দিনাজপুর জেলার নবাবগঞ্জ উপজেলার ভাদুরিয়া ইউনিয়নের পলাশবাড়ী গ্রামের ওবায়দুল ইসলাম আধুনিক যান্ত্রিক যুগেও বংশপরম্পরায় পাওয়া ঐতিহ্যকে আঁকড়ে ধরে আছেন। যখন চারদিকে ট্রাক্টর ও পাওয়ার টিলারের দাপট, তখনও তিনি গরুর হালকে জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বেছে নিয়েছেন। তার সংগ্রহে রয়েছে দুটি বলদ, যাদের দিয়েই তিনি প্রতি মৌসুমে নিজের জমি চাষ করে থাকেন।
স্থানীয়রা বলেন, এলাকার বেশিরভাগ চাষি এখন আধুনিক যন্ত্রে ঝুঁকেছেন। কিন্তু ওবায়দুল ইসলাম এই পরিবর্তনের ভিড়ে থেকেও ঐতিহ্যবাহী কৃষি পদ্ধতিকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। ধানের মৌসুম হোক বা অন্য ফসল, তিনি এখনও গরুর হালেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। তার মতে, মাটির সঙ্গে গরুর হালের যে সম্পর্ক, তা যান্ত্রিক চাষ কখনও পূরণ করতে পারে না।
ওবায়দুল ইসলাম বলেন, গরুর হাল শুধু চাষ করার উপায় না; এটা আমাদের পূর্বপুরুষের রেখে যাওয়া ঐতিহ্য। ছোটবেলা থেকে এটা দেখেই বড় হয়েছি। যতদিন শক্তি থাকবে, ততদিন গরুর হাল দিয়েই চাষ করব। তিনি আরও বলেন, মেশিন দিয়ে চাষে খরচ বেশি, আবার অনেকসময় জমির গুণাগুণও নষ্ট হয়। কিন্তু বলদ দিয়ে চাষে খরচ কম এবং মাটির উর্বরতাও ভালো থাকে।
গ্রামের প্রবীণ ব্যক্তি শহিদুল ইসলাম বলেন, একসময় নবাবগঞ্জের প্রায় প্রতিটি গ্রামে গরুর হাল ছিল। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে এখন এটি প্রায় বিলুপ্তির পথে। পলাশবাড়ীর ওবায়দুল যেন এই হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যের শেষ প্রহরী। তার এই চর্চা নতুন প্রজন্মেরও আগ্রহ তৈরি করেছে।
কাচদহ ফাজিল ডিগ্রি মাদ্রাসার সহকারী অধ্যাপক মিজানুর রহমান বলেন, মানুষ যেভাবে দ্রুত এগিয়ে চলেছে, এতে গ্রামীণ এ ঐতিহ্য ধরে রাখা দুরূহ ব্যাপার। তবুও উপজেলার কিছু কিছু স্থানে আমাদের কৃষকরা এ ঐতিহ্য ধরে রাখার চেষ্টা করছেন।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জাহিদুল ইসলাম ইলিয়াস বলেন, সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নতুন নতুন প্রযুক্তি নিয়ে এগিয়ে চলছে দেশের কৃষি নির্ভর অর্থনীতি। কম পরিশ্রমে, স্বল্প সময়ে অধিক ফসল ফলাতে মানুষ এখন যন্ত্রনির্ভর হয়ে পড়েছে। এ কারণে গরুর হাল দিয়ে জমি চাষ এখন আর তেমন চোখে পড়ে না।
ওবায়দুলের একটাই প্রত্যাশা ভবিষ্যত প্রজন্ম ঐতিহ্যের মূল্য যেন বোঝে। গরুর হাল আমাদের কৃষি সংস্কৃতির শিকড়। এটা বাঁচিয়ে রাখা মানে কৃষির আত্মাকে বাঁচিয়ে রাখা।

