দেশের ব্যাংকগুলো বিনিয়োগের ক্ষেত্রে জামানত হিসেবে এখনো সবচেয়ে বেশি ভরসা করছে স্থাবর সম্পদের ওপর। নতুন ব্যবসা বা তরুণ উদ্যোক্তাদের উদ্ভাবনী ধারণার ওপর ব্যাংকগুলো এখনো ভরসা করতে পারছে না।
ব্যবসা সচল রাখতে কিংবা নতুন বিনিয়োগের জন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে গেলে বড় জামানত হিসেবে এখনো জমি বা ভবনকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। ফলে ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা মোট ঋণের প্রায় ৬৪ শতাংশই দেওয়া হয়েছে জমি ও আবাসন খাতের স্থাবর সম্পত্তি বন্ধকের বিপরীতে। যদিও ব্যাংকের কাছে জামানত হিসেবে থাকা এসব সম্পদের বেশিরভাগই এখন বিক্রি করা যাচ্ছে না। বিশেষ করে প্রভাবশালী ও বড় ঋণখেলাপিদের সম্পদ কেনায় বাজারে কেউ আগ্রহ দেখাচ্ছে না।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যাংকগুলো এখনো ক্যাশ ফ্লো বা ব্যবসার আয়ের চেয়ে সম্পদভিত্তিক অর্থায়নকে সবচেয়ে নিরাপদ মনে করে। ফলে স্থাবর সম্পত্তি নেই, এমন ছোট বা নতুন উদ্যোক্তাদের পক্ষে ব্যাংকঋণ পাওয়া দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিক (জানুয়ারি-মার্চ) শেষে ব্যাংকগুলোর মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৭ লাখ ৮৩ হাজার ৯১৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ৬৩ দশমিক ৭৪ শতাংশ ঋণই বিতরণ করা হয়েছে আবাসন বা রিয়েল এস্টেট (জমি ও ভবন) জামানতের বিপরীতে। অঙ্কের হিসাবে এর পরিমাণ ১১ লাখ ৩৭ হাজার ছয় কোটি টাকা।
পরিসংখ্যান বলছে, ব্যাংকগুলোর এই স্থাবর সম্পত্তির ওপর নির্ভরতা কমার কোনো লক্ষণ নেই; বরং তা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। এর আগের প্রান্তিকে অর্থাৎ ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে জমি ও ভবন জামানত রেখে ঋণ দেওয়ার পরিমাণ ছিল ১১ লাখ ২৯ হাজার ৯৫৬ কোটি টাকা, যা ছিল মোট ঋণের ৬৩ দশমিক ৫৪ শতাংশ। অর্থাৎ তিন মাসের ব্যবধানে এ খাতের জামানতের বিপরীতে ঋণপ্রবাহ আরো শূন্য দশমিক ৬২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের ব্যাংক খাতে অনিয়ম, দুর্নীতি ও ঋণের নামে অর্থ লোপাটের ঘটনা বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সংগতি রেখেই জমি বন্ধক রেখে ঋণ বিতরণ বেড়েছে। কারণ, জমি বন্ধক রেখে ব্যাংক থেকে ঋণ বের করা অপেক্ষাকৃত সহজ। আবার গত দেড় দশকে সরকারি খাসজমি ও বিতর্কিত মালিকানার জমি বন্ধক রেখেও ব্যাংকগুলো থেকে ঋণ বের করে নেওয়া হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের একটি অংশ ডাইভার্ট (খাত পরিবর্তন) করে প্রভাবশালীরা আবার জমি কিনেছেন। পরে ওই জমিও বন্ধক রেখে ব্যাংক থেকে আরো ঋণ বের করা হয়েছে। এক্ষেত্রে দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যাংক কর্মকর্তারা সহযোগীর ভূমিকা পালন করেছেন। বেশিরভাগ পক্ষেই প্রভাবশালীদের বন্ধকী জমির দাম বাজারদরের চেয়ে কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে। এ কারণে জামানতের সম্পদ বিক্রি করে এখন খেলাপি ঋণ আদায় করা সম্ভব হচ্ছে না। আবার জমির দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় সরকারের নির্ধারিত মৌজা দরের সঙ্গে প্রকৃত বাজারদরের ব্যবধানও অনেক বেড়ে গেছে।
জমি ও ভবনের তুলনায় ব্যাংকিং খাতে অন্যান্য সিকিউরিটি বা জামানত রেখে ঋণ নেওয়ার হার অত্যন্ত নগণ্য। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দ্বিতীয় সর্বোচ্চ জামানত হিসেবে ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানের গ্যারান্টি রেখে ঋণ দেওয়া হয়েছে ১৬ দশমিক ৩৭ শতাংশ বা দুই লাখ ৯২ হাজার ৩৯ কোটি টাকা। ব্যাংকে রক্ষিত মেয়াদি আমানত বা এফডিআর জামানত রেখে ঋণ নেওয়ার হার মাত্র ৬ দশমিক ৭৫ শতাংশ। এছাড়া কোনো ধরনের স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তি ছাড়া কেবল ব্যক্তিগত গ্যারান্টির বিপরীতে ঋণ দেওয়া হয়েছে মাত্র ৬ শতাংশ।
নতুন ও তরুণ উদ্যোক্তাদের মতে, ব্যাংকিং খাতের এ স্থাবর সম্পত্তিনির্ভর প্রবণতা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যকরণের ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা। যেসব উদীয়মান খাত বা তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক স্টার্টআপের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে কিন্তু ব্যাংকে বন্ধক রাখার মতো জমি বা ভবন নেই, তারা কোনোভাবেই ব্যাংকের চৌকাঠ পেরোতে পারছে না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি বেসরকারি ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, খেলাপি ঋণের ক্রমবর্ধমান হারের কারণে ব্যাংকগুলো এখন ঋণ বিতরণে অতিরিক্ত সতর্ক। কোনো কারণে ঋণ মন্দ বা খেলাপি হয়ে গেলে যেন অন্তত জমি বা ভবন বিক্রি করে টাকা তুলে আনা যায়, এমন মানসিকতা থেকেই ব্যাংকগুলো জমি-ভবন ছাড়া ঋণ দিতে অনীহা প্রকাশ করে। যদিও এখন জমি বিক্রি করে ঋণের টাকা ফেরত আনাও কষ্ট হচ্ছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে শুধু জমির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ব্যবসার লাভজনকতা ও আর্থিক লেনদেনের স্বচ্ছতা দেখে ঋণ দেওয়ার সংস্কৃতি চালু করা প্রয়োজন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

