পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে তৈরি পোশাকশিল্পে তীব্র নগদ সংকট তৈরি হয়েছে। শ্রমিকদের বেতন-ভাতা ও উৎসব বোনাস সময়মতো পরিশোধ নিশ্চিত করতে সহজ শর্তে ১৪ হাজার কোটি টাকার ঋণ সহায়তা চেয়েছে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)।
গতকাল মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এ সহায়তা চাওয়া হয়। এ সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ও বিজিএমইএর নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠক শেষে বিজিএমইএর ভাইস প্রেসিডেন্ট শিহাব উদ্দুজা চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, আমাদের এক মাসের বেতন-ভাতা বাবদ সাড়ে ছয় থেকে সাত হাজার কোটি টাকা লাগে। সেখানে দুই মাসে ১৪ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন। তাই সহজ শর্তে ঋণের মাধ্যমে এ সহায়তা দেওয়ার জন্য গভর্নরকে জানিয়েছি। গভর্নর এ বিষয়ে আমাদের আশ্বাস দিয়েছেন। তিনি প্রতিটি বিষয় ইতিবাচকভাবে নিয়েছেন। পাশাপাশি পোশাক খাতের রপ্তানি প্রণোদনার যে অর্থ আটকে আছে, তা ছাড় করার জন্য আবেদন করেছি।
প্রতি ঈদের আগে সুবিধা চাওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, ’২৪-এর আন্দোলন, শ্রমিক অসন্তোষ, নির্বাচন এবং ট্রাম্পের ট্যারিফ ইস্যু—সব মিলিয়ে গার্মেন্ট খাত একটি সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সাত মাস ধরে রপ্তানি ঋণাত্মক প্রবণতায় রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে শিল্প টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। নগদ সংকট কাটাতে দ্রুত প্রণোদনার অর্থ ছাড় ও সফট লোন সুবিধা না পেলে কারখানাগুলোর উৎপাদন ও শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধে জটিলতা তৈরি হতে পারে।
গভর্নরকে দেওয়া চিঠিতে বিজিএমইএ জানিয়েছে, বর্তমানে অনেক প্রতিষ্ঠানের আবেদন লিয়েন ব্যাংকে জমা রয়েছে, অনেকের ফাইল বাংলাদেশ ব্যাংকে অডিট কার্যক্রমের জন্য প্রক্রিয়াধীন এবং কিছু ফাইল সব প্রক্রিয়া শেষে অর্থ ছাড়ের অপেক্ষায় আছে। এসব তহবিল দ্রুত ছাড় হলে কারখানাগুলো তাদের ক্যাশ ফ্লো ব্যবস্থাপনায় সাময়িক স্বস্তি পাবে এবং নিয়মিত মজুরি ও পরিচালন ব্যয় পরিশোধ করতে সক্ষম হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ পর্যন্ত মোট আড়াই হাজার কোটি টাকা প্রণোদনা ছাড় করা হয়েছে। তবে বস্ত্র ও পোশাক খাতে এখনো প্রায় পাঁচ হাজার ৭০০ কোটি টাকার প্রণোদনা আটকে রয়েছে। আটকে থাকা অর্থ দ্রুত ছাড়ের দাবি জানানো হয়েছে।
চিঠিতে আরো বলা হয়েছে, প্রতি মাসে মজুরি বাবদ প্রায় সাত হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হয়। সে হিসাবে ঈদের আগে দুই মাসের বেতনের সমপরিমাণ অর্থ সহজ শর্তে ঋণ হিসেবে প্রদান জরুরি। প্রস্তাব অনুযায়ী, এ ঋণ তিন মাস গ্রেস পিরিয়ডসহ ১২ মাসে পরিশোধের সুযোগ দিতে হবে।
এছাড়া প্রচলিত ঋণসীমার বাইরে বিশেষ বিবেচনায় সফট লোন সুবিধা চালু, প্যাকিং ক্রেডিট পুনরায় কার্যকর এবং সুদের হার সাত শতাংশে নামিয়ে আনার দাবি জানানো হয়েছে। প্রি-শিপমেন্ট ক্রেডিট খাতে পুনঃঅর্থায়ন স্কিমের আকার পাঁচ হাজার কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ১০ হাজার কোটি টাকা করা এবং তহবিলের মেয়াদ ২০৩০ সাল পর্যন্ত বৃদ্ধির প্রস্তাবও করা হয়েছে। পাশাপাশি বিজিএমইএ কর্তৃক প্রেরিত তালিকা অনুযায়ী এসএমই শিল্পপ্রতিষ্ঠানের অনুকূলে নগদ সহায়তার অর্থ ছাড়ের দাবি জানানো হয়।
বিজিএমইএ নেতারা মনে করছেন, শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও বোনাস সময়মতো পরিশোধ না হলে দেশে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। জাতীয় অর্থনীতির চাকা সচল রাখা এবং লাখ লাখ শ্রমিকের জীবন-জীবিকা সুরক্ষায় সরকারের সময়োপযোগী ও সহানুভূতিশীল পদক্ষেপ এ মুহূর্তে অত্যন্ত জরুরি। সংকট উত্তরণে দ্রুত সিদ্ধান্ত শিল্প, শ্রমিক ও সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য বড় সহায়তা হিসেবে কাজ করবে বলেও জানান তারা।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

