আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

থানার ভেতরে মা-মেয়েকে নির্যাতন: পেকুয়ার সেই ওসিকে আদালতে তলব

স্টাফ রিপোর্টার, কক্সবাজার

থানার ভেতরে মা-মেয়েকে নির্যাতন: পেকুয়ার সেই ওসিকে আদালতে তলব

কক্সবাজারের পেকুয়ায় থানার ভেতরে কলেজ শিক্ষার্থী মেয়ে ও তার মাকে নির্যাতনের পর সাজা দেয়ার ঘটনায় পেকুয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) তলব করেছে আদালত। আগামী ১৬ মার্চের মধ্যে তাকে আদালতে হাজির হয়ে ব্যাখ্যা দিতে নির্দেশ দেয়া হয়।

বিজ্ঞাপন

সোমবার কক্সবাজার চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ শফিউল আযম এক আদেশে এই নির্দেশনা দেন।

সুত্র মতে, গত ০৪ মার্চ ঘুষের টাকা ফেরত চায়তে গিয়ে পেকুয়া থানার ভেতরে পুলিশের হাতে দুই নারী মারধর শিকার ও পরে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে ডেকে এনে তাদের একমাস করে সাজা দেয়ার ঘটনা ঘটে।

এ ঘটনায় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হলে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়।

তাদের দাবি, পুলিশ থানার ভেতরে দুজন নারীকে নির্যাতন করে আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়েছেন এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তার সামনে ঘটনা না ঘটার পরও রক্তাক্ত অবস্থায় ওই নারীদের সাজা দিয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন।

ওই ঘটনার সুত্র ধরে গত ৭ মার্চ কক্সবাজার জেলার অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সেই দুই নারীর সাজা বাতিল করে তাদের মামলার দায় থেকে বেকসুর খালাস দেন।

এদিকে আদালতের আদেশে বলা হয়েছে, ঘটনার প্রকৃত ও পূর্ণাঙ্গ বিবরণ, অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে গৃহীত আইনগত ব্যবস্থা, থানায় রুজুকৃত জিডি বা মামলা, অভিযুক্তদের আটক করার কারণ এবং পরবর্তীতে বিজ্ঞ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার জন্য উপস্থাপনের প্রক্রিয়া সম্পর্কে ১৬ মার্চের মধ্যে পেকুয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে আদালতে হাজির হয়ে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে নির্দেশ দেওয়া হলো। ব্যাখ্যার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জিডি বা মামলা, গ্রেপ্তার সংক্রান্ত নথি, ডিউটি রোস্টার, সিসিটিভি ফুটেজ এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক কাগজপত্রের সত্যায়িত অনুলিপি সংযুক্ত করারও নির্দেশ দেন আদালত।

আদালত পর্যবেক্ষণে বলেন, সংবাদমাধ্যম ও বিভিন্ন অনলাইন পোর্টালে প্রকাশিত তথ্য এবং এ ঘটনা সংক্রান্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার ব্যাখ্যাসম্বলিত ভিডিও বার্তা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, অভিযুক্ত নারীগণ থানায় এসে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের সাথে বাকবিতণ্ডায় জড়ান, গালিগালাজ করেন এবং একপর্যায়ে পুলিশের উপর হামলা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। উক্ত ঘটনার প্রেক্ষিতে তাদের আটক করা হয় এবং পরে বিজ্ঞ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে অবহিত করে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

যদি উল্লিখিত অভিযোগসমূহ সত্য হয়ে থাকে, তবে এরকম কর্মকাণ্ড সরকারি কর্তব্য পালনে বাধা প্রদান বা সরকারি কর্মচারীর উপর হামলার মতো আমলযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এরকম পরিস্থিতিতে ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮ এর ধারা ১৫৪ অনুযায়ী প্রাথমিক তথ্য বিবরণী (এফআইআর) রুজু করা এবং ধারা ১৫৭ অনুযায়ী আমলগ্রহণকারী ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট প্রতিবেদন প্রেরণ করা এবং আইনানুগভাবে তদন্ত কার্যক্রম শুরু করা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার আইনি বাধ্যবাধকতা। প্রয়োজনবোধে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে বিধি অনুযায়ী আদালতে উপস্থাপন করার বিধানও রয়েছে।

অন্যদিকে মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯ এর ধারা ৪, ৫ ও ৬ অনুযায়ী ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার ক্ষমতা ও পদ্ধতি নির্দিষ্টভাবে নির্ধারিত রয়েছে এবং উক্ত আইন অনুযায়ী নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনাকালে তার সম্মুখে সংঘটিত অপরাধের ক্ষেত্রে দোষ স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থাগ্রহণের বিধান রয়েছে। পূর্বে গ্রেপ্তারকৃত বা হেফাজতে নেওয়া কোন ব্যক্তিকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের নিকট উপস্থাপনের কোনো সুযোগ উক্ত আইনে নেই।

হাইকোর্ট বিভাগের ২০১৬ সালের ৯ নম্বর স্বতঃপ্রণোদিত বিধি, রাষ্ট্র বনাম নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও টাঙ্গাইলের সখীপুর নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম এবং অন্যান্য এর ২০১৬ সালের ১৮ অক্টোবরের রায়ে বলা হয়েছে, ২০০৯ সালের আইন অনুযায়ী, যদি ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রম শুরুর আগে পুলিশ কর্তৃক গ্রেপ্তার বা আটক করা হয়, তাহলে তাকে দোষী সাব্যস্ত করার কোনও সুযোগ নেই। এবং যদি কেউ উপরোক্ত পদ্ধতিতে দোষী সাব্যস্ত হয়, তাহলে ভ্রাম্যমাণ আদালতের সমগ্র কার্যক্রমই বিকৃত হবে এবং দোষী সাব্যস্ত করার আদেশ অবৈধ এবং এখতিয়ার বহির্ভূত হবে।

ওই রায়ের কথা উল্লেখ করে বিচারক বলেন, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী উক্ত রায় সংশ্লিষ্ট সকলের উপর বাধ্যকর।

আদালত আদেশে আরো বলেন, সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী ঘটনাটি বিজ্ঞ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সম্মুখে সংঘটিত হয়নি এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিদের থানায় আটক করার পর বিজ্ঞ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে। ফলে এক্ষেত্রে পেকুয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কর্তৃক আইনগত প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি মর্মে প্রতীয়মান হয়।

এছাড়াও বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে অভিযুক্ত মহিলাদের থানায় আটক অবস্থায় শারীরিক নির্যাতন করা হয়েছিল মর্মেও অভিযোগ আনা হয়েছে। আইনের শাসন নিশ্চিতকরণ এবং সংবাদমাধ্যমে উল্লেখিত অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের লক্ষ্যে ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮ এর ২৫ ধারার ক্ষমতাবলে বিষয়টি সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার নিকট হতে ব্যাখ্যা তলব করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হলো।

কক্সবাজার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের নাজির এম. এ. ই শাহজাহান নূরী সাংবাদিকদের বলেন, মা-মেয়েকে নির্যাতনের ঘটনায় আদালত স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে পেকুয়া থানার ওসিকে (ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) আগামী ১৬ মার্চের মধ্যে হাজির হয়ে ব্যাখ্যা প্রদানের নির্দেশ দিয়েছেন।

এ ব্যাপারে পেকুয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খায়রুল আলমের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...