জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) প্রশাসনের উচ্চপদে কোনো ধরনের রদবদল হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব অধ্যাপকদের মধ্য থেকেই উপাচার্য ও ট্রেজারার নিয়োগ দিতে হবে বলে দাবি জানিয়েছে জবি শিক্ষক সমিতি। জবির অধ্যাপক ছাড়া অন্য কাউকে দায়িত্ব দেওয়া হলে তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন শিক্ষক সমিতির নেতারা। একই সঙ্গে উপ-উপাচার্য পদ সৃষ্টির দাবি জানিয়েছে শিক্ষক সমিতি।
মঙ্গলবার দুপুরে শিক্ষক সমিতির লাউঞ্জে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে এসব দাবি তুলে ধরেন সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. মো. ইমরানুল হক।
লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, ২০০৫ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ‘জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় আইন’ পাসের মাধ্যমে জগন্নাথ কলেজকে পূর্ণাঙ্গ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করেন। এর মধ্য দিয়ে একটি ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যাত্রা শুরু করে। ভাষা আন্দোলন, মহান মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানসহ দেশের সব গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলনে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টি কেবল একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, বরং দেশের গণতান্ত্রিক চেতনা ও জাতীয় আন্দোলনের ধারক ও বাহক।
তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ২০ বছর অতিক্রম করলেও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এখনো কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেনি। ২০০৫ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব অধ্যাপকদের মধ্য থেকে উপাচার্য নিয়োগ না হওয়ায় প্রতিষ্ঠানের স্বকীয়তা, অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা ও ঐতিহ্য যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়নি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্মিলিত আন্দোলনের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের আত্মমর্যাদা ও স্বায়ত্তশাসনের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষক সমিতি জানায়, নতুন প্রশাসনকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ন্যায্য দাবি সামনে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের আবাসন সংকটের স্থায়ী সমাধান, আবাসন নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আবাসন বৃত্তি চালু ও বাস্তবায়ন, কেরাণীগঞ্জে দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের কাজ দ্রুত বাস্তবায়ন, গুচ্ছ পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে নিজস্ব ভর্তি পরীক্ষা চালু, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ছাত্র প্রতিনিধি নির্বাচন এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (জকসু) বাস্তবায়ন। এছাড়াও গবেষণা বাজেট বৃদ্ধি, শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা ও অবকাঠামোগত উন্নয়নসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দাবি তুলে ধরা হয়। বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে এসব দাবির কিছু অগ্রগতি হয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়।
তিনি আরো বলেন, গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল সরকার গঠন করেছে বলে উল্লেখ করে শিক্ষক সমিতি জানায়, এর ফলে ২০০৫ সালে প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়টির উন্নয়নে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নিয়োগপ্রাপ্ত উপাচার্য, ট্রেজারারসহ প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে রদবদল শুরু হয়েছে এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়েও প্রশাসনিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে।
শিক্ষক সমিতি জোর দিয়ে জানায়, প্রশাসনের উচ্চপদে পরিবর্তন এলে পূর্বের ন্যায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের মধ্য থেকেই উপাচার্য ও ট্রেজারার নিয়োগ দিতে হবে। তাদের দাবি, একজন উপাচার্য ও ট্রেজারারের বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা সম্পর্কে সম্যক ধারণা থাকা প্রয়োজন, যাতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবি আদায় এবং সরকারের কাছে প্রতিশ্রুত আবাসন বৃত্তির অর্থ আনয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখা যায়। বাজেট বৃদ্ধি, গবেষণা সম্প্রসারণ ও দ্বিতীয় ক্যাম্পাস দ্রুত বাস্তবায়নের জন্যও অভিজ্ঞ ও দৃঢ় নেতৃত্ব প্রয়োজন বলে তারা উল্লেখ করেন। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা সম্পর্কে অবগত নেতৃত্ব ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয় বলেও মত দেন তারা।
এছাড়াও বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩৮টি বিভাগ ও ২টি ইনস্টিটিউট রয়েছে। এত বড় একাডেমিক কাঠামো এককভাবে পরিচালনা করা কঠিন হওয়ায় উপ-উপাচার্যের পদ সৃষ্টির দাবিও জানায় শিক্ষক সমিতি, যাতে প্রশাসনিক কার্যক্রম আরও গতিশীল ও কার্যকর হয়।
শিক্ষক সমিতি আরও জানায়, বিশ্ববিদ্যালয়ে বহু সিনিয়র ও যোগ্য অধ্যাপক রয়েছেন, যারা একাডেমিক ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে দক্ষ। তাদের দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় ও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে যথাযথ পদে নিয়োগের ব্যবস্থা করা উচিত। রাজধানী ঢাকায় অবস্থিত হওয়া সত্ত্বেও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এখনও কাঙ্ক্ষিত মর্যাদা পায়নি বলে তারা মন্তব্য করেন এবং এ বিষয়ে সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করেন।
সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষক সমিতির পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয়, প্রশাসনের উচ্চপদে রদবদল হলে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের মধ্য থেকেই উপাচার্য ও ট্রেজারার নিয়োগ দিতে হবে। নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রদ্ধাভাজন ও যোগ্য শিক্ষক হতে হবে, যার একাডেমিক উৎকর্ষ, প্রশাসনিক দক্ষতা ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞা রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যকর প্রশাসনের জন্য উপ-উপাচার্যের পদ সৃষ্টি এবং সামগ্রিক উন্নয়ন, বাজেট বৃদ্ধি ও দ্বিতীয় ক্যাম্পাস বাস্তবায়নে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবিও পুনর্ব্যক্ত করা হয়।
শিক্ষক সমিতি জানায়, বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার বাহিরের কোনো উপাচার্য বা ট্রেজারার মেনে নেবে না এবং বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে গণমাধ্যমে উপস্থাপনের জন্য সাংবাদিকদের সহযোগিতা কামনা করে। সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষক সমিতির নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

