আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

এলপিজি সেক্টরে অস্থিরতা দীর্ঘদিনের পরিকল্পনায়

সোহাগ কুমার বিশ্বাস, চট্টগ্রাম

এলপিজি সেক্টরে অস্থিরতা দীর্ঘদিনের পরিকল্পনায়

দেশের জ্বালানি খাতে নতুন উদ্বেগের নাম এলপি গ্যাস। প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ার পর বিকল্প হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা এই জ্বালানি খাতটি গত এক মাসে ভয়াবহ অস্থিরতায় পড়েছে। বাজারে চাহিদা থাকলেও সরবরাহ নেই, সিলিন্ডার মিলছে না, দাম চলে গেছে সাধারণের নাগালের বাইরে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক অজুহাত সামনে থাকলেও বাস্তবে দীর্ঘদিনের পরিকল্পিত সিদ্ধান্ত ও একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের কব্জায় পড়ে পুরো এলপিজি সেক্টর এখন সংকটের মুখে।

গত দেড় দশকে দ্রুত বেড়েছে এলপি গ্যাসের ব্যবহার। গৃহস্থালি, শিল্পকারখানা থেকে শুরু করে যানবাহন—সবখানেই এলপিজি এখন গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি। গত ১৫ বছরে দেশে এলপিজির চাহিদা বেড়েছে অন্তত ২৫ গুণ। আমদানিনির্ভর হলেও এতদিন এই খাতে বড় কোনো সংকট দেখা যায়নি।

বিজ্ঞাপন

তবে গত এক মাস ধরে পুরো এলপিজি সেক্টরে নেমেছে চরম অস্থিরতা। বাজারে সিলিন্ডারের সংকট, বন্ধ এলপিজি পাম্প, আর দ্বিগুণ-তিনগুণ দামে বিক্রি—সব মিলিয়ে ভোগান্তিতে পড়েছেন ভোক্তারা। সরকারও সহসা এই সংকট কাটানোর আশ্বাস দিতে পারছে না। সংশ্লিষ্টদের মতে, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার কথা বলা হলেও বাস্তবে দীর্ঘদিনের পরিকল্পিত সিদ্ধান্ত ও একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের কারণে পুরো সেক্টর অস্থির হয়ে পড়েছে।

১০ প্রতিষ্ঠানের কব্জায় পুরো সেক্টর

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রাকৃতিক গ্যাস ও জ্বালানি তেল বিপণন সরকার নিয়ন্ত্রিত হলেও এলপিজি সেক্টর পুরোপুরি বেসরকারি মালিকানাধীন। এলপিজির জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির পুরো সময়জুড়েই আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকায় এই খাতের নিয়ন্ত্রণ আওয়ামীপন্থি ব্যবসায়ীদের হাতেই কেন্দ্রীভূত হয়। বর্তমানে দেশের শীর্ষ ১০টি শিল্পগ্রুপ পুরো এলপিজি বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে।

এর মধ্যে আওয়ামী লীগসংশ্লিষ্ট শীর্ষ ৪টিসহ মোট ৮টি প্রতিষ্ঠান গত দেড় বছর ধরে রহস্যজনকভাবে এলপিজি আমদানি কমিয়ে দিয়েছে। ফলে বাজারে চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়। এর ওপর ইরান থেকে এলপিজি বহনকারী একাধিক জাহাজের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আরোপ হওয়ায় সংকট আরো ঘনীভূত হয়। বিপর্যয় নামে পুরো সেক্টরে। সংশ্লিষ্টরা দাবি করছেন, নির্বাচনের আগে এই স্পর্শকাতর খাতকে অস্থিতিশীল করতে এটি দীর্ঘমেয়াদি ষড়যন্ত্র কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

অনুমোদন আছে ৩০ প্রতিষ্ঠানের

রাষ্ট্রীয়ভাবে পেট্রোলিয়াম গ্যাসের আমদানি ও বাজার তদারক করে বিইআরসি ও বিপিসি। তাদের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ৩০টি প্রতিষ্ঠানের এলপিজি আমদানি ও বোটলিংয়ের অনুমোদন রয়েছে। এর মধ্যে ২৩টির নিজস্ব টার্মিনাল আছে। বাকি ৭টি প্রতিষ্ঠান অন্যদের কাছ থেকে এলপিজি কিনে স্যাটেলাইট ফিলিং পয়েন্টের মাধ্যমে বাজারজাত করে।

সক্ষমতার দিক থেকে শীর্ষে রয়েছে জেএমআই ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্যাস লিমিটেড, তিনটি প্লান্টের মাধ্যমে যার বার্ষিক বোটলিং সক্ষমতা সাড়ে ৩ লাখ টন। এরপর রয়েছে বিএম এনার্জি, বসুন্ধরা, ওমেরা, ইউনিটেক্স, মেঘনা ফ্রেশসহ একাধিক বড় শিল্পগ্রুপ। এসব শীর্ষ প্রতিষ্ঠানই বাজারের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে।

শীর্ষ দশে এরপরে তালিকায় রয়েছে যথাক্রমে বিএম এনার্জি (৩ লাখ ১০ হাজার টন), বসুন্ধরা ও ওমেরা পেট্রোলিয়াম (তিন লাখ টন), ইউনিটেক্স এলপি গ্যাস লিমিটেড (২ লাখ ৮০ হাজার টন), মেঘনা ফ্রেশ এলপিজি লিমিটেড (আড়াই লাখ টন), পেট্রোম্যাক্স লিমিটেড (১ লাখ ৬০ হাজার টন), সান গ্যাস লিমিটেড (দেড় লাখ টন), এনার্জিপ্যাক পাওয়ার জেনারেশন (১ লাখ টন), ইউনাইটেড গ্রুপের আইগ্যাস (এক লাখ টন), টিএমএসএস এলপিজি লিমিটেড (৬০ হাজার টন) ও প্রিমিয়ার এলপি গ্যাস লিমিটেড (এক লাখ টন)। এছাড়া আরো কিছু প্রতিষ্ঠানের এলপিজি আমদানির সক্ষমতা রয়েছে। এছাড়া আরো কিছু প্রতিষ্ঠান এলপিজি বাজানে আনার অপেক্ষায় রয়েছে। আবার কেউ কেউ স্যাটেলাইট ফিলিং পয়েন্ট ব্যবহার করে বোটলিং করে থাকেন।

আমদানিতে বড় পতন

বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, গত ১৬ বছরে দেশে এলপিজির বাজার বেড়েছে ২৫ গুণ। ২০১০-১১ অর্থবছরে দেশে এলপিজি বাজারজাত হয়েছিল মাত্র ৬৯ হাজার ৫৭২ টন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৭ লাখ ৫১ হাজার ৮৩০ টনে। এর মধ্যে শীর্ষ ১০টি প্রতিষ্ঠানই আমদানি করেছে ১৫ লাখ ৩৪ হাজার ৩৫০ টন।

তবে পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, এক সময়ের শীর্ষ আমদানিকারক বসুন্ধরা এলপি গ্যাস গত তিন বছরে আমদানি অর্ধেকেরও বেশি কমিয়ে দিয়েছে। একইভাবে বেক্সিমকো, ইউনিটেক্স, অরিয়নসহ আরো কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠান হঠাৎ করেই আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়েছে বা বন্ধ করেছে। আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট অন্তত ৮টি প্রতিষ্ঠান গত দেড় বছর ধরে আমদানি কমিয়ে দেওয়ায় বাজারে সরবরাহ সংকট প্রকট আকার ধারণ করে।

আমদানিতে শীর্ষে রয়েছে ওমেরা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি দুই লাখ ৯৯ হাজার ৩০৩ টন এলপিজি আমদানি করেছে। এরপর আছে যথাক্রমে মেঘনা ফ্রেশ (২ লাখ ৩৯ হাজার ৪৪১ টন), যমুনা স্পেসটেক (২ লাখ ১৬ হাজার ৩০৯ টন), বিএম এনার্জি (১ লাখ ৯৬ হাজার ৫২০ টন), গ্রিন টাউন এলপি গ্যাস (১ লাখ ৫৭ হাজার ৬৭৮ টন), পেট্রোম্যাক্স (১ লাখ ১৯ হাজার ১৩৯ টন), ডেল্টা এলপি গ্যাস (৮৯ হাজার ১৬ টন), জেএমআইন (৮২ হাজার ৬৪৬ টন), টোটাল ব্রান্ডের প্রিমিয়ার এলপি গ্যাস (৬৭ হাজার ৪৩৪ টন) ও বসুন্ধরা এলপি গ্যাস (৬৬ হাজার ৮৬৪ টন)।

গত কয়েক বছরের রেকর্ড ঘেঁটে দেখা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এলপি গ্যাস আমদানিতে দশম স্থানে থাকা বসুন্ধরা ২০২১-২২ ও ২০২২-২৩ অর্থবছরে আমদানিতে ছিল শীর্ষে। ২০২১-২২ অর্থবছরে তারা এককভাবে ২ লাখ ৭৫ হাজার ৯৫২ টন ও পরের বছর ২ লাখ ২৬ হাজার ৭১২ টন এলপি গ্যাস আমদানি করেছিল। অথচ সবশেষ অর্থবছরে তাদের গ্যাস আমদানির পরিমাণ মাত্র ৬৬ হাজার ৮৬৪ টন।

শুধু বসুন্ধরাই নয়, শীর্ষ অবস্থানে থাকা আরো কয়েকটি কোম্পানি গ্যাস আমদানি ও বিপণন কমিয়ে দিয়েছে। এর মধ্যে বেক্সিমকো এলপিজি লিমিটেড ২০০২৩-২৪ অর্থবছরে ৭৩ হাজার ৫১৭ টন এলপিজি আমদানি করলেও পরের বছরে এনেছে মাত্র ২৩ হাজার ২১৭ টন। বিতর্কিত শিল্পগ্রুপ এস আলমের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ইউনিটেক্স এলপি গ্যাস ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৪৬৮ টন আমদানি করলেও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আমদানি করেছে মাত্র ২০ হাজার ৭০০ টন। আরেক শিল্পগ্রুপ অরিয়ন ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ছয় হাজার ১৯৬ টন আমদানি করলেও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কোনো এলপিজি আমদানি করেনি। এর বাইরে আওয়ামী এমপি মজিবুর রহমানের মালিকানাধীন বিএম এনার্জি, ইউনাইটেডের আই গ্যাসসহ পতিত আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরো চারটি মিলে মোট আটটি প্রতিষ্ঠান গত দেড় বছর ধরে এলপিজি আমদানি কমিয়ে দিয়েছে রহস্যজনক কারণে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইউনিটেক্স এলপি গ্যাসের এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, আওয়ামী লীগের পতনের পর এলসি করতে সমস্যা হচ্ছে বলে জানানো হয়েছে এস আলমের ম্যানেজমেন্ট থেকে। তবে একই গ্রুপের অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো সক্রিয় থাকলেও শুধু এলপিজিতে স্থবিরতা কেন- সেই প্রশ্নের কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।

চাহিদা বাড়ছে, আমদানি কমছে

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে এলপিজি আমদানি হয়েছিল ১৬ লাখ ১০ হাজার ৪৭০ টন। ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়ায় ১৪ লাখ ৬৮ হাজার ৭০৫ টনে। অথচ প্রতিবছর গড়ে অন্তত ৫০ হাজার টন করে এলপিজির চাহিদা বাড়ছে। অর্থাৎ চাহিদা বৃদ্ধির বিপরীতে এক বছরে আমদানি কমেছে প্রায় দেড় লাখ টন।

নিষেধাজ্ঞায় ভেঙে পড়েছে সাপ্লাই চেইন

ইরান থেকে তেল ও এলপিজি আমদানি ও পরিবহনে জড়িত ৫০টির বেশি ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও জাহাজের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ফলে বাংলাদেশে এলপিজি পরিবহনে ব্যবহৃত একাধিক জাহাজ অপারেশনের বাইরে চলে গেছে। এতে ভেঙে পড়ে সরবরাহ ব্যবস্থা। আগে থেকেই ধুঁকতে থাকা এ সেক্টরে নেমে আসে চরম বিপর্যয়। প্রায় এক মাস ধরে দেশের অধিকাংশ এলপিজি পাম্প বন্ধ রয়েছে। দোকানে সিলিন্ডারও মিলছে না। দুই একটি পাওয়া গেলেও কিনতে হচ্ছে দ্বিগুণ থেকে তিন গুণ দামে।

সরকারকে ব্যবসায় নামার পরামর্শ

চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক পরিচালক ও বিন হাবিব এলপি গ্যাস বিডি লিমিটেডের পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ জানান, মূলত মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোই এলপিজির প্রধান উৎস। হতে গোনা কয়েকটি কোম্পানির সুনির্দিষ্ট কিছু জাহাজ এলপিজি পরিবহন করে। এলপিজি আমদানি ও পরিবহনের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির প্রয়োজন হয়। নিষেধাজ্ঞা ও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠানের ব্যাংকিং জটিলতা তৈরি হয়েছে। এতে কয়েকটি লিডিং কোম্পানি এলপিজি আমদানি করতে পারেনি। সবমিলিয়ে সব কোম্পানির সরবরাহ কমেছে। তবে সরকারের যথাযথ মনিটরিং থাকলে পরিস্থিতি এতটা খারাপ হতো না।

ডেল্টা এলপি গ্যাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও লোয়াব সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক জানান, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরপরই ৮টি কোম্পানি আমদানি কার্যত বন্ধ করে দেয়। তখনই সরকারকে বিষয়টি জানানো হয়েছিল। সময়মতো অনুমতি ও সিদ্ধান্ত এলে সংকট কিছুটা হলেও এড়ানো যেত।

কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেন, দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পিতভাবে এই সংকট তৈরি করা হয়েছে। এখন মার্কিন নিষেধাজ্ঞাকে অজুহাত হিসেবে দেখানো হচ্ছে। দেড় বছর ধরে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান আমদানি কমিয়ে দিয়েছে আবার কয়েকটি প্রতিষ্ঠান আমদানি ও বিনিয়োগ বাড়ানোর আবেদন করেছে। মূলত দুই পক্ষই একটি সিন্ডিকেটের অংশ। এই সিন্ডিকেট ভাঙতে হলে সরকারকেও এলপিজি ব্যবসায় নামতে হবে। এখন জেটি কিংবা স্টোরেজ ব্যবস্থা না থাকলেও ৬ মাসের মধ্যে এই সক্ষমতা অর্জন করা সম্ভব। আর এই সময়ের মধ্যে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সাপোর্ট নিয়ে সরকারকে ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিতে হবে। নইলে এই খাতের শৃঙ্খলা ধরে রাখা কঠিন হবে।

বিপিসির সীমাবদ্ধতা

বিপিসির পরিচালক (অপারেশন) আজাদুর রহমান জানান, সরকার বিপিসিকে এলপিজি আমদানির নির্দেশনা দিয়েছে। তবে বিপিসির এলপিজি হ্যান্ডলিংয়ের অভিজ্ঞতা ও অবকাঠামো নেই। তাই বেসরকারি কোম্পানির সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে বিপণনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নতুন উৎস খোঁজার কাজও চলছে বলে জানান তিনি। শীর্ষ কোম্পানিগুলো আমদানি কমিয়ে দেওয়ার কারণে সংকট ঘনীভূত হয়েছে কি না এমন প্রশ্নের উত্তর দিতে রাজি হননি তিনি।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...