জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বিলুপ্ত করে রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব বাস্তবায়ন নামে পৃথক দুটি বিভাগ গঠনে সরকারের উদ্যোগে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিভাগ গঠন কার্যকরে তারিখ নির্ধারণ করে গেজেট/প্রজ্ঞাপন না হওয়ায় এটির বাস্তবায়ন নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্টরা।
গত ২০ জানুয়ারি প্রধান উপদেষ্টার সভাপতিত্বে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস-সংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির (নিকার) বৈঠকে এনবিআর বিলুপ্ত করে দুটি বিভাগ গঠনের বিষয়টি অনুমোদন পায়। এরপর সচিব কমিটির বৈঠকে নতুন দুটি বিভাগ গঠনে রুলস অব বিজনেস ও অ্যালোকেশন অব বিজনেস অনুমোদন হওয়ার কথা থাকলেও সেটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে না। নিকার সভার পরের সপ্তাহে সচিব কমিটির বৈঠক হওয়ার কথা থাকলেও দুদফা সেটি বাতিল হয়। গত সপ্তাহে সচিব কমিটির বৈঠক হলেও এনবিআরের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়নি। দেশে এখন নির্বাচনি আমেজ বিরাজ করছে। প্রশাসনও একটি নতুন সরকারের অপেক্ষায় রয়েছে। এ মুহূর্তে এনবিআর বিলুপ্ত করে দুটি পৃথক বিভাগ গঠনের মতো একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে প্রশাসনের মধ্যে এক ধরনের অনীহা তৈরি হয়েছে বলে এনবিআর কর্মকর্তারা জানান।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আমার দেশকে বলেন, প্রশাসনের কাছ থেকে যে ধরনের সহযোগিতা পাওয়া দরকার ছিল, সেটা পাওয়া যায়নি। নানা অজুহাত দেখিয়ে তারা পুরো প্রক্রিয়াকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। এখন প্রধান উপদেষ্টা যদি উদ্যোগ নেন, তাহলে ভূতাপেক্ষ অনুমোদনের মাধ্যমে বাস্তবায়নের একটা উদ্যোগ নিতে পারেন। কিন্তু এটি করা গেলেও পরবর্তী সময়ে এ নিয়ে নতুন সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে সব মিলিয়ে এ সরকারের আমলে এনবিআর বিলুপ্তির মাধ্যমে পৃথক দুটি বিভাগ গঠনের বিষয় বাস্তবায়ন হচ্ছে না বলেই মনে হয়।
পৃথক বিভাগ বাস্তবায়ন না হওয়ায় এক ধরনের হতাশা নিয়ে ওই কর্মকর্তা বলেন, প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে বাস্তবায়নের খুব কাছাকাছি অবস্থায় এসেছিলাম, কিন্তু না হওয়াটা খুবই দুঃখজনক।
অবশ্য অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেই দুটি বিভাগ গঠনের বিষয় বাস্তবায়িত হবে বলে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ এবং এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান বিভিন্ন সময় বক্তব্য দেন। গত ৬ জানুয়ারি সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন বলেছিলেন, জানুয়ারি কিংবা ১২ ফেব্রুয়ারির মধ্যে এনবিআর ভেঙে দুটি বিভাগ গঠনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। ছোট একটি কাজ বাকি রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেই এটি বাস্তবায়ন হবে। অর্থ উপদেষ্টার সে ‘ছোট একটি কাজ’ শেষ হচ্ছে না বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নির্বাচনের আগে বিভাগ বাস্তবায়নের বিষয়ে এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খানের কাছে জানতে চাইলে তিনি আমার দেশকে বলেন, এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাই না। তার এ বক্তব্যের মধ্যে এক ধরনের হতাশা উঠে এসেছে বলে মনে হয়েছে।
বিভাগ গঠনে অধ্যাদেশ জারির পর এনবিআর চেয়ারম্যানকে বড় ধরনের বিরূপ পরিস্থিতির মুখে পড়তে হয়েছিল। তাকে রাজস্ব ভবনে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়েছিল। চেয়ারম্যান পদ থেকে অপসারণের দাবিতে কর্মবিরতি, কলমবিরতি, অবস্থান ধর্মঘট, সেবা কার্যক্রম বন্ধ, মার্চ টু এনবিআর কর্মসূচি পালন করেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। ‘এনবিআর সংস্কার ঐক্য পরিষদের’ ব্যানারে এসব কর্মসূচির কারণে এক ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হয়। আন্দোলনকে কেন্দ্র করে এনবিআরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে তৈরি হয় বিভেদ. অবিশ্বাস, আস্থার সংকট। আন্দোলনের কারণে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে রাজস্ব ভবনে সেনা, র্যাব ও পুলিশ মোতায়েন করা হয়। আন্দোলনে ‘মদত দেওয়ার’ অভিযোগে বাধ্যতামূলতক অবসরে পাঠানো হয় সদস্যসহ কয়েকজন কর্মকর্তাকে। বদলি করা হয় বিভিন্ন কর্মকর্তাকে। সরকারের পক্ষ থেকে আন্দোলনকারীদের কাজে যোগদানের জন্য আহ্বান জানানো হলেও তারা অনড় থেকে আন্দোলন চালিয়ে যান। বাজেট প্রণয়ন কার্যক্রম চলাকালে এনবিআর কর্মকর্তাদের আন্দোলন নিয়ে বড় ধরনের সমালোচনা তৈরি হয়। ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ তাদের আর্থিক ক্ষতির বিষয় তুলে ধরেন। পরবর্তী সময়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পক্ষ থেকে এনবিআর কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছেÑএমন ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের ২৯ জুন রাতে আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেয় এনবিআর সংস্কার ঐক্য পরিষদ। এরপর আন্দোলনে সম্পৃক্ত থাকায় এবং আচরণবিধি লঙ্ঘনের কারণে অনেক কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুতি কিংবা বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর ঘটনা ঘটে। এদের অনেকের বিরুদ্ধে দুদকের তদন্ত অনুসন্ধান শুরু হয়। এনবিআর বিলুপ্ত করে বিভাগ গঠনে অধ্যাদেশ জারি নিয়ে এত ঘটনা ঘটলেও শেষ পর্যন্ত এটির বাস্তবায়ন নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
এনবিআর বিলুপ্ত করে রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব বাস্তবায়ন নামে দুটি বিভাগ গঠনে গত বছরের ১২ মে অধ্যাদেশ জারি করে সরকার। তবে এ অধ্যাদেশ কবে থেকে কার্যকর হবে সে তারিখ নির্ধারণ করে গেজেট প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে বলে ওই অধ্যাদেশে বলা হয়েছে।
এদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে না হওয়ায় নতুন সরকার এটি বাস্তবায়ন করবে কি নাÑএ নিয়ে এনবিআর কর্মকর্তাদের মধ্যে সংশয় রয়েছে। তারা বলছেন, পরবর্তী সরকারের ভিন্ন পলিসি থাকতে পারে। তারা তাদের পলিসি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেবে। তারা চাইলে এটি বাস্তবায়ন না-ও করতে পারে। তবে কেউ কেউ মনে করছেন, এনবিআর সংস্কার ও বিভাগ গঠনে দাতা সংস্থাগুলোর এক ধরনের চাপ রয়েছে। বিশেষ করে আইএমএফের ঋণের কিস্তি ছাড়ের বিষয়টিও এর সঙ্গে জড়িত থাকায় শেষ পর্যন্ত নতুন সরকার এটি বাস্তবায়ন করতে পারে। অবশ্য অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ীসহ অংশীজনরা রাজস্ব কাঠামো সংস্কারে দুটি পৃথক বিভাগ গঠনের পক্ষে মতামত দিয়েছেন।
এর আগে এক-এগারোর সরকারের আমলেও এনবিআরের রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা পৃথকীকরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ওই সময়ও একটি অধ্যাদেশ জারি হয়েছিল। কিন্তু তখনো সেটি কার্যকর করা যায়নি।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

