বীমা খুলে প্রাপ্য টাকা না পেয়ে চরম হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন ‘বায়রা লাইফ ইনস্যুরেন্স’-এর অসংখ্য গ্রাহক। পলিসির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও বছরের পর বছর কোম্পানির দ্বারে দ্বারে ঘুরেও গ্রাহকরা পাচ্ছেন না তাদের জমাকৃত অর্থ বা মূল পুঁজি। ফলে এখন বীমার নাম শুনলেই আঁতকে উঠছেন ভুক্তভোগীরা। বায়রার মতো আর ছয়টি প্রতিষ্ঠানের অবস্থাও নাজুক। সবাই বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) লাল তালিকাভুক্ত। এই সাতটি প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে প্রায় ৬৫ লাখ পলিসি পেন্ডিং রয়েছে এবং মোট দাবির পরিমাণ প্রায় ৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকা।
কুমিল্লার সদর দক্ষিণের বাসিন্দা নুরজাহান বেগম। ১০ বছর মেয়াদি একটি পলিসি খুলেছিলেন তিনি, যা ২০১৯ সালের ২৮ অক্টোবর ম্যাচিউর বা মেয়াদোত্তীর্ণ হয়। জমার বিপরীতে তার পাওয়ার কথা এক লাখ টাকা। পেশায় গৃহিণী নুরজাহান বেগম কয়েক বছর জুতার তলা ক্ষয় করে অবশেষে বায়রা অফিসে আসা বন্ধ করে দিয়েছেন। এখন ঢাকায় কর্মরত বুলবুল নামে এক আত্মীয় তার হয়ে খোঁজখবর নিচ্ছেন যে, জীবিতাবস্থায় নুরজাহান তার নিরাপদ পলিসির টাকাটা আদৌ ফেরত পাবেন কি না।
গত বুধবার বায়রা অফিসে বুলবুলের সঙ্গে কথা হয়। আক্ষেপ করে তিনি আমার দেশকে বলেন, ২০২২ সালের পর আজ দ্বিতীয়বার এলাম। কিন্তু বায়রা কর্তৃপক্ষ সেই পুরোনো গল্পই শোনাল ‘টাকা নেই’। জমি বিক্রি করে গ্রাহকদের টাকা পরিশোধের চেষ্টা চলছে বলে তারা দাবি করছে।
অনুরূপ পরিস্থিতি নোয়াখালীর বাসিন্দা নুরুন্নবীরও। প্রবাসের উপার্জিত টাকা দিয়ে বায়রা লাইফে একটি নয়, দুটি বীমা পলিসি খুলেছিলেন তিনি। গত বুধবার বায়রা অফিসেই তার সঙ্গে কথা হয়। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে আমার দেশকে বলেন, টাকার পেছনে ঘুরতে ঘুরতে দুই জোড়া জুতা ক্ষয় করেছি। কিন্তু বায়রা লাইফ ইনস্যুরেন্স আজও টাকা ফেরত দিল না। তার সঙ্গে এসেছিলেন আলমগীর নামে আরেক ভুক্তভোগী। ১ লাখ ৪ হাজার টাকার চেকলিস্ট (নম্বর-২৫৩) হাতে নিয়ে তিনি বলেন, সাত বছর ধরে এখানে আসছি। বায়রা কর্তৃপক্ষের আশ্বাসের ফাঁদে আমরা শেষ! আর পেরে উঠতে পারছি না।
এদিকে, রাজধানী ফকিরাপুলের একটি থাই অ্যালুমিনিয়ামের দোকানে চাকরি করেন বেলাল। তার গ্রামের বাড়ি লক্ষ্মীপুর। গত ৮ জুলাই চার লাইনের একটি ঠিকানা হাতে নিয়ে বায়রা অফিসের সন্ধান করতে আসেন তিনি। বেলাল জানান, তার ১০ বছর মেয়াদি বীমার মেয়াদ শেষ হয়েছে আরো বছর খানিক আগে। প্রথমদিকে গ্রাহক নিজে এসে ঘুরে ঘুরে এখন আসার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন।
বেলাল বলেন, আমি অফিসটি খুঁজে বের করতে এসেছি। এখান থেকে ফিরে পলিসিদাতাকে জানালে হয়তো তিনি তার প্রাপ্য টাকা তুলতে আসবেন।
আর আঞ্চলিক একটি পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক জিএম নুর ইসলাম। গত পাঁচ বছর ঘুরেও নিজের পলিসির টাকা উঠাতে পারেননি। একই অবস্থা আদম সফিউল্লাহ এবং জিএম ওমার ফারুকের। শুধু নুরজাহান, নুরুন্নবী বা আলমগীরই নন; রাণু, সেলিনা ও আয়েশাসহ শত শত গ্রাহকের একই করুণ দশা।
বায়রা লাইফ ইনস্যুরেন্সের সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিরা স্বীকার করেছেন যে, গ্রাহকদের ম্যাচিউরিটি বা মেয়াদপূর্তির অর্থ এককালীন পরিশোধ করার মতো আর্থিক সক্ষমতা বর্তমানে এই প্রতিষ্ঠানের নেই। তাদের ভাষ্যমতে, ২০১০ সাল থেকেই বিভিন্ন পলিসির মেয়াদপূর্তি শুরু হলেও, তখন থেকেই গ্রাহকদের টাকা পরিশোধ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘদিন অর্থ ফেরত না পেয়ে সংক্ষুব্ধ গ্রাহকরা ২০১৯ সালে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ জানান। পরবর্তী সময়ে সরকারি সিদ্ধান্তেই কোম্পানিটির কার্যক্রম বন্ধ (ডিজলভ) করে দেওয়া হয়।
বকেয়া পরিশোধের বিষয়ে সংশ্লিষ্টরা জানান, অতীতে একটি সমঝোতা প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী, গ্রাহকদের প্রাপ্য অর্থের একটি অংশ সাময়িকভাবে রিজার্ভ বা সংরক্ষণ করে রেখে বাকি টাকা পরিশোধের কথা ছিল। তবে বর্তমান মালিকপক্ষ দায়িত্ব গ্রহণের পর সেই উদ্যোগ আর আলোর মুখ দেখেনি।
বীমার সুবিধা প্রসঙ্গে কর্মকর্তাদের দাবি, জীবন বীমার মূল উদ্দেশ্য হলো ঝুঁকি সুরক্ষা (রিস্ক কভারেজ) নিশ্চিত করা। অর্থাৎ বীমাগ্রহীতার মৃত্যু হলে মনোনীত ব্যক্তি (নমিনি) সুবিধা পাবেন। আর মেয়াদপূর্তি পর্যন্ত গ্রাহক জীবিত থাকলে কত টাকা পাবেন, তা তৎকালীন নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনা ও নীতিমালার ওপর নির্ভর করে। তাদের দাবি, এক লাখ টাকার একটি পলিসির বিপরীতে গ্রাহকের প্রায় এক লাখ ৪৫ হাজার টাকা পাওয়ার কথা ছিল।
গ্রাহকদের বকেয়া পরিশোধের সম্ভাবনা নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, রাজধানীর চৌধুরীপাড়া এলাকায় কোম্পানির সাড়ে ৯ কাঠা একটি জমি রয়েছে। বর্তমানে মেট্রোরেল প্রকল্পের কারণে ওই জমিটি সরকারের অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে।
তাদের দাবি, জমি অধিগ্রহণের সাতটি ধাপ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে এবং বর্তমানে অষ্টম ধাপের অনুমোদনের অপেক্ষা চলছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থ মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলোর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। জমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণের টাকা কোম্পানির হাতে এলেই গ্রাহকদের পাওনা পরিশোধের প্রক্রিয়া পুরোদমে শুরু করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
গ্রাহকদের সঙ্গে কোম্পানির কর্মকর্তাদের কথোপকথনের একটি অডিওতেও আংশিক অর্থ পরিশোধের বিষয়টি উঠে এসেছে। সেখানে এক কর্মকর্তাকে বলতে শোনা যায়, বর্তমানে পুরো টাকা একসঙ্গে দেওয়ার সামর্থ্য কোম্পানির নেই। তাই আপাতত আংশিক অর্থ দেওয়া হচ্ছে।
তীব্র আর্থিক সংকট ও গ্রাহকের টাকা সময়মতো ফেরত দিতে না পারায় চরম অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে বায়রা লাইফ ইনস্যুরেন্স। প্রতিষ্ঠানটির জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) মোবারক হোসেন আমার দেশকে বলেন, এক সময় বায়রা লাইফে দুই হাজার ৭০০ কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং ৭০ থেকে ৮০টি গাড়ি ছিল। সেই জৌলুস হারিয়ে কর্মী সংখ্যা এখন মাত্র ১০-১২ জনে ঠেকেছে। বর্তমানে নতুন কোনো ব্যবসা বা প্রিমিয়াম কালেকশন নেই। বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা রাখা পরিশোধিত মূলধনের (পেড আপ ক্যাপিটাল) সুদ থেকে মাসে যে ১৫-২২ লাখ টাকা আসে, তা দিয়েই কোনোমতে অফিসের খরচ চালানো হচ্ছে। বর্তমান মালিক পক্ষ নতুন পলিসি করা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছে।
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, গ্রাহকদের টাকা দিতে না পারাকে এখন বড় অপরাধ হিসেবে আমরা দেখছি। কারণ প্রতিদিন গড়ে ১০০ জন গ্রাহক লভ্যাংশের টাকার জন্য অফিসে আসেন। কিন্তু আমরা তাদের টাকা দিতে পারছি না।
বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) জানিয়েছে, ঝুঁকিপূর্ণ বীমা কোম্পানিগুলোর তালিকায় সবার ওপরে রয়েছে বায়রা লাইফ ইনস্যুরেন্স।
আইডিআরএর সদস্য (লাইফ) আপেল মাহমুদ আমার দেশকে বলেন, ব্যর্থতার কারণে বায়রা লাইফসহ মোট সাতটি কোম্পানিকে লাল তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। তালিকার অন্য কোম্পানিগুলো হলো— ফারইস্ট ইসলামী লাইফ, গোল্ডেন লাইফ, হোমল্যান্ড লাইফ, পদ্মা ইসলামী লাইফ, প্রোগ্রেসিভ লাইফ এবং সানফ্লাওয়ার লাইফ। এই সাতটি প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে প্রায় ৬৫ লাখ পলিসি পেন্ডিং রয়েছে এবং মোট দাবির পরিমাণ প্রায় চার হাজার ৬০০ কোটি টাকা।
আইডিআরএ এই সমস্যাগ্রস্ত কোম্পানিগুলোকে বীমা শিল্পের ‘ক্যানসার’ হিসেবে অভিহিত করেছে। কর্তৃপক্ষ জানায়, এই সংকট দূর করতে প্রয়োজনে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অথবা ‘কেমোথেরাপি’র মতো চিকিৎসার মাধ্যমে অর্থাৎ কোম্পানিগুলোর সম্পদ কাজে লাগিয়ে তাদের পুনর্গঠনের চেষ্টা করা হবে।
জানা গেছে, সম্প্রতি আইডিআরএ-তে নতুন চেয়ারম্যান যোগদানের পর এই কোম্পানিগুলোকে ডেকে সর্বশেষ আর্থিক অবস্থা ও সংকট উত্তরণের পরিকল্পনা জানতে চাওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে গ্রাহকদের টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা (টাইম বাউন্ড) বেঁধে দেওয়া হচ্ছে। বীমা খাতের এই অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলা দূর করতে একটি অডিট ফার্মকেও এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ।
তবে বায়রা লাইফের গ্রাহকদের জন্য কিছুটা আশার আলো রয়েছে বলে জানা গেছে। এ প্রসঙ্গে আপেল মাহমুদ জানান, মালিবাগে মেট্রোরেল প্রকল্পের ভেতরে বায়রা লাইফের একটি জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে, যা থেকে প্রায় ৫৪ কোটি টাকা পাওয়া যাবে। এই টাকা শুধু গ্রাহকদের দাবি মেটাতে একটি বিশেষ অ্যাকাউন্টে রাখা হবে। তবে গ্রাহকদের মোট বকেয়া ৫৮ থেকে ৬০ কোটি টাকা হওয়ায় এই টাকা পাওয়ার পরও ৮ থেকে ১০ কোটি টাকার ঘাটতি থেকে যাবে। নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ হিসেবে এই বিপুল পরিমাণ পলিসির টাকা ও দাবি-আপত্তি নিষ্পত্তিতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালানো হচ্ছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


