দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা রাজনীতি ও দলীয় কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছেন। দলীয় কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণসহ আসন্ন সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে প্রকাশ্যে নির্বাচনি প্রচারে অংশ নিচ্ছেন তারা। রাজনীতিতে সক্রিয় এসব শিক্ষক সরকারি চাকরিবিধির তোয়াক্কা করছেন না।
সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-তে সরকারি চাকরিজীবীদের রাজনৈতিক কার্যক্রমে কঠোর নিষেধাজ্ঞা থাকলেও প্রাথমিকের অনেক শিক্ষক তা মানছেন না।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, নিজ নিজ এলাকায় কর্মরত বিপুলসংখ্যক প্রাথমিক শিক্ষক স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখছেন। ফলে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের প্রভাবে এসব শিক্ষকের ওপর কার্যকর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। স্থানীয়করণের এই প্রভাব প্রাথমিক শিক্ষক ব্যবস্থাপনা ও শিক্ষা পর্যবেক্ষণকে চরমভাবে দুর্বল করছে।
কুড়িগ্রাম, গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর, রাজবাড়ীসহ বিভিন্ন জেলার তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক প্রকাশ্যে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিচ্ছেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, কুড়িগ্রামের রাজারহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মনিবুল হক বসুনিয়া নিয়মিত বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নেন। মনিবুল হক ফেসবুকে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টাসহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্যও করেন। বর্তমানে তিনি সাময়িক বরখাস্ত। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) রাজারহাট উপজেলা প্রতিনিধি কমিটির তালিকায় ১ নম্বর সদস্য হিসেবে মনিবুল হকের নাম আছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মনিবুল হক বসুনিয়া বলেন, এনসিপিতে আমার পদ থাকলেও গত চার মাস আমি সেভাবে সক্রিয় নই। সরকারি চাকরি করি, নানান চাপ। বর্তমানে আমাকে চাকরি থেকে সাসপেন্ড করা হয়েছে। চাকরিতে ফেরা নিয়ে চিন্তায় আছি।
তিনি আরো বলেন, ছাত্র অবস্থায় বিএনপির রাজনীতিতে জড়িত ছিলাম। গত ৫ আগস্ট পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এনসিপিতে যোগ দিই।
সম্প্রতি কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার ছাটকালুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল গফুরকে নির্বাচনি প্রচারে অংশ নিয়ে প্রকাশ্যে ভোট চাইতে দেখা গেছে। এছাড়া কুড়িগ্রামের আরেক শিক্ষক হাফিজুর রহমান জুয়েল নাগেশ্বরী উপজেলা এনসিপির আহ্বায়ক।
কুড়িগ্রামের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, শুধু তার জেলাতেই ডজনখানেক শিক্ষক নিয়মিত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত। আমরা ব্যবস্থা নিতে গেলে উল্টো আমাদেরই জবাবদিহি করতে হয়। যে যাই করুক, চাকরি যাবে না—এমন ধারণা থেকে অনেক শিক্ষক বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন।
গোপালগঞ্জ ও ফরিদপুরের কয়েকজন সহকারী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জানান, অনেক শিক্ষক সরাসরি রাজনীতিতে জড়িত থাকার কারণে তারা পাঠদান বাদ দিয়ে সভা-সমাবেশে ব্যস্ত থাকেন। এসব অনিয়ম চোখের সামনে দেখলেও মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা কার্যকর ব্যবস্থা নিতে ভয় পান। কারণ, কর্মকর্তাদের অধিকাংশই বাইরের জেলা থেকে আসা। তাই স্থানীয় প্রভাবশালী শিক্ষক, রাজনৈতিক নেতা ও শিক্ষক সংগঠনগুলোর চাপের কারণে তারা অনেক সময় নীরব থাকতে বাধ্য হন।
রাজনৈতিক প্রভাবের পাশাপাশি শিক্ষক সংগঠনগুলোর অযৌক্তিক চাপও প্রাথমিক শিক্ষা খাতকে জিম্মি করে রেখেছে। ১১তম গ্রেডসহ কয়েক দফা দাবিতে প্রাথমিকের শিক্ষক সংগঠন কর্মবিরতি ও পরীক্ষা বর্জন করে। শিক্ষকেরা স্থানীয় প্রভাবে বিদ্যালয়ে তালা দেওয়ার মতো কর্মসূচিও বাস্তবায়ন করেন। অনেক শিক্ষক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকার ও প্রশাসনবিরোধী কটূক্তিমূলক মন্তব্য করছেন, যা চাকরির শৃঙ্খলাবিধির সরাসরি লঙ্ঘন।
রাজনীতি ছাড়াও বিভিন্ন ধরনের দুর্নীতি ও অপকর্মেও জড়িত হচ্ছেন অনেক শিক্ষক। এছাড়া শিক্ষক সংগঠনের চাপ, প্রশাসনিক দুর্বলতা ও জবাবদিহিতার অভাবে মাঠপর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় শৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছে। গত বছরের শেষভাগে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বার্ষিক পরীক্ষা বর্জন এবং বিদ্যালয়ে তালা দেওয়া তার প্রমাণ।
এছাড়া চলতি বছরের ৮ জানুয়ারি ঘুস লেনদেনের অভিযোগে যশোরের প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার আশরাফুল আলমকে আটকের প্রতিবাদে যশোরের দুদক কার্যলয় ঘেরাও করে বিক্ষোভ করেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা।
সম্প্রতি রাজবাড়ীর অলংকারপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একটি ঘটনা শিক্ষকদের নৈতিক অবক্ষয়ের চিত্র তুলে ধরে। সেখানকার প্রধান শিক্ষক আবদুল হালিমের বিরুদ্ধে ছাত্রীদের যৌন হয়রানিসহ একাধিক গুরুতর অভিযোগ প্রমাণ হয়েছে।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের এমন আচরণ ও কার্যক্রমে অভিভাবকরা গভীর হতাশা প্রকাশ করেছেন। তাদের অভিযোগ, যারা নিজেরাই দায়িত্বশীল আচরণ, শৃঙ্খলা ও নৈতিকতা মানেন না, তারা শিক্ষার্থীদের কী শেখাবেন? অনেকে জানান, বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত পাঠদানের অভাবে বাধ্য হয়ে কোচিংয়ের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের।
এসব বিষয়ে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবু নূর মোহাম্মদ শামসুজ্জামান বলেন, সারা দেশে প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক বাচ্চাদের জিম্মি করে পরীক্ষার সময় আন্দোলনের নামে যে অসহযোগিতা করেছে, তাদের মধ্যে নেতৃস্থানীয় ৪৩ শিক্ষককে আমরা বিভিন্ন জায়গায় বদলি করেছি। এছাড়া আরো শতাধিক শিক্ষককে আমরা শোকজ করেছি।
তিনি বলেন, ওই সব শিক্ষক জবাব দিয়েছে এবং জবাবের পরিপ্রেক্ষিতে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে। এখন তারা কিছুটা সময় পেয়েছে। এরপর প্রত্যেকের ব্যক্তিগত শুনানি হবে। তারপর অপরাধের পরিপ্রেক্ষিতে তাদের শাস্তির বিষয়টি নির্ধারণ করা হবে।
নির্বাচনি প্রচারে শিক্ষকদের অংশগ্রহণের বিষয়ে তিনি বলেন, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর কোনো দলের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ নেই। আমরা যখন কোথাও থেকে খবর পাচ্ছি, সঙ্গে সঙ্গে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং সে শোকজের আওতায় আসছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিক্ষকদের প্রশাসনবিরোধী মন্তব্যের বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা প্রতি জেলায় একটি করে কমিটি করে দিয়েছি ফেসবুক মনিটরিংয়ের জন্য। আমরা এটা আরো সক্রিয় করব।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


সরাইলে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত জুলাই শহীদের বাবা