ঈদুল ফিতরের আনন্দমুখর পরিবেশেই চট্টগ্রামে শুরু হয়েছে আরেক ভিন্ন মাত্রার সামাজিক-রাজনৈতিক আয়োজন চাটগাঁইয়া ঐতিহ্যের মেজবান।
রোববার নেতাদের ঘরে ঘরে আয়োজিত মেজবানিতে অংশ নেবেন শত শত দলীয় নেতাকর্মী ও স্থানীয় বাসিন্দারা। এদিন অন্তত চারটি মেজবানির আয়োজন করেছেন চট্টগ্রাম থেকে নির্বাচিত এমপি-মন্ত্রীরা ৷ এছাড়া চসিক মেয়র ও বিএনপির আলোচিত নেতারাও জমকালো আয়োজনের মধ্য দিয়ে ঘরে ঘরে নেতাকর্মীদের আপ্যায়নের ব্যবস্থা করেছেন ৷
রোববার দুপুরের আগেই নেতাদের বাসা ও কমিউনিটি সেন্টারগুলো কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে উঠবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মেজবান শুধু আপ্যায়নের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং এটি হয়ে ওঠে স্থানীয় রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ মিলনমেলা। মন্ত্রী-এমপিদের বাসভবনে আয়োজিত এসব মেজবানে দলীয় নেতাকর্মী, সমর্থক ও নীতিনির্ধারকদের উপস্থিতিতে জমে ওঠে আলোচনা, কৌশল নির্ধারণ এবং সম্পর্ক পুনর্গঠনের নানা পর্ব। ফলে ঈদের পরদিনের এই মেজবান চট্টগ্রামের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
জানা যায়, দুপুরে নগরের মেহেদিবাগের বাড়িতে মেজবানির আয়োজন করেছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ৷ দলীয় নেতাকর্মীদের আগেই দাওয়াত দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন আসনের সংসদ সদস্য, চসিক মেয়র, মহানগর ও জেলা নেতারা এই অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন। এছাড়া আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করতে নগরের ৪১টি ওয়ার্ডসহ আশেপাশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে দলে দলে বিএনপি, যুবদল, ছাত্রদল, কৃষক দল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও মহিলা দলের নেতাকর্মীরা আসবেন। পরে তারা মেজবানির মাংসে আনন্দঘন পরিবেশে মধ্যাহ্নভোজ গ্রহণ করে বাড়ি ফিরবেন।
এদিকে নগরীর কাজীর দেউড়িসংলগ্ন স্মরণিকা ক্লাবে চাটগাঁইয়া মেজবানির আয়োজন করেছেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। এ অনুষ্ঠানেও দলীয় নেতাকর্মী, ব্যবসায়ীসহ সর্বস্তরের মানুষ অংশ নেবেন। বিগত বছরগুলোতেও তিনি মানুষের জন্য এরকম আয়োজন করেছেন।
দুপুর ১১টা থেকে কাজীর দেউড়ির ভিআইপি ব্যাঙ্কুয়িতে মেজবানির আয়োজন করেছেন চট্টগ্রাম-১০ আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয়তাবাদী পাট শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাঈদ আল নোমান। এখানে দলীয় নেতাকর্মী ও চট্টগ্রাম-১০ আসনের জনসাধারণকে বিশেষভাবে দাওয়াত দেওয়া হয়েছে। বেলা বাড়তেই নানা শ্রেণি-পোশার মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে জমে উঠবে ঐতিহাসিক এই আয়োজন।
শুধু মেজবানি নয়, বহু মানুষের মিলনমেলায় ঈদ পুনর্মিলনীতে রূপ নেবে সামাজিক এই আয়োজন৷
অপরদিকে চট্টগ্রাম-৯ আসনের সংসদ সদস্য ও দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক আবু সুফিয়ান নগরীর কেবি কনভেনশনে রোববার দুপুরে মেজবানের আয়োজন করেছেন। এতে চট্টগ্রাম-৯ আসনের জনসাধারণ, দলীয় নেতাকর্মী ও দক্ষিণ জেলার নেতাকর্মীরা অংশ নেবেন। দলের শীর্ষ নেতাদেরকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন আবু সুফিয়ান।
একইভাবে চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক ও চট্টগ্রাম-৮ আসনের সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহ নগরের চান্দগাঁও এলাকায় নিজ বাড়িতে জমকালো মেজবানির আয়োজন করেছেন। চাটগাঁইয়া ঐতিহ্যে মেজবানির গরুর মাংস, চনার ডাল, গরুর নলা, মেজবানি ডালসহ নানা মুখরোচক খাবারে নেতাকর্মীদের আপ্যায়ন করবেন তিনি ৷
এদিকে চট্টগ্রাম-৪ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক আসলাম চৌধুরীও মেজবানির মাংস ও রুটি দিয়ে নেতাকর্মীদের আপ্যায়নের ব্যবস্থা করেছেন ৷ প্রতিবার তিনি এই আয়োজন করে থাকেন ৷
স্বৈরাচারী সরকারের আমলে দীর্ঘ আট বছরের বেশি সময় ধরে শতাধিক মামলায় কারাগারে বন্দি থাকায় আয়োজন করতে পারেননি তিনি। গত বছর থেকে আবারও ধারা অব্যাহত রাখতে শুরু করেন আসলাম চৌধুরী।
দলীয় নেতাকর্মীরা বলছেন, ২০ বছর পর বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছে ৷ দীর্ঘ দুই দশক পর পুরোনো এই রীতি আবারও চালু হওয়া চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক চর্চার পুনর্জাগরণ ৷
ঈদের আনন্দের মধ্যে এ যেন এক মহানন্দ। কেন্দ্রীয় নেতা থেকে মহানগর ও জেলা নেতা, মন্ত্রী ও এমপিদের বাসায় মেজবানি আয়োজন, শুভেচ্ছা বিনিময় ও সালামি গ্রহণ সবমিলিয়ে এক আনন্দঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয় মেজবানিতে। ঈদের দিন একেকজন একেকস্থানে ঈদের জামাত আদায় করায় অনেকের সাথে দেখা হওয়ার সুযোগ থাকে না। চট্টগ্রামের রাজনৈতিক অঙ্গনে সবাইকে এক করার এই "মেজবানী" নামক মিলনমেলা সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির এক অনন্য নজির।
যেভাবে প্রচলন হয়:
চট্টগ্রামের রাজনৈতিক অঙ্গনে মেজবানি আয়োজনের পথিকৃৎ হিসেবে ধরা হয় প্রয়াত আব্দুল্লাহ আল নোমানকে। ১৯৯০ সালে স্বৈরাচার এরশাদ সরকারের পতনের পর পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রামের কোতোয়ালি আসন থেকে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন আব্দুল্লাহ আল নোমান৷ সেবারই পূর্ণ মন্ত্রী হিসেবে ঠাঁই হয় প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন মন্ত্রী পরিষদে।
আব্দুল্লাহ আল নোমান মেজবানির আয়োজন করেন। সেই থেকে তার এই উদ্যোগ ছড়িয়ে পড়ে চট্টগ্রামের রাজনৈতিক অঙ্গনে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তার সন্তান সাঈদ আল নোমান চট্টগ্রাম-১০ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পিতার সেই ধারা অব্যাহত রাখতে এবারও মেজবানীর আয়োজন করেছেন তিনি।
সাঈদ আল নোমান আমার দেশকে বলেন, আমার বাবার ঐতিহ্য ধরে রাখতে ঈদের পরের দিন মেজবানির আয়োজন করেছি ৷ শতশত মানুষ এখানে অংশ নেবেন ৷ নেতাকর্মীদের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দাদের আপ্যায়ন ও একটি ঈদ পুনর্মিলনের উদ্দেশ্যে এই আয়োজন করতেন আমার বাবা।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

