রাজধানীর ‘মীরপুর গার্লস আইডিয়াল ল্যাবরেটরী ইনস্টিটিউট’-এর বরখাস্তকৃত সহকারী শিক্ষক (সংগীত) বিপাশা ইয়াসমিনের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম, শৃঙ্খলা ভঙ্গ, সহিংস আচরণ, রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক প্রভাব খাটানোর অভিযোগ করা হয়েছে। এসব অভিযোগে গত বছরের মে মাসে তাকে বরখাস্ত করা হলেও তিনি প্রধান শিক্ষক এবং প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে নানা অপপ্রচার, বুলিং ও ষড়যন্ত্র করছেন বলে জানানো হয়।
শনিবার বেলা ১১টায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান শিক্ষক জিনাত ফারহানা এই অভিযোগ করেন। তিনি ওই শিক্ষকের অপপ্রচার ও ষড়যন্ত্র থেকে প্রতিষ্ঠানটিকে রক্ষার জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের হস্তক্ষেপ কামনা করেন। এ সময় তার সঙ্গে বেশ কয়েকজন শিক্ষক উপস্থিত ছিলেন।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বলা হয়, পতিত আওয়ামী সরকারের সময়ে ২০১৫ সালে বিপাশা ইয়াসমিনকে সম্পূর্ণ বিধিবহির্ভূতভাবে এবং অনুমোদিত শিক্ষক-কর্মচারী প্যাটার্নের বাইরে নিয়োগ দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের আস্থাভাজন, একই মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব নজরুল ইসলামের স্ত্রীর পরিচয় ব্যবহার করে এবং প্রভাবশালী ঢাকা-১৬ আসনের এমপি ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহর প্রভাবে এই নিয়োগ কার্যকর করা হয়। পরবর্তীতে ইলিয়াস মোল্লাহ ও জাহাঙ্গীর কবির নানকের সরাসরি হস্তক্ষেপে নিয়মনীতি উপেক্ষা করে তার চাকরি স্থায়ী করা হয়।
চাকরিতে যোগদানের পর থেকেই তিনি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকদের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে পড়েন।
প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত অমান্য, দায়িত্ব পালনে অবহেলা, দেরিতে উপস্থিতি এবং রাজনৈতিক প্রভাব দেখিয়ে কর্তৃপক্ষকে চাপে রাখার প্রবণতা তার নিত্যদিনের আচরণে পরিণত হয়। একপর্যায়ে তিনি সহকারী প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে মিথ্যা যৌন হয়রানির অভিযোগ আনেন।
এ বিষয়ে তিনটি তদন্তেই তার অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা প্রমাণিত হয়। শুধু তাই নয়, তার পক্ষে না থাকলে শিক্ষার্থীদের দিয়ে যৌন নির্যাতনের মামলা করাবে বলে হুমকি দিতে থাকেন, ফলে ১৪ জন পুরুষ শিক্ষক মিরপুর থানায় জিডি করেন।
সংবাদ সম্মেলনে আরো বলা হয়, রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর ওই শিক্ষক ভোল পাল্টান। অভিযোগ রয়েছে, নিজেকে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ব্যানারে যুক্ত করে ভুয়া পরিচয়ে আন্দোলনের নেত্রী হিসেবে উপস্থাপন করতে শুরু করেন। এই ব্যানার ব্যবহার করে তিনি একাধিকবার বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে প্রবেশ করে শিক্ষকদের ওপর হামলা, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেন এবং ১৯ জন শিক্ষকের বিরুদ্ধে ছাত্র হত্যার মিথ্যা মামলা করেন এতে শিক্ষার পরিবেশ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে মিরপুর-১০ সেনা ক্যাম্পের অফিসাররা তাকে একাধিকবার সতর্ক করেন।
আরো অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী সরকারের প্রভাবশালী কিছু সচিব ও মন্ত্রীর নাম ব্যবহার করে তিনি দীর্ঘদিন প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ ও সহকর্মীদের ওপর ভয়ভীতি ও প্রভাব বিস্তার করেন। কোনো অনিয়মের বিষয়ে প্রশ্ন তোলা হলে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে পরিস্থিতি নিজের অনুকূলে নেওয়ার চেষ্টা করতেন বলে একাধিক শিক্ষক ও অভিভাবক অভিযোগ করেছেন।
তিনি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, সহকারী প্রধান শিক্ষকসহ শিক্ষক-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ধারাবাহিকভাবে মিথ্যা, বানোয়াট ও উদ্দেশ্য প্রণোদিত অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন। অভিযোগ রয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে কুরুচিপূর্ণ, বিকৃত ও মানহানিকর ভিডিও ও কনটেন্ট তৈরি করে তা অনলাইনে ছড়িয়ে সংশ্লিষ্টদের সামাজিক মর্যাদা ক্ষুন্ন করার চেষ্টা করছেন। এসব কর্মকাণ্ড এখনো অব্যাহত রয়েছে।
আরো অভিযোগ করা হয়, নিজের অনৈতিক কর্মকাণ্ড আড়াল ও প্রতিষ্ঠানের কর্তৃত্ব দুর্বল করার উদ্দেশ্যে তিনি মাউশির কিছু অসাধু কর্মকর্তাকে ব্যবহার করে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকসহ একাধিক শিক্ষক-কর্মচারীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে একের পর এক অভিযোগ দায়ের করেন। অধিকাংশ অভিযোগ তদন্তে ভিত্তিহীন প্রমাণিত হলেও ধারাবাহিক অপপ্রচারের মাধ্যমে বিদ্যালয়ের সুনাম ক্ষুন্ন করা হচ্ছে। বরখাস্ত শিক্ষকের ব্যক্তিগত প্রভাব ও অনৈতিক কর্মকাণ্ড ব্যবহার করে তিনি মাউশিকে বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রদান করেন। এর ফলে প্রধান শিক্ষক জিনাত ফারহানার সরকারি বেতন ও আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। এই বিষয়ে রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে হাইকোর্ট ওই আদেশ স্থগিত ঘোষণা করেন।
শিক্ষক সমিতির শীর্ষ নেতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের কথা বলে নানা প্রভাব দেখানোর চেষ্টা করেন ওই শিক্ষক। শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের লিখিত অভিযোগ, অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন এবং সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে বিপাশা ইয়াসমিনের কর্মকাণ্ড বিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা ও সুনাম মারাত্মকভাবে ক্ষুন্ন করছে। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মূল্যবোধ ও নিরাপদ শিক্ষা পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে তাকে বরখাস্ত করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে সহকারী প্রধান শিক্ষক আহমিদউল্লা কাসেমী, প্রভাতি শাখার ইনচার্জ সুয়ারা সুলতানা, দিবা শাখার ইনচার্জ জেসমিন আহমেদ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

