দেশের ব্যাংক খাত এখন উচ্চ খেলাপি ঋণের চাপে জর্জরিত। কিছু ব্যাংকে খেলাপি ঋণের হার ৮০ শতাংশেরও বেশি। এত উচ্চহারে খেলাপি ঋণ থাকা সত্ত্বেও এসব ব্যাংক কীভাবে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে এবং কেন সেগুলোকে অবসায়ন বা বন্ধের প্রক্রিয়ায় নেওয়া হচ্ছে নাÑএ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)।
গতকাল রোববার বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠকে এসব প্রশ্ন তোলে আইএমএফের প্রতিনিধিদল। নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা শুরু করতে পাঁচ দিনের সফরে বাংলাদেশে এসেছেন সংস্থাটির প্রতিনিধিরা। সফরের প্রথম দিন সকালে গভর্নর ও তার টিমের সঙ্গে উদ্বোধনী বৈঠকের মাধ্যমে কর্মসূচি শুরু হয়। পরে অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন বিভাগের সঙ্গে পৃথক বৈঠক হয় তাদের। আইএমএফের বাংলাদেশ মিশনপ্রধান ইভো ক্রজনারের নেতৃত্বে প্রথম দিনের বৈঠক হয়।
বৈঠকসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, খেলাপি ঋণ কমানো, ব্যাংক রেজল্যুশন, ইসলামি ব্যাংকিং, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা এবং নতুন ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা কর্মসূচিসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়।
সূত্র জানায়, এদিন বিকাল সাড়ে ৪টায় ব্যাংক রেজল্যুশন বিভাগ এবং ফিন্যান্সিয়াল সেক্টর সাপোর্ট অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যানিং বিভাগের সঙ্গে বৈঠকে ব্যাংকিং খাত সংস্কারের রূপরেখা, অ্যাসেট কোয়ালিটি রিভিউ (একিউআর), দুর্বল ব্যাংকের শ্রেণিবিন্যাস, রেজল্যুশন কৌশল, রেজল্যুশন ফান্ড এবং একীভূত হওয়ার প্রক্রিয়ায় থাকা পাঁচটি ব্যাংকের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণ নিষ্পত্তি কাঠামো এবং ব্যাংক রেজল্যুশন আইন বাস্তবায়নের অগ্রগতিও পর্যালোচনা করা হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা জানান, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে কেন একিউআরের আওতায় আনা হচ্ছে না, সে বিষয়ে জানতে চেয়েছে আইএমএফ। একই সঙ্গে আর্থিকভাবে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে কেন এখনো রেজল্যুশন প্রক্রিয়ার আওতায় নেওয়া হয়নি, সে প্রশ্নও তোলে সংস্থাটি।
তিনি বলেন, যেসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ৮০ শতাংশের বেশি, সেগুলো কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে এবং এত দুর্বল অবস্থার পরও কেন অবসায়ন বা বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া হয়নিÑএ বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা চেয়েছে আইএমএফ। তবে বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে কোনো সুনির্দিষ্ট জবাব দেওয়া হয়নি।
দিনের দ্বিতীয়ার্ধে ব্যাংকিং রেগুলেশন অ্যান্ড পলিসি ডিপার্টমেন্টের (বিআরপিডি) কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে ব্যাংক খাতের চলমান ও পরিকল্পিত আইনগত সংস্কার নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। এতে খেলাপি ঋণ নিষ্পত্তির কাঠামো, অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি (এএমসি) গঠন, সমস্যাগ্রস্ত সম্পদ ব্যবস্থাপনা, দেউলিয়াত্ব আইন এবং আদালতের বাইরে ঋণ পুনর্গঠনব্যবস্থার অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয়। একই বৈঠকে ইসলামি ব্যাংকিং খাতের আইনগত সংস্কার, আইএফআরএস-৯ এবং ব্যাংক রেজল্যুশন আইনের ১৮এ ধারা নিয়েও আলোচনা হয়।
বৈঠকে উপস্থিত বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা জানান, আইএফআরএস-৯ বাস্তবায়নের অগ্রগতি এবং খেলাপি ঋণ (এনপিএল) নিষ্পত্তির জন্য প্রণয়নাধীন গাইডলাইন নিয়ে আইএমএফ বিস্তারিত জানতে চায়। বাংলাদেশ ব্যাংক আইএমএফকে জানিয়েছে, আইএফআরএস-৯ বাস্তবায়নের নির্দেশনা ইতোমধ্যে ব্যাংকগুলোর কাছে পাঠানো হয়েছে। আর এনপিএল রেজল্যুশন গাইডলাইন তৈরির কাজ চলছে, যা আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকাশের পরিকল্পনা রয়েছে।
এদিন সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, আগের সরকারের নেওয়া আইএমএফ ঋণ কর্মসূচি ছিল ‘সম্পূর্ণ জনস্বার্থবিরোধী’। দেশের মানুষের অর্থনৈতিক স্বার্থরক্ষা করেই আইএমএফের সঙ্গে নতুন ঋণ কর্মসূচি করা হবে।
তিনি বলেন, ‘আমাদের মূল চিন্তা টাকা পাওয়া নয়, দেশের স্বার্থরক্ষা করা। দেশের মানুষের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ করে আইএমএফের সঙ্গে কোনো কর্মসূচিতে সরকার যাবে না।’
নতুন কর্মসূচির আওতায় সরকার তিন বছর মেয়াদে ৪০০-৪৫০ কোটি ডলার ঋণ পাওয়ার আশাবাদী। অর্থ পাওয়া গেলে তা সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং বৈদেশিক অর্থায়নের চাপ মোকাবিলায় ব্যবহার করা হবে।
ঋণের জন্য গত ৯ জুন আইএমএফকে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দেন অর্থমন্ত্রী। সেখানে বলা হয়েছে, আগের কর্মসূচি গ্রহণের সময়কার অর্থনৈতিক ও নীতিগত বাস্তবতা এখন আর নেই। দেশীয় রাজনৈতিক অর্থনীতি, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা এবং নতুন চ্যালেঞ্জের কারণে কিছু সংস্কার বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়েছিল। তবে সরকার সংস্কার কর্মসূচি থেকে সরে আসতে চায় না; বরং দেশের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ধাপে ধাপে তা বাস্তবায়ন করতে চায়।
২০২৩ সালে আওয়ামী লীগ সরকার আইএমএফের কাছ থেকে ৪৭০ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণ কর্মসূচিতে চুক্তি করেছিল। পরে ২০২৫ সালের জুনে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ওই কর্মসূচির আকার বাড়িয়ে ৫৫০ কোটি ডলারে উন্নীত করা হয়। অনুমোদিত ওই কর্মসূচির আওতায় পাঁচ কিস্তিতে বাংলাদেশ মোট ৩৬৪ কোটি ডলার পেয়েছে। তবে ষষ্ঠ কিস্তির অর্থছাড় নিয়ে প্রায় এক বছর আলোচনা চললেও শেষ পর্যন্ত তা পাওয়া যায়নি। পরে উভয়পক্ষের সম্মতিতে আগের ঋণ কর্মসূচিটি বাতিল করা হয়।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

