আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

বাবলাকে খুন করতে আসে ৫০ জন অস্ত্রধারী, ছিল একে-৪৭

জমির উদ্দিন, চট্টগ্রাম

বাবলাকে খুন করতে আসে ৫০ জন অস্ত্রধারী, ছিল একে-৪৭

চট্টগ্রাম শহর থেকে মাত্র দশ কিলোমিটার দূরে বায়েজিদ থানার আতুরার দীপু। সেখান থেকে আরও কয়েক কিলোমিটার ভেতরে চালিতাতলীর খন্দকারপাড়া। বুধবার সন্ধ্যায় এই শান্ত গ্রামেই ঘটে যায় রক্তাক্ত হত্যাকাণ্ড বিএনপি প্রার্থী এরশাদ উল্লাহর গণসংযোগে ঢুকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় পুলিশের তালিকাভুক্ত ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ সরওয়ার হোসেন ওরফে বাবলাকে।

প্রত্যক্ষদর্শী ও গোয়েন্দা সূত্র বলছে, হত্যার মিশনে অংশ নেয় অন্তত ৫০ জন অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী। তাদের হাতে ছিল দেশীয় অস্ত্রের পাশাপাশি কয়েকটি একে-৪৭ রাইফেলও। খুনিরা এসেছিল রাউজানের বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকা থেকে। যেখানে বর্তমানে অবস্থান করছে বড় সাজ্জাদের সহযোগীদের একটি সশস্ত্র দল।

বিজ্ঞাপন

চালিতাতলীর খন্দকারপাড়া এলাকায় ঢুকতেই শুক্রবারের নিস্তব্ধতা যেন আরও ভারী হয়ে আসে। খুন হওয়া বাবলার বাড়িতে গেলে দেখা যায় শোকের নীরবতা। উঠানে জড়ো আত্মীয়-স্বজন, কেউ নিঃশব্দে বসে, কেউ চুপচাপ চোখ মুছছেন। বাড়ির পেছনের ছোট উঠানে নতুন লাগানো কয়েকটি গাছ, পাশে মাটিতে পড়ে বাবলার পুরোনো একজোড়া জুতা। যেন কিছুক্ষণ আগেও জীবনের ছোঁয়া ছিল এখানে।

পরিবার, প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ৫ নভেম্বর বিএনপির গণসংযোগে বাবলার থাকার কথা ছিল না। তিনি আগেই জানতে পেরেছিলেন কেউ তাকে টার্গেট করছে। তাই প্রার্থী এরশাদ উল্লাহকে জানিয়েছিলেন, সেদিন উপস্থিত থাকতে পারবেন না। কিন্তু মাগরিবের নামাজ শেষে হঠাৎ বের হয়ে দেখেন, প্রার্থীও নামাজ শেষে গণসংযোগে যাচ্ছেন। কল্পনাও করেননি, ঠিক সেই মিছিলেই আসবে তার জীবনের শেষ মুহূর্ত।

৭ মোটরসাইকেল, একটি জিপ ও ছকবাঁধা ঘেরাও

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, ওই গণসংযোগে স্থানীয় লোকের সংখ্যা ছিল অল্প, বেশিরভাগই বহিরাগত। অন্তত সাতটি মোটরসাইকেলে করে আগেই ঢোকে অস্ত্রধারীরা। তাদের পেছনে একটি জিপ গাড়ি-যেটিতে ছিল একে-৪৭ রাইফেল ও ভারী অস্ত্র।

একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, খন্দকারপাড়া শাহ ইজ্জাতুল্লাহ জামে মসজিদের সামনে ছিল ৪-৫ জন পিস্তলধারী। পূর্ব মসজিদের সামনে ব্যাকআপের জন্য অপেক্ষায় ১০–১২ জন। হাজিরপুলে অবস্থান নেয় আরও ৫-৬ জন, আর বড় সাজ্জাদের বাড়ি রূপনগর আবাসিক এলাকায় প্রস্তুত ছিল আরও ১০-১৫ জন। সব মিলিয়ে অন্তত ৫০ জন অস্ত্রধারী মিশনে অংশ নেয় বলে ধারণা পুলিশের।

গুলির শব্দে এলাকাজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে বাবলা মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, ঘাড়ে পিস্তল ঠেকিয়ে টানা ছয় রাউন্ড গুলি করা হয়। তারপর দ্রুত পালিয়ে যায় খুনিরা।

বাবলার ভাই মো. ইমরান খান আজিজ বলেন, প্রত্যক্ষদর্শীরা আমাদের জানিয়েছেন, ভাইকে যিনি গুলি করেছেন, তিনি বড় সাজ্জাদের ডান হাত রাউজানের কদলপুরের রায়হান। ঠিক এক সপ্তাহ আগেই সে বাবলাকে খুনের হুমকি দিয়েছিল। গুলি করে পালানোর সময় তাকে অনেকে চিনে ফেলেছেন।

আজিজ আরও বলেন, মিশন সফল হওয়ার পর সন্ত্রাসীরা সেদিন রাতেই রাউজানের পাহাড়ে ফিরে যায়। প্রশাসন জানে সেখানেই তাদের আস্তানা, কিন্তু অভিযান হয় না। রাউজানের পাহাড় এখন সন্ত্রাসীদের আঁতুড়ঘর।

পুলিশ সূত্র বলছে, নিহত বাবলা চট্টগ্রাম নগর পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী ছিলেন। একসময় তিনি বড় সাজ্জাদের অনুসারী ছিলেন যিনি ‘এইট মার্ডার মামলার’ আসামিদের একজন। কিন্তু পরবর্তীতে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে বড় সাজ্জাদের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিন্ন হয়। সেই বিরোধই বছর ধরে ঘৃণায় পরিণত হয়। বড় সাজ্জাদের আরেক সহযোগী ‘ছোট সাজ্জাদ’ বর্তমানে কারাগারে। কিন্তু সূত্র বলছে, জেলখানা থেকেই সে হত্যার পরিকল্পনা পরিচালনা করত।

চট্টগ্রাম উত্তর পুলিশের উপ-কমিশনার আমিরুল ইসলাম বলেন, আমরা ঘটনার প্রতিটি দিক গুরুত্বসহকারে তদন্ত করছি। ইতিমধ্যে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, প্রধান অভিযুক্তদের ধরতে অভিযান চলছে।

২০১৭ সাল থেকেই হত্যার পরিকল্পনা

তদন্তে উঠে এসেছে, বাবলাকে হত্যা করার পরিকল্পনা নতুন নয়। ২০১১ সালের জুলাইয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সিঙ্গারবিল এলাকা থেকে একে–৪৭ রাইফেলসহ গ্রেপ্তার হয় বাবলা ও তার সহযোগী ম্যাক্সন। ২০১৭ সালে জামিনে বের হয়ে দুজনই কাতারে চলে যান। সেখান থেকেই তারা বাংলাদেশে চাঁদাবাজির নেটওয়ার্ক চালাতেন।

কাতারে মারামারির ঘটনায় সাজা খাটার পর ২০২০ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি বাবলাকে দেশে ফেরত পাঠায় কাতার পুলিশ। দেশে ফিরে তিনি রাজনীতি ও ব্যবসায় যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু ততদিনে বড় সাজ্জাদের রাজত্ব নিয়ন্ত্রণ নেয় ছোট সাজ্জাদ।

বাবলার ভাই আজিজ বলেন, ২০১৭ সালে কাতারে যাওয়ার পর থেকেই বড় সাজ্জাদের টার্গেটে ছিল আমার ভাই। গত বছর জেল থেকে বেরিয়ে সে ভালো হতে চেয়েছিল, কোনো অপরাধে জড়াতে চায়নি। কিন্তু সেই কারণেই আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে সাজ্জাদ। একাধিকবার পরিকল্পনা করেও ব্যর্থ হয়েছিল তারা। শেষ পর্যন্ত ৫ নভেম্বর ৫০ জন অস্ত্রধারী নিয়ে মিশন সফল করে।

চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার সৈয়দ শাহ শরীফ বলেন, কারাবিধি অনুযায়ী বন্দিরা শুধু নিকট আত্মীয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারেন। সপ্তাহে একবার ১০ মিনিট ফোনে কথা বলার সুযোগও থাকে, সবই নিয়মমাফিক হয়। তবে আমরা নজরদারি আরও বাড়িয়েছি, যাতে কেউ নিয়ম ভেঙে বহিরাগতদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পারে। তবে তদন্ত কর্মকর্তারা বলছেন, কারাগারে থাকা অবস্থাতেও ছোট সাজ্জাদ নিয়মের ফাঁক গলে বাইরে যোগাযোগ রাখছিলেন এবং হত্যার প্রস্তুতি দিচ্ছিলেন।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...