আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

ছাত্রলীগ সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে ঢাবি শিক্ষার্থীকে মারধর, নেপথ্যে কী

মাহির কাইয়ুম, ঢাবি

ছাত্রলীগ সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে ঢাবি শিক্ষার্থীকে মারধর, নেপথ্যে কী
ভুক্তভোগী রাহিদ খান পাভেল

নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) এক শিক্ষার্থীকে ধরে নিয়ে কয়েক দফা বেধড়ক মারধরের অভিযোগ উঠেছে জাতীয় ছাত্রশক্তি ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কিছু নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে। পরে আহত অবস্থায় তাকে শাহবাগ থানায় রেখে যায় অভিযুক্তরা।

গতকাল রোববার (৮ মার্চ) দিবাগত রাত থেকে সোমবার ভোর পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। আহত শিক্ষার্থী রাহিদ খান পাভেল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী এবং মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হলের আবাসিক ছাত্র।

বিজ্ঞাপন

ভুক্তভোগী রাহিদ খান পাভেল অভিযোগ করেন, সেহরি খাওয়ার জন্য তিনি বুয়েটের কাজী নজরুল ইসলাম হলে গেলে সেখানে উপস্থিত কয়েকজন তাকে ‘ছাত্রলীগ’ আখ্যা দিয়ে আটকে রাখে। পরে জাতীয় ছাত্রশক্তির নেতাকর্মীদের নেতৃত্বে প্রায় ২০-২৫ জন তাকে প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে মারধর করে।

তিনি বলেন, “প্রথমে বুয়েটের ভেতরে আমাকে মারধর করা হয়। পরে রিকশায় তুলে সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের সামনে নিয়ে গিয়ে আবার মারধর করা হয়। এরপর ভিসি চত্বর এবং রাজু ভাস্কর্যের সামনে কিছু সময় আটকে রেখে পেটানো হয়। পরে আমাকে শাহবাগ থানায় ফেলে রেখে যায়।”

পাভেলের দাবি, তাকে ইট, বেল্ট ও মোটরসাইকেলের লক দিয়ে মারধর করা হয়েছে। বাইকের চাবি দিয়ে মুখে আঘাত করা হয়েছে। এতে তার মুখ দিয়ে রক্ত বের হয় এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর আঘাত লাগে।

প্রলয় গ্যাং
প্রলয় গ্যাং

তিনি আরও বলেন, “আমার কোনো দোষ থাকলে আমাকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য আমি তাদের বলেছি। কিন্তু তারা আমার কোনো কথা শোনেনি। আমি কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত নই। আমি নিয়মিত ক্লাস করা একজন শিক্ষার্থী।”

ঘটনার পর আহত অবস্থায় তাকে শাহবাগ থানায় নিয়ে গেলে পুলিশ তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য পাঠায়।

শাহবাগ থানার পরিদর্শক (অপারেশন) মো. খোকন মিয়া বলেন, “একদল শিক্ষার্থী তাকে ছাত্রলীগ করার অভিযোগে থানায় রেখে যায়। অসুস্থ থাকায় তাকে চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেলে পাঠানো হয়। এখন পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি।”

এদিকে মারধরের অভিযোগ স্বীকার করেছেন জাতীয় ছাত্রশক্তির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার একাধিক নেতাকর্মী। তাদের ভাষ্য, ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে তাকে আটক করে পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়। পুলিশের কাছে সোপর্দ করার আগে তার কাছ থেকে ছাত্রলীগ সংশ্লিষ্টতার তথ্য বের করতে মারধর করা হয়।

মারধরের অভিযোগ স্বীকার করে জাতীয় ছাত্রশক্তির ঢাবি শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক মো. সাইফুল্লাহ আমার দেশকে বলেন, "মারধরের সাথে আমি সরাসরি জড়িত ছিলাম না। সারদার নাদিম মাহমুদ শুভ, হাসিব আল ইসলামরা ছিল।"

তিনি বলেন, “জুলাই আন্দোলনের সময় রাহিদ হামলাকারীদের সঙ্গে ছিল। হল ও বিভাগ থেকেও তাকে বয়কট করা হয়েছিল। ইদানীং সে সাবেক ছাত্রলীগ কর্মীদের নিয়ে ক্যাম্পাসে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে বলে আমাদের কাছে অভিযোগ এসেছে। তার কাছ থেকে এসব তথ্য বের করতে মারধর করা হয়। পরে পুলিশে দেওয়ার জন্যই আটক করা হয়েছিল।”

ওই শিক্ষার্থী অপরাধী কার্যক্রমের সাথে জড়িত থাকলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অফিসে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, "লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়নি। আমরা অভিযুক্তকে পাকড়াও করে পুলিশে সোপর্দ করেছি।"

মারধরে অভিযুক্ত বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মূখ্য সংগঠক হাসিব আল ইসলাম বলেন, "আওয়ামী লীগ ফিরে আসলে, অনুগ্রহ করে আমাদের আর দোষারোপ করবেন না। অনেকে রাজনৈতিক হীন উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে তিলকে তাল বানিয়ে আমাদের আওয়ামীবিরোধী মোরাল গ্রাউন্ড নষ্ট করেছে। আমাদের বক্তব্য না শুনেই আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করাচ্ছে।

তবে, হ্যা। আমরা আমাদের ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেছি। ছাত্রলীগকে পুলিশে দিয়েছি।"

মারধরে অভিযুক্ত ছাত্রশক্তি ঢাবি শাখার কর্মী সারদার নাদিম মাহমুদ শুভ বলেন, "সন্ত্রাস প্রতিহত করাকে আজ সন্ত্রাস আখ্যা দেওয়া হচ্ছে।"

মারধরে অভিযুক্ত বাম দিক থেকে মো সাইফুল্লাহ, হাসিব আল ইসলাম, সার্দার নাদিম মাহমুদ শুভ
মারধরে অভিযুক্ত বাম দিক থেকে মো সাইফুল্লাহ, হাসিব আল ইসলাম, সার্দার নাদিম মাহমুদ শুভ

জানা গেছে, নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সঙ্গে ভুক্তভোগী রাহিদের সম্পৃক্ততা ছিল। জুলাই অভ্যুত্থানের পর ২২ আগস্ট রাহিদসহ ১৮ জন ছাত্রলীগ সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীকে মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হল থেকে শিক্ষার্থীরা অবাঞ্চিত ঘোষণা করেন। ২০২৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আতঙ্ক সৃষ্টিকারী 'প্রলয় গ্যাং' এর সাথে সম্পৃক্ত ছিল রাহিদ।

বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার দ্যা সূর্যসেন হলের শিক্ষার্থী জামাল রুহানি বলেন, রাহিল সাধারণ শিক্ষার্থী নন। বরং জিয়া হল ছাত্রলীগের মিছিলে সামনের সারিতে থাকতেন। ২০২৩ সালের ছাত্রলীগের ইলেকশন পরিচালনা কমিটিতেও তার নাম আছে।

তিনি বলেন, "তবে, ছাত্রলীগ, আওয়ামী লীগ করলেই কাউকে মারধর গ্রহণযোগ্য না। বরং, এটা আওয়ামী লীগের কালচার।

দেশে আইন আছে, আদালত আছে। অভিযোগ থাকলে আইনি উদ্যোগ নিন। মব নয়।"

ঘটনার বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক সাইফুদ্দিন আহমেদ বলেন, আমরা বিষয়টি সম্পর্কে অবগত আছি। তবে এ বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব পুলিশের। যদি কোনো অপরাধের অভিযোগ থাকে, তাহলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে ঘটনাটিকে ‘মব জাস্টিস’ আখ্যা দিয়ে সমালোচনা করেছেন ছাত্রসংগঠনের কয়েকজন নেতা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি আবু সাদিক কায়েম বলেন, “জুলাই বিপ্লবের অন্যতম দাবি ছিল- কাউকে অন্যায়ভাবে শারীরিকভাবে আঘাত করা যাবে না। কেউ অপরাধী হলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।”

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন