পৌষের শেষ আর মাঘের শুরু এলেই শরীয়তপুরের মনোহর বাজার যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পায়। ভোরের কুয়াশা ভেদ করে মানুষ ছুটে আসে একটি বিশেষ উপলক্ষ্যে—দুই শতাব্দীর ঐতিহ্যবাহী জোড় মাছের মেলায়। সময়ের স্রোত বয়ে গেলেও হারায়নি এই মেলার আবেদন, বরং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে তা হয়ে উঠেছে এলাকার মানুষের আবেগ ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।
সদর উপজেলার মধ্যপাড়া এলাকার কালি মন্দির মাঠে প্রতি বছর মাঘ মাসের প্রথম দিনে বসে এই মেলা। ঐতিহ্য অনুযায়ী, এদিন মেলায় আসা মানুষজন ঘরে ফেরেন জোড়া ইলিশ মাছ ও জোড়া বেগুন নিয়ে। এই ‘জোড়া’ কেনাবেচার মধ্য দিয়েই গড়ে উঠেছে মেলার স্বতন্ত্র পরিচয়—যার নাম জোড় মাছের মেলা।
শুরুর দিকে মেলাটি হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় ও সামাজিক আচারকে কেন্দ্র করে হলেও সময়ের পরিক্রমায় এটি হয়ে উঠেছে হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এখন ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব শ্রেণির মানুষ এই মেলায় অংশ নেন। মেলা উপলক্ষে পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে উৎসবের আমেজ।
স্থানীয়রা জানান, মাঘের এই একটি দিনকে ঘিরে বাড়ি বাড়ি চলে বিশেষ আয়োজন। অতিথি আপ্যায়ন, রান্নাবান্না আর আনন্দঘন আড্ডায় মুখর হয়ে ওঠে পাড়া-মহল্লা।
সরেজমিনে দেখা যায়, ভোর হতেই খোলা মাঠে চৌকি পেতে ইলিশ মাছের পসরা সাজিয়ে বসেন শতাধিক মাছ বিক্রেতা। ডালাভর্তি চকচকে রূপালি ইলিশের পাশে রয়েছে সবজি, খেলনা, মিষ্টি ও নানা খাবারের দোকান। কনকনে শীত উপেক্ষা করে ক্রেতা-বিক্রেতার হাঁকডাকে মুখর হয়ে ওঠে পুরো মেলা প্রাঙ্গণ।
মেলায় শিশুদের উপস্থিতিও চোখে পড়ার মতো। রঙিন বেলুন, বাঁশি, খেলনা আর মিষ্টির দোকানে ভিড় জমায় তারা। বড়দের হাত ধরে আনন্দ মুখে মেলা ঘুরে দেখাই যেন তাদের জন্য আলাদা উৎসব। এবার ইলিশ মাছের দাম কিছুটা চড়া হওয়ায় অনেক ক্রেতা হতাশ হলেও ঐতিহ্যের টানে মেলায় আসা মানুষজন ইলিশ কেনা থেকে বিরত থাকেননি। অনেকেই বলেন, বছরে এই একটি দিনেই জোড়া ইলিশ কেনার নিয়ম, তাই দাম বেশি হলেও কিনতে হয়।
স্থানীয় বাসিন্দা বাবুল সাহা বলেন, ছোটবেলায় বাবার হাত ধরে এই মেলায় আসতাম। এখন আমি আমার সন্তানদের নিয়ে আসি। এই মেলা আমাদের শেকড়ের সঙ্গে জড়িত।
মেলায় আসা সৌম্য দাস জানান, মেলার পরিবেশটাই আলাদা। বাচ্চাদের জন্য খেলনা, খাবার—সব মিলিয়ে উৎসবের অনুভূতি। তবে এবার মাছের দাম একটু বেশি।
বাপ-দাদার আমল থেকে এই মেলায় মাছ বিক্রি করে আসছেন অনেক ব্যবসায়ী। মাত্র তিন ঘণ্টার এই মেলায় বিক্রি হয় কয়েক লাখ থেকে কয়েক কোটি টাকার ইলিশ।
মাছ ব্যবসায়ী গৌতম দাস বলেন, আমার বাবা, তার আগে আমার দাদাও এখানে মাছ বিক্রি করেছেন। ভোর থেকে সকাল ১০টা পর্যন্ত এই মেলায় অন্তত ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকার মাছ বিক্রি হয়। দাম ভালো পাওয়ায় আমরা খুশি।
পুরোনো এই মেলাকে আগামীতেও ধারাবাহিকভাবে আয়োজন করার কথা জানিয়েছেন আয়োজক কমিটি। তাদের মতে, এই মেলা শুধু বেচাকেনার স্থান নয়, এটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতীক।
মেলা আয়োজক কমিটির সদস্য সুজিত দাস বলেন, জোড় মাছের মেলা হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির একটি জীবন্ত উদাহরণ। সবাই মিলেই এই ঐতিহ্য ধরে রাখবো, ভবিষ্যতেও নিয়মিত মেলার আয়োজন করা হবে। দুই শতকের ইতিহাস বহন করা মনোহর বাজারের জোড় মাছের মেলা তাই আজও সময়ের সীমানা পেরিয়ে ঐতিহ্য, সংস্কৃতি আর মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হয়ে আছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

