আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

ইরান ধ্বংসের পর ট্রাম্পের নিশানায় কিউবা

হাসান আদিল

ইরান ধ্বংসের পর ট্রাম্পের নিশানায় কিউবা

লাতিন আমেরিকা ও পশ্চিম এশিয়াকেন্দ্রিক যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক পররাষ্ট্রনীতি কিউবাকে আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণ, গ্রীনল্যান্ড দখলে অব্যাহত হুমকি এবং ইরানে আগ্রাসনের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ওয়াশিংটনের পরবর্তী বড় লক্ষ্য হতে পারে কিউবা। খবর আলজাজিরা ও এবিসির।

ফ্লোরিডা থেকে সমুদ্রপথে দেড়শ কিলোমিটারের কম দূরত্বে অবস্থিত কিউবা। এই দেশের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনে ট্রাম্প ও তার মিত্ররা গত কয়েক মাস ধরে নিয়মিতই হুমকি-ধামকি দিয়ে আসছেন।

বিজ্ঞাপন

সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার এই বিষয়ে মন্তব্য করেন ট্রাম্প। এদিন হোয়াইট হাউসে যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবল ক্লাব ইন্টার মায়ামিকে আতিথেয়তা দেওয়া হয়।

এ সময় ট্রাম্প তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে কিউবা নিয়ে ‘অসাধারণ কাজ’ করায় ধন্যবাদ দেন। কিউবার দুর্বল অর্থনীতিকে আরো চেপে ধরতে ট্রাম্প প্রশাসন এরই মধ্যে কিউবার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরো কঠোর করেছে।

ট্রাম্প বলেছেন, কিউবায় যা হচ্ছে চমৎকার। আমরা মনে করছি, আগে আমরা প্রথমে এটি (ইরান) শেষ করি। এরপর সেটি সময়ের ব্যাপার হবে।

মার্কিন এই প্রেসিডেন্ট আরো বলেন, আমি কয়েক সপ্তাহ অপেক্ষা করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমি মনে করি, আমরা শিগগির কিউবায় যা ঘটতে যাচ্ছে তা উদযাপন করব।

এরপর ট্রাম্প মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রুবিওর দিকে তাকিয়ে মন্তব্য করেন, তার পরবর্তী মনোযোগ ক্যারিবীয় দেশটির উপর থাকবে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম পলিটিকোকে সাক্ষাৎকারেও ট্রাম্প বলেছিলেন যে, কমিউনিস্ট কিউবান সরকারের পতন হতে চলেছে।

এর আগেও ট্রাম্প কিউবার কমিউনিস্ট সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা হতে পারে বলে ইঙ্গিত দেন। তিনি বলেছেন, ১৯৫৯ সালের বিপ্লবের পর গড়ে ওঠা রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে ভেঙে দিতে তার প্রশাসন কাজ করছে।

এই পরিবর্তনটি আসলে ওয়াশিংটনের একটি বৃহত্তর কৌশলের অংশ। এ কৌশলের অংশ হিসেবে নিষেধাজ্ঞা, অর্থনৈতিক চাপ এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তনকে সমর্থন দেওয়ার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বৈরী হিসেবে বিবেচিত দেশগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়।

গভীর সংকটে কিউবা

কিউবা বছরের পর বছর ধরে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিয়ে সংকটের মধ্যে রয়েছে। মার্কিন বাহিনী ভেনেজুয়েলায় আক্রমণ করে মাদুরোকে অপহরণ করার পর দেশটির জ্বালানি সংকট আরো বৃদ্ধি পায়।

সেই সামরিক অভিযানের পর ট্রাম্প ভেনেজুয়েলা থেকে কিউবায় তেল রপ্তানি বন্ধ করার আদেশ দেন। শুধু তাই নয় ক্যারিবীয় দেশটির কাছে তেল বিক্রি করলে যে কোনো দেশের ওপর শুল্ক আরোপের হুমকি দেন তিনি।

পলিটিকোকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, আমরা তেল, অর্থ, অথবা ভেনেজুয়েলা থেকে আসা সবকিছু বন্ধ করে দিয়েছি। যা ছিল ওই সরকারের চলার একমাত্র উৎস। এখন তারা একটি চুক্তি করতে চায়।

‘তাদের সাহায্য দরকার। আমরা এ বিষয়ে তাদের সঙ্গে কথা বলছি’, যোগ করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে ঘোষণা করেছিল যে, তারা কিউবার কোম্পানিগুলোর কাছে ভেনেজুয়েলার তেল পুনরায় বিক্রি করার লাইসেন্স চাওয়া বেসরকারি কোম্পানিগুলোকে অনুমোদন দেবে। তবে তাদের কিউবার জনগণকে সমর্থন করার শর্ত দেওয়া হয়।

সে সময় আরো জানানো হয়েছিল যে, কিউবার সামরিক বাহিনী বা অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠান আর্থিকভাবে লাভবান হয় এমন তেল বিক্রির অনুমতি দেওয়া হবে না।

কিউবায় জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী ফ্রান্সিসকো পিচনের মতে, দেশটিতে মানবিক পরিস্থিতির অবনতি ঘটার পেছনে ক্রমহ্রাসমান জ্বালানি মজুত দায়ী। এর কারণে কিউবার স্বাস্থ্যসেবা, পানি পরিষেবা এবং খাদ্য বিতরণের ক্ষেত্রে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

জাতিসংঘ জানিয়েছে, গত অক্টোবরে ঘূর্ণিঝড় মেলিসার আঘাতে দুই মিলিয়নেরও বেশি কিউবান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যার ফলে ঘরবাড়ি ধসে পড়েছে, রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং সাত লাখের বেশি মানুষ জরুরি আশ্রয়কেন্দ্রে আটকা পড়েছে।

সংস্থাটি আরো জানায়, কমপক্ষে ৫০ লাখ কিউবান দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা নিয়ে জীবন-যাপন করেন। যাদের চিকিৎসা স্থিতিশীল বিদ্যুৎ সরবরাহের উপর নির্ভরশীল। পানি উত্তোলনও বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। এগুলো এখন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্যান আমেরিকান হেলথ অর্গানাইজেশন এই পরিস্থিতিকে ভয়াবহ সংকট হিসেবে উল্লেখ করেছে। সংস্থাটি বলছে, এটি একটি সামাজিক-অর্থনৈতিক সংকট, যা একসঙ্গে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন দুর্যোগের কারণে আরো তীব্র হয়ে উঠেছে।

স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার বিদ্যুৎ বিভ্রাট ঘটার পর দেশের বিশাল অংশ বিদ্যুৎহীন অবস্থায় ছিল। এই ব্ল্যাকআউটের জন্য দুর্বল বিদ্যুৎ গ্রিড এবং জ্বালানি মজুতের অভাবকে দায়ী করা হয়েছে।

মার্কিন সংবাদ সংস্থা এপি জানিয়েছে, কিউবার রাজধানী হাভানায় প্রতি তিনটি পরিবারের মধ্যে একটি পরিবারের বিদ্যুৎ সংযোগ প্রায়ই বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তবে ৪৩টি হাসপাতাল এবং ১০টি পানির সরবরাহ কেন্দ্র বিদ্যুৎ সংযোগ চালু রয়েছে।

কূটনীতিতেও বিপর্যয়

অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির অবনতি ঘটার পাশাপাশি কিউবা বিদেশেও তীব্র চাপের সম্মুখীন হচ্ছে। স্থানীয় সময় গত বুধবার ইকুয়েডর সেখানে নিযুক্ত কিউবার রাষ্ট্রদূতকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছে। একই সঙ্গে তাকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে দেশ ত্যাগ করতে বলা হয়।

কেন তাকে অবাঞ্ছিত করা হয়েছে সে বিষয়ে ব্যাখ্যা দেয়নি ইকুয়েডর। তবে এর আগে কিউবায় ইকুয়েডরের রাষ্ট্রদূত হোসে মারিয়া বোরজাকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

ইকুয়েডর এবং কিউবা ১৯৬০ সাল থেকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বজায় রেখে আসছিল। তবে এখন পরিস্থিতির এত অবনতি তাদের মধ্যে সম্পর্ককে ঝুঁকির মুখে ফেলে দিয়েছে।

কিউবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্রুনো রদ্রিগেজ সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘এটি কাকতালীয় ঘটনা নয়।’ এর পেছনে মার্কিন চাপ রয়েছে বলে ইঙ্গিত মেলে তার বক্তব্যে।

কিউবার বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক পদক্ষেপ নেওয়া ইকুয়েডরই একমাত্র আঞ্চলিক প্রতিবেশী নয়। স্থানীয় সময় বুধবার ১৬৮ জন কিউবান চিকিৎসা কর্মীকে হন্ডুরাস থেকে বের করে দেওয়া হয়। যারা ২০২৪ সালে হওয়া একটি চুক্তির অধীনে সেখানে কাজ করছিলেন।

বৃহস্পতিবার জ্যামাইকাতেও একই ধরনের একটি চিকিৎসা সহযোগিতা চুক্তির সমাপ্তি ঘটে। মার্কিন সরকারের সঙ্গে আলোচনার পর গুয়াতেমালা এবং বাহামাও ইঙ্গিত দিয়েছে যে, তারা কিউবার সঙ্গে চিকিৎসা সংশ্লিষ্ট চুক্তি বাতিল করার চেষ্টা করবে।

গত মঙ্গলবার কিউবার বিরুদ্ধে ক্ষতিকারক প্রচারণা চালানোর অভিযোগে হাভানায় ১০ জন পানামার নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়। এর ছয়দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রে বাস করা কিউবার ছয় নাগরিককে সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা কিউবার পানিসীমায় এসে দেশটির সীমান্তরক্ষীদের ওপর নির্বিচার গুলি চালিয়েছে।

কিউবাকে কেন্দ্র করে লাতিন আমেরিকায় উত্তেজনার মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আজ শনিবার ফ্লোরিডায় তার অবকাশযাপন কেন্দ্র মার-এ-লাগোতে এ অঞ্চলের ডানপন্থি নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। অতিথিদের মধ্যে থাকবেন ইকুয়েডরের প্রেসিডেন্ট ড্যানিয়েল নোবোয়া, আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট জাভিয়ের মাইলি, চিলির নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হোসে আন্তোনিও কাস্ট এবং এল সালভাদরের প্রেসিডেন্ট নায়েব বুকেলে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...