দেশের ভেতরে বিনিয়োগ পরিস্থিতি স্থবির থাকলেও বিদেশে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশিরা বিদেশে মোট এক কোটি ৫৮ লাখ মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করেছেন, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৮২৯ শতাংশ বেশি। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ে বিদেশে বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল মাত্র ১৭ লাখ ডলার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন নিয়ে যেসব পুঁজি বিদেশে বিনিয়োগ করা হয়েছে, তার ভিত্তিতেই এ হিসাব করা হয়েছে। অর্থাৎ এটি বিদেশে নেওয়া বৈধ পুঁজির পরিসংখ্যান। এর বাইরে অবৈধভাবে বা অর্থ পাচারের মাধ্যমে বিদেশে বিনিয়োগ করা অর্থের কোনো হিসাব এতে অন্তর্ভুক্ত নয়।
প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত অর্থবছরের অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিক থেকে বাংলাদেশিদের বিদেশে বিনিয়োগ বাড়তে শুরু করে। ওই তিন মাসে বিদেশে বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল এক কোটি ৮৪ লাখ ডলার। এর পরের তিন মাসে বিনিয়োগ হয় ৭৩ লাখ ডলার। গত অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়ায় ৮৬ লাখ ডলারে। তবে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে বিদেশে বিনিয়োগ ছিল এক কোটি ৫৯ লাখ ডলার ঋণাত্মক। এর পরের তিন মাসে বিনিয়োগ হয় ২৯ লাখ ডলার।
অন্যদিকে, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদহারের কারণে দেশে বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা বিরাজ করছে। এর প্রভাব পড়েছে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধিতে। গত বছরের নভেম্বর শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি দাঁড়ায় ৬ দশমিক ৫৮ শতাংশ। অক্টোবরে এ হার ছিল ৬ দশমিক ২৩ শতাংশ এবং সেপ্টেম্বরে ছিল ৬ দশমিক ২৯ শতাংশ। সর্বশেষ বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি দুই অঙ্কে পৌঁছেছিল ২০২৪ সালের জুলাইয়ে, ১০ দশমিক ১৩ শতাংশ। এরপর আগস্ট থেকেই ধারাবাহিকভাবে প্রবৃদ্ধি কমতে শুরু করে।
খাতসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দেশের এ টালমাটাল অবস্থায় উদ্যোক্তাদের বিদেশে নয়, দেশে বিনিয়োগ বাড়ানো উচিত। কারণ দেশে বেকারত্বের হার বাড়ছে, কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান পাচ্ছে না এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধি নিম্নমুখী। এ অবস্থায় বিদেশে পুঁজি বিনিয়োগ না করে দেশে বিনিয়োগ করলে অর্থনীতি যেমন লাভবান হবে, তেমনি কর্মসংস্থান ও জিডিপি বাড়বে এবং বেকারত্ব কমবে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর শেষে বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের বিদেশে বিনিয়োগ করা পুঁজির স্থিতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৬ কোটি ২১ লাখ ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ স্থিতি ছিল ৩৪ কোটি ৮৩ লাখ ডলার। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বিদেশে বিনিয়োগ করা পুঁজির স্থিতি ছিল ৩৩ কোটি ৭৩ লাখ ডলার, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সামান্য বেড়ে ৩৫ কোটি ২৯ লাখ ডলারে দাঁড়ায়।
দেশভিত্তিক বিনিয়োগের হিসাবে সবচেয়ে বেশি পুঁজি গেছে ভারতে, যার পরিমাণ ১০ কোটি ৫৩ লাখ ডলার। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বিনিয়োগ হয়েছে যুক্তরাজ্যে ১০ কোটি ২১ লাখ ডলার। তৃতীয় স্থানে রয়েছে হংকং, যেখানে বিনিয়োগের পরিমাণ সাত কোটি ৯৮ লাখ ডলার। এছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাতে ছয় কোটি ১৩ লাখ ডলার, মালয়েশিয়ায় এক কোটি ২০ লাখ ডলার, কেনিয়ায় ৭৬ লাখ ডলার, সিঙ্গাপুরে ৬৪ লাখ ডলার, আয়ারল্যান্ডে ৫৫ লাখ ডলার, ওমানে ৩৭ লাখ ডলার এবং ইথিওপিয়ায় ১৭ লাখ ডলার বিনিয়োগ করা হয়েছে।
খাতভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি পুঁজি বিনিয়োগ করা হয়েছে বিদেশে আর্থিক প্রতিষ্ঠান স্থাপনে। ফাইন্যান্স কোম্পানিতে বিনিয়োগের পরিমাণ ৩১ কোটি ৪১ লাখ ডলার। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বিনিয়োগ হয়েছে খনিজ খাতে, যার পরিমাণ পাঁচ কোটি ৪১ লাখ ডলার। তৃতীয় স্থানে রয়েছে অন্যান্য উৎপাদন শিল্প, যেখানে বিনিয়োগ করা হয়েছে ৪৮ লাখ ডলার।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

