ফিরল তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও গণভোট

সাইদুর রহমান রুমী

ফিরল তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও গণভোট

নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ও গণভোটের বিধান ফিরছে সংবিধানে। গতকাল বৃহস্পতিবার তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ও গণভোট সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে হাইকোর্টের দেওয়া রায় বহাল রাখে আপিল বিভাগ। এ রায়কে ঐতিহাসিক ও দেশবাসীর প্রত্যাশা পূরণের অনন্য দলিল হিসেবে উল্লেখ করেছেন সরকারের নীতিনির্ধারকসহ রাজনীতিবিদ ও আইনজীবীরা।

রায়ের পর আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান সাংবাদিকদের বলেন, এ রায়ের মাধ্যমে দেশে ফ্যাসিবাদ ফিরে আসার পথ রুদ্ধ হলো। সংবিধানে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ও গণভোটের বিধান অন্তর্ভুক্ত হবে।

বিজ্ঞাপন

আইনজীবীরা জানান, গ্রহণযোগ্য ও কাঙ্ক্ষিত মানের নির্বাচন আয়োজনের জন্য নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা হচ্ছে সর্বজনস্বীকৃত ব্যবস্থা। এ ব্যবস্থার অধীন নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসে পতিত স্বৈরাচার শেখ হাসিনার সরকার এটিকে বাদ দেওয়ার উদ্যোগ নেয়। তারই প্রত্যক্ষ নির্দেশে বিতর্কিত প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের রায় দেন। অবসরে গিয়ে এমন রায় দেওয়ার ঘটনাকে ইতিহাসের ঘৃণ্য ও জঘন্যতম নজির বলে উল্লেখ করেন আইনজীবীরা। ফ্যাসিস্ট হাসিনার সরকার বহুল বিতর্কিত এ রায়কে পুঁজি করে ২০১১ সালের ৩০ জুন জাতীয় সংসদে একতরফাভাবে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী পাস করে। ওই সংশোধনীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ও গণভোটের বিধান বিলোপসহ সংবিধানের ৫৪টি অনুচ্ছেদ ও উপঅনুচ্ছেদে পরিবর্তন আনে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার বিপ্লবের মুখে স্বৈরাচার আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ও হাসিনার পলায়নের পর সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রিট করা হয়। ওই রিটের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট পুনরায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা এবং গণভোটের বিধান সংবিধানে পুনর্বহালের আদেশ দেয়। গতকাল প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বে চার বিচারপতির ফুল আপিল বেঞ্চ হাইকোর্টের রায় বহাল রেখে রায় দেয়।

স্বৈরাচারের ফেরার পথ রুদ্ধ হলো

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন অনুষ্ঠিত হবে উল্লেখ করে রায়ের পর আইনমন্ত্রী বলেন, ‘ইনশাল্লাহ। এটা আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গীকার। এটা বিএনপির দীর্ঘ ১৬ বছরের আন্দোলনের ফসল। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ‘দেশ বাঁচাও মানুষ বাঁচাও’ সংগ্রামের মূল লক্ষ্য ছিল, মানুষ যেন তার নিজের ভোট নিজে দিতে পারে।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে দেশের গণতন্ত্রের কবর রচনা করে ফ্যাসিবাদের নীলনকশা তৈরি করা হয়েছিল। আমরা শুরু থেকেই বলেছিলাম, বিতর্কিত বিচারপতি খায়রুল হকের এ-সংক্রান্ত রায় ছিল সংবিধানপরিপন্থী। হাইকোর্ট বিভাগ ওই সংশোধনীর কিছু বিষয় অবৈধ ঘোষণা করেছে এবং বাকি বিষয়গুলো জাতীয় সংসদের সিদ্ধান্তের ওপর ছেড়ে দিয়েছে। আপিল বিভাগও হাইকোর্টের রায় বহাল রেখেছে। আমরা এ রায় ও জুলাই সনদকে সামনে রেখে সংবিধান সংস্কারের উদ্যোগ নেব।

তিনি বলেন, রায়ে যে ৫৪টি বিষয়ের উল্লেখ রয়েছে, তার সবকটি আমরা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে অ্যাড্রেস করব। এক্ষেত্রে আমাদের মূল বিবেচ্য বিষয় থাকবে জুলাই সনদ। জুলাই জাতীয় সনদ সামনে রেখে বিষয়টি বাস্তবায়ন করা হবে। দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র, সুশাসন, মানবাধিকার এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিতে যা যা সংশোধন, সংযোজন ও পরিমার্জন প্রয়োজন, সব করা হবে।

জাতীয় সংসদ সিদ্ধান্ত নেবে

অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল সাংবাদিকদের বলেন, পঞ্চদশ সংশোধনী চ্যালেঞ্জ করে যখন রিট করা হয়, তখন হাইকোর্ট চারটি বিষয়ে পর্যবেক্ষণ দিয়েছিল। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে—নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানে ফিরে আসা, গণভোট ফিরে আসা এবং সংবিধানে ৭(ক), ৭(খ) বাতিলের রায় বহাল থাকল। শেষ পর্যন্ত হাইকোর্টের রায়টি বহাল থাকল।

তিনি বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলোপসহ বেশকিছু বিষয়ে পরিবর্তন এনে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী এনেছিল পতিত আওয়ামী লীগ সরকার। সংশোধনীতে সংবিধানে ৫৪টি ক্ষেত্রে পরিবর্তন এসেছিল। অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করলে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান, জাতির পিতা হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বীকৃতির পাশাপাশি সংবিধানে জাতীয় চার মূলনীতি—জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা ফিরিয়ে আনা হয়।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পঞ্চদশ সংশোধনীর পুরো আইন ও আইনের কয়েকটি ধারার বৈধতা নিয়ে ২০২৪ সালে হাইকোর্টে আলাদা দুটি রিট হয়। চূড়ান্ত শুনানি শেষে ২০২৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর হাইকোর্ট রায় দেয়। রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ও গণভোট বাদ দেওয়াসংক্রান্ত ওই সংবিধান আইনের ২০ ও ২১ ধারা বাতিল ঘোষণা করা হয়। ওই দুটিসহ পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের মাধ্যমে সংবিধানে যুক্ত ৭(ক), ৭(খ), ৪৪(২) অনুচ্ছেদ সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও বাতিল ঘোষণা করে হাইকোর্ট।

হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় গত বছরের ৮ জুলাই প্রকাশিত হয়। ওই রায়ের বিরুদ্ধে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারসহ চার বিশিষ্ট ব্যক্তি এবং অন্যরা পৃথক লিভ টু আপিল (আপিল করার অনুমতি চেয়ে আবেদন) করেন।

এরপর আপিল বিভাগ গত বছরের ১৩ নভেম্বর লিভ মঞ্জুর (আপিল করার অনুমতি) করে আদেশ দেয়। এরপর হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে পৃথক তিনটি আপিল করা হয়, যা বৃহস্পতিবার খারিজ হলো।

তিনি বলেন, এ রায়ের ফলে সংবিধানে ফিরল গণভোট ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে আনা বাকি পরিবর্তনগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার এখন জাতীয় সংসদের।

যুগের পরিবর্তনে সংবিধানে পরিবর্তন আনতে হয়

রায়ের প্রতিক্রিয়ায় রিটকারী জামায়াতে ইসলামীর আইনজীবী শিশির মনির বলেন, পঞ্চদশ সংশোধনীর রায়ে হাইকোর্ট চারটি বিষয়কে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছিল, যা আপিল বিভাগে বহাল থাকল। যে বিষয়গুলো অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হয়েছিল, তার মধ্যে ছিল—সংবিধানের কতগুলো বিষয় পরিবর্তন করলে তা হবে সাংবিধানিক রাষ্ট্রদ্রোহিতা, গণভোটের বিধান বাতিল, নিম্ন আদালতকে রিটের ক্ষমতা দেওয়া ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল।

তিনি বলেন, চারটি বিষয়কে অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হলো। এছাড়া বাকি যে বিষয়গুলো ছিল, সেগুলো জাতীয় সংসদের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। সংবিধান কোনো দণ্ডবিধি নয়। কেউ যদি অপরাধ করে, তবে সে অপরাধ ডিটারমিন করবে দণ্ডবিধি। প্রসেস ফলো করবে ফৌজদারি কার্যবিধি। পৃথিবীর কোনো সংবিধানে শাস্তির কথা বলা থাকে না। আর সংবিধান পরিবর্তন করা যাবে না, এটা সঠিক সিদ্ধান্ত নয়। ৫০ বছর পর আমরা কেউই থাকব না, নতুন জেনারেশন আসবে, আন্ডারস্ট্যান্ডিং হবে, এডুকেশন হবে। এজন্য সংবিধানকে বলা হয় লিভিং ডকুমেন্ট। এটিতে সময় ও যুগের সঙ্গে পরিবর্তন আনতে হয়। যদি বলি কোনো পরিবর্তন আনা যাবে না, তার মানে কি এটা বাইবেল? এটা কি কোরআন? আনসার ইজ নো। এজন্য এই পার্টটুকু বাতিল করে দেওয়া হয়েছে ।

রিটকারী সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, পূর্ণাঙ্গ রায় পাওয়ার পর বুঝতে পারব আদালত কোন বিষয়গুলো সংসদের ওপর ছেড়ে দিয়েছে আর কোন কোন বিষয় নিয়ে কী কী পর্যবেক্ষণ দিয়েছে।

আপিলে সুজনের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন আইনজীবী শরীফ ভূঁইয়া, কারিশমা জাহান এবং রিদুয়ানুল করিম। জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেলের পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শিশির মনির। হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ইমরান এ সিদ্দিক। অপর আপিলকারীর পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী এএসএম শাহরিয়ার কবির।

রাষ্ট্রপক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেলের সঙ্গে শুনানিতে ছিলেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হক এবং ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল আবদুল্যাহ আল মাসুদ।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন