আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

উখিয়ায় কাস্টমস চেকপোস্টের নামে চাঁদাবাজি

উপজেলা প্রতিনিধি, উখিয়া (কক্সবাজার)

উখিয়ায় কাস্টমস চেকপোস্টের নামে চাঁদাবাজি
ছবি: আমার দেশ

কক্সবাজারের উখিয়া–টেকনাফ মহাসড়কে অবস্থিত বালুখালী কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট চেকপোস্টে পণ্যবাহী যানবাহন থেকে নিয়মিত চাঁদাবাজি চালানোর গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। প্রতিদিন শতাধিক গাড়ি থেকে অবৈধভাবে টাকা আদায় করে একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।

অভিযোগ রয়েছে, কাস্টমস চেকপোস্টের সামনে কম্বল দিয়ে আড়াল করে এসব চাঁদা আদায় করা হয়। বাঁশবাহী গাড়ি, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পণ্য সরবরাহকারী যানবাহন, লবণবাহী ট্রাক, দূরপাল্লার ট্রাক, কাঠবাহী গাড়িসহ ছোট-বড় সব ধরনের পণ্যবাহী যানবাহন এই চাঁদাবাজির শিকার হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

প্রাণ, গ্লোব, রিদিশা, আকিজ, আরএফএল, বোম্বাই, ড্যানিশ, স্টারশিপসহ বিভিন্ন নামী কোম্পানি তাদের পণ্য বাজারজাত করতে উপজেলা পর্যায়ে এজেন্ট ও ডিলার নিয়োগ দিয়েছে। এসব ডিলার পণ্য পরিবহনের সময় বালুখালী কাস্টমস চেকপোস্টে নিয়মিত চাঁদাবাজির মুখে পড়ছে। চাঁদা দিতে অস্বীকার করলে চালকদের সঙ্গে তর্কবিতর্ক করে গাড়ি সড়কে আটকে রাখা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ অনুযায়ী, বালুখালী কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট চেকপোস্টের প্রধান কর্মকর্তা মাসুদ আল হেলাল ও সিপাহি শামসুরকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে একটি চাঁদাবাজ সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। প্রতিটি পণ্যবাহী গাড়ি থেকে ২০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়। প্রতিদিন গড়ে ১০০ থেকে ১৫০টি গাড়ি থেকে এভাবে টাকা তোলা হচ্ছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।

সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে আসা একটি কাভার্ড ভ্যান থামিয়ে চালককে নামিয়ে কম্বলের আড়ালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে কিছুক্ষণ অবস্থানের পর চালক আবার গাড়িতে উঠে চলে যান। এরপর একটি মিনি ট্রাক থামিয়ে একইভাবে চাঁদা আদায় করা হয়। প্রতিবেদক ছবি তুলতে গেলে বিষয়টি টের পেয়ে কয়েকজন দিকবিদিক ছুটে সরে পড়ে। প্রতিবেদক স্থান ত্যাগের ভান করলে পুনরায় চাঁদাবাজি শুরু হয়। অভিযোগ রয়েছে, এসব কর্মকাণ্ড আড়াল করতে স্থানীয় কিছু সাংবাদিক নামধারী দালালকে ম্যানেজ করা হয়।

এছাড়া কাস্টমস কর্তৃক উদ্ধারকৃত মালামালের নিলাম কার্যক্রমেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। নিয়ম অনুযায়ী নিলামের আগে মাইকিং, নোটিশ প্রদান, পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ বা নির্দিষ্ট এলাকায় জানানো বাধ্যতামূলক হলেও বাস্তবে এসব নিলাম একটি নির্দিষ্ট সিন্ডিকেটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

কম দামে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নিলাম সম্পন্ন করা হয় এবং নিলামের তথ্য বাইরে যেতে দেওয়া হয় না। মামলা জটিলতায় জব্দকৃত বিভিন্ন গাড়ি খোলা আকাশের নিচে অযত্ন ও অবহেলায় পড়ে থাকতে দেখা গেছে।

অথচ সরকার নির্ধারিত শুল্ক আইন–২০২৩ এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)-এর বিধিমালা অনুযায়ী কাস্টমস চেকপোস্টে নগদ টাকা গ্রহণের কোনো সুযোগ নেই। শুল্ক, ভ্যাট ও অন্যান্য কর নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় ব্যাংকের মাধ্যমে পরিশোধ করার কথা থাকলেও বালুখালী চেকপোস্টে এর সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে।

বিস্কুট ডিলার ব্যবসায়ী আরিফ অভিযোগ করে বলেন, কাস্টমস চেকপোস্টে প্রতিটি পণ্যবাহী গাড়ি থেকে নিয়মিত ১০০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়। নির্ধারিত এই টাকা না দিলে গাড়ি আটকে রাখা হয় এবং নানা হয়রানির শিকার হতে হয়। চেকপোস্ট পার হওয়ার সময় বাধ্য হয়েই এই টাকা দিতে হয়।

এক গাড়িচালক শাহ কামাল বলেন, তিনি প্রতিদিন মামলা নিয়ে গাড়ি চালাতে গিয়ে কাস্টমস চেকপোস্টে ২০০ টাকা করে দিতে বাধ্য হন। একবার এই অনিয়মের প্রতিবাদ করায় কর্তব্যরত কর্মকর্তারা তার গাড়ির মালামালের বিভিন্ন কাগজ খোঁজাখুঁজি করেন এবং দীর্ঘ সময় দাঁড় করিয়ে রেখে ভোগান্তিতে ফেলে পরে টাকা দিয়ে পার হতে হয়৷

এ বিষয়ে বালুখালী কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট চেকপোস্টের প্রধান কর্মকর্তা মাসুদ আল হেলালের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি চাঁদা আদায়ের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আমার চেকপোস্টে কোনো ধরনের টাকা নেওয়া হয় না। আগেই দায়িত্বপ্রাপ্তদের নির্দেশ দেওয়া আছে—কেউ যেন টাকা না নেয়।

গাড়ি থামিয়ে টাকা আদায়ের অভিযোগের বিষয়ে তিনি প্রতিবেদকের কাছে প্রমাণ চাইতে গিয়ে বলেন, “আপনি আসেন, দেখে যান, চা খেয়ে যান।

নিলাম সংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগও অস্বীকার করে তিনি দাবি করেন, নিলামের আগে মাইকিংসহ সব নিয়ম মেনেই দরদাতাদের জানানো হয়। তবে স্থানীয় সূত্র ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ অনুযায়ী, কাগজে-কলমে নিয়ম মানা হলেও বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন