জীবিত অবস্থায় নিজেকে ‘ইমাম মেহেদি’ দাবি করা নুরুল হক ওরফে নুরাল পাগলের মাজার ও বাড়িতে হামলা চালিয়েছে বিক্ষুব্ধ জনতা। এ সময় ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় পুলিশসহ অর্ধশতাধিক মানুষ আহত এবং একজন নিহত হয়েছেন।
শুক্রবার দুপুরে জুমার নামাজের পর রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ পৌরসভার ৫ নং ওয়ার্ডে এই ঘটনা ঘটে।
উল্লেখ্য, গত ২৩ আগস্ট ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান গোয়ালন্দ মাজারের কথিত পীর নুরুল হক ওরফে নুরাল পাগল। পরে তাকে দরবার প্রাঙ্গণে ১২ ফুট উঁচু বেদিতে দাফন করা হয়। এরপর থেকেই ‘ইমান আকিদা রক্ষা কমিটি’ কবর নিচু করা, রঙ পরিবর্তন ও ‘ইমাম মেহেদি দরবার শরিফ’ শীর্ষক সাইনবোর্ড অপসারণের দাবি জানায়।
প্রশাসনের মধ্যস্থতায় শুক্রবার সকালে এসব দাবি বাস্তবায়ন করা হয়। এমনকি মাজারের ভক্তরা গোয়ালন্দ প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে তা নিশ্চিত করেন। কিন্তু তারপরও পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয় এবং তা হামলায় রূপ নেয়।
এর আগে বুধবার রাজবাড়ী প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে আলেমরা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন, ১১ সেপ্টেম্বরের মধ্যে কবর স্বাভাবিক না হলে ১২ সেপ্টেম্বর জুমার পর ‘মার্চ ফর গোয়ালন্দ’ কর্মসূচি পালন করা হবে।
আলেম-ওলামাদের দাবি ছিল কবর ইসলামী শরীয়ত অনুযায়ী করা হোক। তাদের অভিযোগ, নুরাল পাগল জীবিত অবস্থায় নিজেকে ‘ইমাম মেহেদি’ দাবি করেছিলেন এবং মৃত্যুর পর তাকে বিশেষ কায়দায় দক্ষিণমুখী মাথা দিয়ে দাফন করা হয়, যা ইসলামী শরিয়তের পরিপন্থি। যদিও মাজারের ভক্তরা দাবি করেন ইসলামের সব নিয়ম-কানুন মেনে চলা হয় এবং ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের বিভ্রান্তি ছড়াতে দেওয়া হয় না।
জানা গেছে, জুমার নামাজ শেষে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ফকীর আনছার ক্লাব চত্বরে ‘ইমান আকিদা রক্ষা কমিটি’র ব্যানারে বিক্ষোভ সমাবেশ হয়। সভায় বক্তব্য দেন গোয়ালন্দ উপজেলা ইমাম কমিটির সভাপতি মাওলানা জালাল উদ্দিন, উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি আইয়ুব আলী খান, পৌর বিএনপির সভাপতি আবুল কাশেম মণ্ডলসহ বিভিন্ন ইসলামী দলের নেতারা।
সমাবেশ শেষে বিক্ষুব্ধ জনতা দরবারের দিকে অগ্রসর হলে পুলিশ ও প্রশাসন তাদের ঠেকানোর চেষ্টা করে। এ সময় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সরকারি গাড়ি, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও গোয়ালন্দ ঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। এতে অন্তত ৫ পুলিশ সদস্য ও স্থানীয় প্রশাসনের দুই কর্মকর্তা আহত হন। পরে বিক্ষুব্ধরা নুরাল পাগলের মাজারে প্রবেশ করে ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ চালায় এবং একপর্যায়ে নুরালের কবর খুঁড়ে লাশ পদ্মার মোড়ে এনে আগুনে পোড়ায়।
এ ঘটনায় দেবগ্রাম ইউনিয়নের পূর্ব তেনাপঁচা জুটমিস্তি পাড়ার আজাদ মেম্বারের ছেলে রাসেল মোল্লা (২৮) নিহত হন। তিনি নুরাল পাগলের ভক্ত ও অনুসারী। রাসেলের চাচাতো ভাই জেলা ছাত্রদলের নেতা শাহরিয়ার আদনান নুর ইসলাম এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সেনাবাহিনী ও র্যাব ঘটনাস্থলে মোতায়েন করা হয়। তবে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল। ফায়ার সার্ভিস আগুন নেভাতে একাধিকবার চেষ্টা করলেও ভেতরে প্রবেশ করতে ব্যর্থ হয়।
গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. নাহিদুর রহমান বলেন, ‘আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা সত্ত্বেও বিক্ষুব্ধ জনতা হামলা চালিয়েছে। আমার গাড়ি ও পুলিশের দুটি গাড়ি ভাঙচুর হয়েছে। কতজন আহত হয়েছেন তা এখনো নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।’
গোয়ালন্দ ঘাট থানার ওসি মো. রাকিবুল ইসলাম বলেন, উভয়পক্ষের সঙ্গে একাধিক বৈঠক হয়েছিল। তাই এমন হামলার আশঙ্কা ছিল না। কিন্তু বিক্ষোভকারীরা হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে হামলা চালায়। এ সময় আমি ও রাজবাড়ীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শরীফ আল রাজিব আহত হয়েছি।
গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসক ডা. মো. শরিফ ইসলাম জানান, হাসপাতালে ২২ জন আহত রোগী আনা হয়েছে। এর মধ্যে তিনজনকে ভর্তি রাখা হয়েছে এবং ১৯ জনকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

