আসন্ন সংসদ নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা ঘিরে কঠোর ডিজিটাল নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। তিন স্তরের যাচাই-বাছাই সম্পন্ন করার পরই চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা করা হবে বলে জানিয়েছে কমিশন। এ লক্ষ্যে নির্বাচন ভবনের খোলা চত্বরে বৃহৎ ডিজিটাল মনিটরিং স্ক্রিন স্থাপন, গণমাধ্যমের জন্য ৮৭টি বুথ এবং সম্পূর্ণ ইন্টারনেটবিহীন একটি ‘ক্লোজড নেটওয়ার্ক’ ব্যবস্থার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। ইসি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
ইসির অতিরিক্ত সচিব কে এম আলী নেওয়াজ আমার দেশ-কে জানান, এবার তিন স্তরের যাচাইয়ের পর ভোটের ফলাফল ঘোষণা করা হবে। তিনি বলেন, ফলাফল কোনোভাবেই হ্যাক হওয়ার সুযোগ নেই, কারণ আমরা ইন্টারনেট ব্যবহার করছি না। ইসির নিজস্ব সুরক্ষিত ভিপিএন নেটওয়ার্কের মাধ্যমেই ফলাফল আদান-প্রদান হবে। তবে নির্বাচন বিশ্লেষকদের মতে, ইন্টারনেট সংযোগ না থাকলেও অভ্যন্তরীণ সিস্টেমের স্বচ্ছতা, অডিটযোগ্যতা ও মানবীয় ত্রুটি এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে যেতে পারে।
নির্বাচন ভবনেই কেন্দ্রীয় ফলাফল ঘোষণা
ইসি সূত্রে জানা গেছে, ফলাফল ঘোষণার কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে নির্বাচন ভবনের খোলা চত্বরে। সেখানে তিনটি বড় ডিজিটাল মনিটরিং স্ক্রিন বসানো হবে। দর্শনার্থী ও অতিথিদের সুবিধার্থে ভবনের ডান ও বাম পাশে আরো দুটি বিশাল স্ক্রিন স্থাপন করা হবে।
রিটার্নিং কর্মকর্তারা বেসরকারিভাবে ফলাফল ঘোষণা করার সঙ্গে সঙ্গেই সংশ্লিষ্ট তথ্য ডেটা সেন্টারে পৌঁছে যাবে। নির্বাচন কমিশন কোনো আসনের ১০০টি কেন্দ্রের মধ্যে অন্তত পাঁচটি কেন্দ্রের ফলাফল হাতে পেলেই তা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করবে। একই সঙ্গে ডিজিটাল ডিসপ্লে বোর্ডে মোট ফলাফল ও গণভোটের ফল আলাদাভাবে দেখানোর ব্যবস্থা থাকবে।
ফলাফল যাচাইয়ের ধাপ
ইসি সংশ্লিষ্টরা জানান, ভোটকেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসাররা কেন্দ্রের ফলাফল সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কাছে পাঠাবেন। সেখানে একটি বিশেষ ড্যাশবোর্ড সিস্টেম থাকবে, যার বাম পাশে ফলাফলের স্ক্যান কপি দেখা যাবে। প্রিসাইডিং অফিসার ও সহকারী রিটার্নিং অফিসার ডান পাশে তথ্য ইনপুট দেবেন। উভয় পক্ষ তথ্যের যথার্থতা যাচাই করার পর তা রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে পাঠানো হবে। এসব তথ্যের ভিত্তিতেই নির্বাচন কমিশন কেন্দ্রীয়ভাবে ফলাফল ঘোষণা করবে।
ফলাফল ঘোষণায় কেন্দ্রীয় টিম
কেন্দ্রীয়ভাবে ফলাফল ঘোষণার জন্য তিন সদস্যের একটি টিম গঠন করা হয়েছে। এতে রয়েছেন—ইসির অতিরিক্ত সচিব কে এম আলী নেওয়াজ, যুগ্ম সচিব ডিএম আতিকুর রহমান এবং পরিচালক সাইফুল ইসলাম। পুরো প্রক্রিয়ার সার্বিক তত্ত্বাবধানে থাকবেন ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ।
ভোট পড়ার হার জানানো হবে তিন দফায়
সূত্র জানায়, ভোটগ্রহণ চলাকালে দুই ঘণ্টা পরপর ভোট পড়ার হার গণমাধ্যমের মাধ্যমে জানানো হবে। এ তথ্য জাতির উদ্দেশে জানাবেন ইসির সিনিয়র সচিব। ভোটগ্রহণ শেষে চূড়ান্ত ভোটের হার প্রকাশ করা হবে।
ইএমএস ও আরএমএসে ফলাফল পাঠানো হবে রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে বার্তা শিটের মাধ্যমে ইএমএস (ইলেকশন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম) সফটওয়্যার ব্যবহার করে আংশিক বা পূর্ণ ফলাফল পাঠানো হবে। আগের মতোই প্রিসাইডিং অফিসাররা ভোটকেন্দ্রে ফলাফল টানিয়ে রাখবেন এবং একটি কপি প্রার্থীর এজেন্টকে দেবেন। অন্য একটি কপি ডাকযোগে পাঠানো হবে এবং মূল কপি সরাসরি রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে পাঠানো হবে। তবে এবার ভোটকেন্দ্র থেকে সরাসরি নির্বাচন কমিশনে কোনো ফলাফল যাবে না। সব ফলাফল রিটার্নিং কর্মকর্তাদের মাধ্যমেই কমিশনে পৌঁছাবে।
এবার আগের নির্বাচনে ব্যবহৃত ‘কপোত’ অ্যাপের পরিবর্তে আলোচনায় রয়েছে ইএমএসের একটি বিশেষ মডিউল ‘আরএমএস’ (রেজাল্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম)। এটি একটি ডেটা ট্রান্সফারিং সিস্টেম, যার মাধ্যমে মাঠপর্যায়ের ফলাফল দ্রুত প্রধান কার্যালয়ে পৌঁছানো সম্ভব হবে।
ইসি কর্মকর্তারা বলছেন, প্রযুক্তিগতভাবে পুরো প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত নিরাপদ। এটি ইন্টারনেট বা অনলাইনে উন্মুক্ত নয় এবং একটি ক্লোজড লুপ ভিপিএন সিস্টেমে পরিচালিত হওয়ায় বাইরে থেকে হস্তক্ষেপের সুযোগ নেই। কমিশনের দাবি, এতে ফলাফলের নির্ভুলতা ও গোপনীয়তা নিশ্চিত থাকবে।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক অধ্যাপক ড. বদিউল আলম মজুমদার আমার দেশকে বলেন, কমিশন যেসব কর্মকাণ্ড করছে তা আত্মঘাতী। তাদের এসব কার্যক্রম দেখে মনে হচ্ছে তারা পক্ষপাতদুষ্ট। নির্বাচনটাকে বিতর্কিত করতেই নির্বাচনের ফল সরাসরি ভোটকেন্দ্রের দায়িত্বরত প্রিসাইডিং অফিসারের কাছ থেকে না নিয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তার মাধ্যমে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন, যা অত্যন্ত দুঃখজনক।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

