আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

যেভাবে কাটে রাজশাহীর এতিম পথশিশুদের ঈদের দিন

মঈন উদ্দিন, রাজশাহী

যেভাবে কাটে রাজশাহীর এতিম পথশিশুদের ঈদের দিন

ঈদুল ফিতর মুসলিমদের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব। নতুন পোশাক, সুস্বাদু খাবার আর পরিবার-পরিজনের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করাই এর প্রধান আকর্ষণ। তবে সমাজের সব মুসলিমের ঈদের আনন্দ একরকম নয়। দেশের বিভিন্ন এতিমখানা, সরকারি শিশু সদন, পথশিশু ও দরিদ্র পরিবারের অনেকের কাছে ঈদ মানে সীমিত আয়োজনের মধ্যেও ছোট ছোট আনন্দ খুঁজে নেওয়া।

রাজশাহী নগরীতে রয়েছে সরকারি শিশু সদনসহ বেশ কয়েকটি এতিমখানা। এসব প্রতিষ্ঠানে বেড়ে ওঠা শিশুদের অনেকেরই পরিবার নেই। কারও পরিবার থাকলেও তারা বিভিন্ন কারণে এখানে আশ্রয় নিয়েছে। ঈদ ঘিরে তাদের মধ্যেও থাকে এক ধরনের উৎসাহ-উদ্দীপনা।

বিজ্ঞাপন

নগরীর সরকারি শিশু সদনে থাকা কয়েক শিশুর সঙ্গে কথা হলে তারা জানায়, ঈদের সময় তাদের জন্য নতুন পোশাক, বিশেষ খাবার এবং খেলাধুলার আয়োজন করা হয়। শিশু সদনের এক কিশোর রাফি (ছদ্মনাম) বলল, ঈদের সময় আমাদের নতুন জামা দেওয়া হয়। সেদিন ভালো খাবারও রান্না করা হয়। সবাই মিলে খেলাধুলা করি। তখন খুব ভালো লাগে। তবে কথা বলতে বলতে সে যোগ করে, ঈদের দিন যখন অন্যদের পরিবারের লোকজন আসে, তখন নিজের পরিবারের কথা খুব মনে পড়ে।

শিশু সদনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও শিক্ষক আব্দুল হান্নান বলেন, ঈদের সময় যেন শিশুদের একাকিত্ব না লাগে, সেজন্য এখানে বিশেষ আয়োজন করা হয়। আমরা যারা এখানে কর্মরত, সবাই মিলে শিশুদের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করি। আমার গ্রামের বাড়ি রংপুরে হলেও এখানে শিশুদের সঙ্গেই ঈদ উদযাপন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এছাড়া বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন ও সমাজের বিত্তবানরা এখানে এসে শিশুদের সঙ্গে সময় কাটান, উপহার দেন এবং খাবারের আয়োজন করেন। এতে শিশুদের মধ্যে কিছুটা হলেও ঈদের আনন্দ ছড়িয়ে পড়ে।

অন্যদিকে নগরীর সাহেববাজার, রেলস্টেশন, লক্ষ্মীপুর ও কোর্ট এলাকার ফুটপাতজুড়ে বসবাস করা অনেক পথশিশুর কাছে ঈদের দিনটিও অনেকটা অন্য দিনের মতোই কাটে। কেউ ফুল বিক্রি করে, কেউ পলিথিন বা বোতল কুড়িয়ে জীবিকা নির্বাহ করে। ঈদের সময় নতুন পোশাক পাওয়া তাদের কাছে স্বপ্নের মতো।

সাহেববাজার এলাকায় পরিত্যক্ত বোতল কুড়ানো ১১ বছরের এক পথশিশু জিসানের সঙ্গে কথা হলে সে বলে, ঈদের দিন যদি কেউ নতুন জামা দেয়, তখন খুব ভালো লাগে। মাঝে মাঝে কিছু মানুষ খাবারও দেয়। তখন মনে হয় আমরাও ঈদ করছি।

রেলস্টেশন এলাকায় বসবাস করা আরেক কিশোর জয়নাল জানায়, ঈদের দিন সে বন্ধুদের সঙ্গে ঘোরাঘুরি করে। কখনো কেউ খাবার দিলে খায়। না হলে যেটা পায়, তা দিয়েই তার দিন কেটে যায়।

রাজশাহী শহরের বিভিন্ন বস্তি ও দরিদ্র এলাকায় বসবাস করা পরিবারগুলোর মধ্যেও ঈদের প্রস্তুতি চলে সীমিত সামর্থের মধ্যে। দিনমজুর, রিকশাচালক বা নিম্নআয়ের মানুষদের কাছে ঈদ মানে দীর্ঘদিন ধরে একটু একটু করে টাকা জমিয়ে সন্তানদের জন্য নতুন জামা কেনা।

নগরীর এক বস্তিতে বাস করা গৃহকর্মী নুরুন্নাহার জানান, সারা বছর মানুষের বাসায় কাজ করে সংসার চালাতে হয় তাকে। তবুও ঈদের সময় সন্তানদের মুখে হাসি ফোটাতে চেষ্টা করেন। তিনি বলেন, নিজের জন্য কিছু কিনতে পারি না। কিন্তু বাচ্চাদের জন্য নতুন পোশাক কিনতে পারলে ভালো লাগে।

রাজশাহীর বিভিন্ন সংগঠন ও ব্যক্তি প্রতি বছর এসব সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন। তারা ঈদের আগে এতিমখানা, পথশিশু ও দরিদ্র পরিবারের মাঝে নতুন পোশাক, খাবার ও আর্থিক সহায়তা বিতরণ করেন।

সমাজকর্মী হোসনেয়ারা মনে করেন, ঈদের প্রকৃত শিক্ষা হলো ভাগাভাগি করা এবং অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো। তার মতে, সমাজের বিত্তবানরা যদি একটু এগিয়ে আসেন, তাহলে এসব শিশু ও দরিদ্র পরিবারগুলোর ঈদও হতে পারে আনন্দময়।

ঈদের আনন্দ তখনই পূর্ণতা পায়, যখন সমাজের সব মানুষ সে আনন্দে অংশ নিতে পারে। তাই অনেকেই চেষ্টা করছেন সুবিধাবঞ্চিত মানুষের মুখে একটু হাসি ফোটাতে। আর সে হাসিতেই যেন ঈদের প্রকৃত আনন্দ খুঁজে পাওয়া যায়।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন