতারা আরো বলেন, ২০১৩ সালে ইসলামবিদ্বেষী ও আধিপত্যবাদীদের প্রজেক্ট গণজাগরণ মঞ্চের বিরুদ্ধে শাপলার চেতনা রুখে না দাঁড়ালে অচিরেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব লুণ্ঠিত হতো। প্রতিবাদী আলেম-ওলামা ও ইসলামপন্থিদের ‘না-মানুষ’ বানানো ইসলামবিদ্বেষীদের বিরুদ্ধে শাপলার রক্তাক্ত চেতনা জাগ্রত রাখতে হবে। এছাড়া বর্তমান সরকার প্রত্যেক নাগরিকের মানবিক মর্যাদা, নিরাপত্তা ও ধর্মীয় অনুভূতি রক্ষায় ব্যর্থ হলে জনগণ তাদের প্রত্যাখ্যান করবে। এটি সরকারকে মাথায় রাখতে হবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন