ইয়ামামা হলো সৌদি আরবের নাজদ প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত একটি অঞ্চল। বর্তমানে এটি আল-আরিজ নামে পরিচিত। এ প্রদেশেই সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদ অবস্থিত। আবু বকর (রা.)-এর খিলাফতকালে হিজরি ১১ সনে (৬৩২ খ্রিষ্টাব্দ) এখানে ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এটি ‘ইয়ামামার যুদ্ধ’ নামে পরিচিত। এই যুদ্ধে মুসলিম সেনাবাহিনী নবুয়ত দাবিদার মহামিথ্যুক মুসাইলামার অনুসারী, যারা ইসলাম ত্যাগ করে খিলাফত রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে করেছিল, তাদের মুখোমুখি হয়। এই যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর সেনাপতি ছিলেন খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রা.)। তিনি ইকরিমা ও শুরাহবিল (রা.)-কে সঙ্গে নিয়ে যুদ্ধের ময়দানে অবতীর্ণ হন। শেষ পর্যন্ত এই যুদ্ধ মুসলমানদের বিজয় হয়; মুসাইলামা নিহত হয় এবং ধর্মদ্রোহের ফিতনা নির্বাপিত হয়।
ইয়ামামা যুদ্ধের কারণ
ইয়ামামা যুদ্ধ সংঘটনের পেছনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ বিভিন্ন কারণ ছিল।
ধর্মদ্রোহ : এই যুদ্ধের প্রধান কারণ ছিল ধর্মদ্রোহ। নবীজি (সা.)-এর ইন্তেকালের পরে আরবের বেশ কিছু গোত্র ইসলাম থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। তারা ইসলাম ত্যাগ করে শরিয়তের বিধিবিধান মান্য করতে অস্বীকৃতি জানায়। বিশেষ করে, আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে ফরজ বিধান জাকাত দেওয়ার আবশ্যকতা তারা অস্বীকার করে। ফলে খিলাফত রাষ্ট্রের প্রথম খলিফা আবু বকর (রা.) তাদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধ ঘোষণা করেন।
রাষ্ট্রদ্রোহ ও মিথ্যা নবুয়াতের দাবি : নবীজি (সা.) এর ইন্তেকালের পরে যেসব গোত্র ধর্মদ্রোহে যোগ দিয়েছিল, তাদের মধ্যে ছিল—বনু সাদ, বনু ফাজারাহ, বনু আমের ও গাতফান, বনু সুলাইম, বনু বকর ও বনু হানিফা। এদের মধ্য থেকে বনু হানিফা গোত্রের এক মিথ্যাবাদী নেতা, যার নাম ছিল মুসাইলামা, সে মিথ্যা নবুয়াতের দাবি করে বসে। সে ধর্ম ইসলাম ও মদিনাভিত্তিক খিলাফত রাষ্ট্রের রাজনৈতিক শক্তি বিনষ্ট করার চেষ্টা করতে থাকে এবং আল্লাহতায়ালার সার্বভৌমত্বের ওপর আক্রমণ করে। ফলে ইসলামের ঐক্য ও খিলাফত রাষ্ট্রের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত রাখতে মিথ্যা নবুয়াত দাবিদারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা হয়।
ইয়ামামা যুদ্ধ সংঘটনের সময় : ঐতিহাসিকদের অনেকে মনে করেন, ইয়ামামার যুদ্ধ ১১ হিজরিতে (৬৩২ খ্রিষ্টাব্দ) সংঘটিত হয়েছিল। তবে, ওয়াকিদি ও অন্যদের মতে, এটি ১২ হিজরিতে সংঘটিত হয়। সম্ভবত, দুটি মতোই সঠিক। আল্লাহতায়ালাই ভালো জানেন। হয়তো যুদ্ধটি ১১ হিজরিতে শুরু হয়ে ১২ হিজরিতে গিয়ে শেষ হয়েছিল। (আবু বকর সিদ্দিক, আলি সাল্লাবি, পৃষ্ঠা : ৪০৭)
যুদ্ধ : মিথ্যাবাদী মুসাইলামার নেতৃত্বাধীন বনু হানিফা ছিল বিদ্রোহী গোত্রগুলোর মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী। তাদের সৈন্যসংখ্যা ছিল প্রায় ৪০ হাজার। তাদের মোকাবিলার জন্য আবু বকর (রা.) প্রথমে ইকরিমা ইবনে আবু জাহল (রা.)-কে পাঠালেন। তার পেছনে পেছনে শুরাহবিল ইবনে হাসানা (রা.)-কেও যাত্রা করতে বললেন। তিনি ইকরিমা (রা.)-কে নির্দেশ দিয়েছিলেন—শুরাহবিলের বাহিনী পৌঁছার আগে তিনি যেন যুদ্ধে লিপ্ত না হন। কিন্তু ইকরিমা শুরাহবিলের জন্য অপেক্ষা না করে একাই বনু হানিফার ওপর আক্রমণ চালান। ফলে ভয়াবহভাবে বিপর্যস্ত হয়ে তাকে ফিরে আসতে হয়।
খলিফার পক্ষ থেকে শুরাহবিল (রা.)-এর প্রতিও নির্দেশ ছিল, তিনি যেন খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রা.)-এর আগমনের অপেক্ষা করেন। কিন্তু তিনি খালিদের বাহিনী পৌঁছার আগেই বনু হানিফার সেনাবাহিনীর মুখোমুখি হন। ফলে মুসলিম বাহিনীর দ্বিতীয় পরাজয় ঘটে। এরপর আল্লাহর তলোয়ার খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রা.) ১২ হাজার যোদ্ধার এক বিশাল বাহিনী নিয়ে ইয়ামামার ময়দানে উপস্থিত হন। তার বাহিনীতে মুহাজির, কোরআনের হাফেজ এবং বদর যুদ্ধে অংশ নেওয়া অনেক সাহাবি ছিলেন। মুসলিম বাহিনীর অগ্রযাত্রার সংবাদ পেয়ে সৈন্যদের নিয়ে মুসাইলামা আকরাবা এলাকায় শিবির স্থাপন করে। তার পেছনে ছিল ইয়ামামার উর্বর ভূমি ও দুর্গগুলো। অন্যদিকে খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রা.) বিপরীত প্রান্তে শিবির স্থাপন করেন।
খালিদ (রা.) সসস্ত্র আক্রমণের আগে মুসাইলামার বাহিনীকে দুর্বল করার উদ্দেশ্যে তার অধীন কিছু অভিজাত ও নেতাদের দলে ভেড়ানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু তারা এই যুদ্ধকে গোত্রের আত্মসম্মানের যুদ্ধ ধরে নিয়েছিল। ফলে খলিদ (রা.)-এর প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। এরপর দুই বাহিনীর মধ্যে সসস্ত্র আক্রমণ শুরু হয়। যুদ্ধ শুরু হয় দ্বন্দ্বযুদ্ধের মাধ্যমে, এরপর মুসলমানরা প্রবল আক্রমণের সম্মুখীন হয়। এই পরিস্থিতিতে মুসলিম সেনাপতি খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রা.) যুদ্ধকৌশলে পরিবর্তন আনেন এবং সূক্ষ্ম ও বুদ্ধিদীপ্ত পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। তিনি যোদ্ধাদের অন্তরে আত্মসম্মানবোধ ও উদ্দীপনা বাড়িয়ে তোলার জন্য তাদের গোত্রভিত্তিক বিন্যস্ত করেন। তিনি আনসারদের পতাকা দেন সাবিত ইবনে কায়েসের হাতে, মুহাজিরদের পতাকা দেন সালিম মাওলা আবু হুজাইফাকে এবং অন্যান্য গোত্রের জন্য পৃথক পৃথক পতাকা দেন। তিনি এখানেই থেমে থাকেননি; বরং তিনি কোরআনের কারি অর্থাৎ পুরো কোরআনের হাফেজ ও সুরা বাকারার হাফেজদেরও যুদ্ধের ময়দানে নিয়ে আসেন। এই পরিবর্তন মুসলিম বাহিনীর মধ্যে ধর্মীয় ও গোত্রীয়, উভয় ধরনের উদ্দীপনা বৃদ্ধি করে। ফলে সবাই বিজয় অর্জনের প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ে।
মুসাইলামার হত্যা ও যুদ্ধের সমাপ্তি : চূড়ান্ত যুদ্ধ দীর্ঘ সময় ধরে অব্যাহত থাকে; উভয় পক্ষেই বহু হতাহতের ঘটনা ঘটে, তবে বনু হানিফা তখনো দৃঢ়ভাবে প্রতিরোধ করে যাচ্ছিল। এই পর্যায়ে মুসলিম সেনাপতি খালিদ (রা.) বুঝতে পারেন, মুসাইলামা যতক্ষণ বেঁচে আছে, বনু হানিফার বিরুদ্ধে বিজয় অর্জন করা সম্ভব হবে না। তাই সবার আগে তাকে হত্যা করতে হবে। ফলে তিনি বিভিন্ন কৌশলে মুসলিম সৈনিকদের মনোবল বৃদ্ধি করতে থাকেন। তাদের উদ্দীপনা তীব্র করে তোলেন। তারা মুসাইলামা ও তার সৈন্যদের ওপর প্রবল আক্রমণ করে। ফলে মুসাইলামা বাধ্য হয়ে উঁচু প্রাচীরঘেরা একটি বাগানে আশ্রয় নিয়ে মুসলিমেদের থেকে আত্মরক্ষা করার চেষ্টা করে।
মুসলিম বাহিনীও বাগানের ভেতরে প্রবেশ করে। অবশেষে ওয়াহশি ইবন হারব—যিনি হামজা ইবনে আবদুল মুত্তালিবের হত্যাকারী হিসেবে পরিচিত ছিলেন, মুসাইলামাকে হত্যা করেন। মুসাইলামার নিহত হওয়ার পর বনু হানিফার প্রতিরোধ ভেঙে পড়ে। মুসলিম বাহিনীর মোকাবিলা করার ক্ষমতা তারা হারিয়ে ফেলে। বাধ্য হয়ে তারা আত্মসমর্পণ ও সন্ধির প্রস্তাব পাঠায়।
এই যুদ্ধে হানিফা গোত্রের ২১ হাজার লোক নিহত হয়। মুসলিম বাহিনীর ১২০০ যোদ্ধা শাহাদাত বরণ করেন। তাদের মধ্যে ৪০ জন ছিলেন কোরআনের হাফেজ। (আবু বকর সিদ্দিক, আলি সাল্লাবি, পৃষ্ঠা : ৪০৬) কোনো কোনো বর্ণনায় তাদের সংখ্যা ৭০ জন বলা হয়েছে। (তাতাউরু কিতাবাতিল মুসহাফ, মুহাম্মদ সালিম আওফি, পৃষ্ঠা : ৪)
ইয়ামামা যুদ্ধের ফল
ধর্মদ্রোহীদের পরাজয় : মুয়ামামা যুদ্ধে পরাজয়ের মাধ্যমে মুরতাদ ও ধর্মদ্রোহীদের চূড়ান্ত পরাজয় ঘটে। মিথ্যা নবুয়ত দাবিদার মুসাইলামাকে হত্যা করা হয়। তার সৈন্যবাহিনীর অর্ধেক সৈন্য নিহত হন। অবশিষ্টরা আত্মসমর্পণ করে। একই সঙ্গে বহু মুসলমান শহীদ হন, যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ছিলেন কোরআনের হাফেজ।
কতক ধর্মদ্রোহীর ইসলামে প্রত্যাবর্তন : এই যুদ্ধের পরে কতক ধর্মদ্রোহী মুরতাদ তওবা করে ইসলামে ফিরে আসে।
হাফেজ সাহাবিদের শাহাদাত : সাহাবিদের মধ্য থেকে বিপুলসংখ্যক কোরআনের হাফেজ এই যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করেন। তাদের সংখ্যা ছিল ৪০ অথবা ৭০।
কোরআন সংকলনের প্রেক্ষাপট
ইয়ামামার যুদ্ধে কোরআনের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক হাফেজ সাহাবির শাহাদাতের ফলে পবিত্র কোরআন সংকলনের প্রয়োজনীয়তা প্রবল হয়ে ওঠে। এ পরিস্থিতিতে উমর (রা.) আশঙ্কা প্রকাশ করেন, যদি এভাবে হাফেজদের শাহাদাত অব্যাহত থাকে, তবে কোরআনের অংশবিশেষ বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে। এই বিবেচনায় তিনি খলিফা আবু বকর (রা.)-এর কাছে কোরআন সংকলনের প্রস্তাব উত্থাপন করেন।
প্রথমদিকে আবু বকর (রা.) এ প্রস্তাবে সম্মতি প্রদানে দ্বিধা করেন; কারণ কোরআনকে একত্র করার কাজটি নবীজি (সা.)-এর জীবনকালে সম্পাদিত হয়নি। তবে উমর (রা.)-এর যুক্তি ও দৃঢ় অবস্থানের ফলে খলিফাকে এ বিষয়ে সম্মত হন। তখন আবু বকর (রা.) কোরআন সংকলনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


নেত্রকোণায় ট্রেন দুর্ঘটনায় নিহত ১