মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল আতাউল গণি (এমএজি) ওসমানীকে মরণোরত্তর ‘ফিল্ড মার্শাল’ পদে ভূষিত করার দাবি উঠেছে। সোমবার জেনারেল এমএজি ওসমানীর ৪২তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে রাজধানীর রাওয়া ক্লাবের হেলমেট হলে আলোচনা সভা ও দোয়া অনুষ্ঠানে এই দাবি জানানো হয়। অবসরপ্রাপ্ত সশস্ত্রবাহিনী কর্মকর্তাদের সংস্থা রিটায়ার্ড আর্মড ফোর্সেস অফিসার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন (রাওয়া) এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, ‘জেনারেল ওসমানী বাংলাদেশে যে সম্মান পাওয়া উচিত ছিল, সেটি থেকে তিনি বঞ্চিত হয়েছেন। তবে এতে তার কোনো ক্ষতি হয়নি, বরং আমাদের এবং জাতিরই ক্ষতি হয়েছে। জেনারেল ওসমানী স্বাধীনতাযুদ্ধে আমাদের কমান্ডার ইন চিফ ছিলেন এবং আমরা অত্যন্ত ভাগ্যবান যে, তার মতো একজন সর্বাধিনায়ক পেয়েছি।’
তারা আরও বলেন, বাঙালি কোন্দলপ্রিয় জাতি; সামরিক বাহিনী হোক আর বেসামরিক বাহিনী হোক কোন্দলে অভ্যস্ত আমরা। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীনতার যুদ্ধে তেমন কোনো ধরনের কোন্দল দেখা যায়নি। তার একটি প্রধান কারণ হলো কর্নেল ওসমানী ছিলেন সামরিক বাহিনীর প্রধান। তিনি এতই সিনিয়র ছিলেন অন্যদের চাইতে তার ব্যক্তিত্ব, চলাফেরা, জীবনাচরণ সবকিছু এত নিখুঁত ছিল যে, কোনো সেনা কর্মকর্তা বা অন্য কোনো সিভিলিয়ান কারো সাহস হয়নি তার সামনে কোনোরকম বেয়াদবি করার।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মেজর (অব.) হাফিজউদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম বলেন, ‘জেনারেল ওসমানী এই সম্মানটার যোগ্য দাবিদার। এই সম্মানটা পেলে তার গৌরব বাড়বে না, বরং আমরা জাতি হিসেবে সম্মানিত হব। ওসমানী একজন সৈনিক ছিলেন রাজনীতিবিদেরও পথিকৃৎ ছিলেন। তিনি দেখিয়েছেন দেশ যখন বিপথে যায় কীভাবে মেরুদন্ড সোজা রেখে সঠিক কথাটি বলতে হয়।’ তিনি বলেন, আজকে কথা উঠেছে ওসমানীর মতো একজন ব্যক্তিকে আরো ‘এলিভেটেড’ করা উচিত। ফিল্ড মার্শাল র্যাংকে তাকে ভূষিত করা উচিত। আমাদের দুটি প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত ও পাকিস্তান, ইতোমধ্যেই তারা এই র্যাংকে (তাদের সেনাপ্রধানদের) ভূষিত করেছে। কিন্তু তাদের চাইতে কৃতিত্ব অনেক বেশি জেনারেল ওসমানীর। তিনি স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছেন, নতুন একটা দেশ সৃষ্টি করে দিয়েছেন। আমাদের সৈনিকেরা, সাধারণ ছাত্ররা তাদের ত্যাগ-তিতীক্ষার বিনিময়ে আত্মাহুতির বিনিময়ে দেশটা স্বাধীন করেছে। এদেরই ফরমল কমান্ডার ছিলেন ওসমানী। আমি এই দাবিকে (ফিল্ড মার্শালে ভূষিত করা) সর্বান্তকরণে সমর্থন জানাই।
বিএনপির এই জ্যেষ্ঠ নেতা বলেন, ‘জেনারেল ওসমানীর স্বীকৃতির জন্য আর্মড ফোরসেস থেকে একটি চিঠিতে ডিফেন্স মিনিস্টার বা আগামী দিনের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে লিখিতভাবে আবেদন করা উচিত। আমি যদি কেবিনেটে থাকি, বা যেখানেই থাকি ইনশাল্লাহ এটা যাতে সঠিকভাবে মূল্যায়িত হয় সে জন্য আমাদের নেতা তারেক রহমানকে যা যা বলার প্রয়োজন আমি বলব।’
বাংলাদেশের ইতিহাসকে দলীয়করণের প্রসঙ্গে এই বীর মুক্তিযোদ্ধা বলেন, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস স্বাধীনতার অব্যবহিত পর থেকেই বিতর্কিত করা হয়েছে। প্রকৃত তথ্য জনগণকে জানতে দেওয়া হয়নি। আমাদের দেশের রাজনৈতিক নেতারা নিজেদের গুণগান করে, শুনে অভ্যস্ত। অন্য কাউকে কোনো কৃতিত্ব তারা দিতে চায় না। এটা হলো বাংলাদেশের ট্র্যাডিশন। তিনি বলেন, আমরা একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম গণতন্ত্রের জন্য। সেই গণতন্ত্র আজ পর্যন্ত পূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বরং গণতন্ত্র নাই, ছিলই না। সেখানে ’৭৫ সালের জানুয়ারি মাসে একটি একদলীয় শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হলো। জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে।
সদ্য অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনকে দেশের ইতিহাসে সবচাইতে সুষ্ঠু আখ্যা দিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির এই সদস্য বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে জনগণ দেখাল, আমাদের পলিটিশিয়ানদের মধ্যে যত মতদ্বৈততা থাকুক, যত দুর্বলতা থাকুক, যত হীনমন্যতাবোধ থাকুক বাংলাদেশের সাইলেন্ট মেজরিটি তারা অত্যন্ত দেশপ্রেমী। এই নির্বাচন প্রমাণ করে আমাদের কেউ দাবিয়ে রাখতে পারবে না। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অনেক উজ্জ্বল হবে আগামী দিনে।
একতাই আমাদের শক্তি মন্তব্য করে মেজর হাফিজ বলেন, ইনশাআল্লাহ আমাদের সব দ্বিধাদ্বন্দ্ব দূর হয়ে গেছে। আমাদের রাজনীতিবিদরা কখনো যদি দেশকে বিপদে নেওয়ারও চেষ্টা করেন। আমাদের ঐক্যবদ্ধ জনগোষ্ঠী এই দেশের বীর জনতা নিশ্চয়ই তার প্রতিরোধ করবে এবং রাইট ট্র্যাকের উপরে আমাদের দেশ এবং সরকারকে রাখতে সক্ষম হবে।
সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দেওয়ার জন্য এ সময় বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীকে ধন্যবাদ জানান মেজর হাফিজ। তিনি বলেন, আর্মপ ফোরস যদি ডিটারমাইন না থাকত, ডিসিপ্লিন না থাকত, দেশপ্রেমিক না হতো তাহলে বাংলাদেশ ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যেত।
এ সময় একজন কর্মরত আর্মি অফিসারের বক্তব্যের সমর্থন জানিয়ে মেজর হাফিজ বলেন, বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীতে যেন রাজনীতিকরণ না হয় আমিও এটাকে সমর্থন করি। এ সময় দেশের স্বার্থে রাওয়াকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ। স্বাগত বক্তব্য দেন রাওয়ার চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) মোহাম্মদ আবদুল হক। এ ছাড়া বিমানবাহিনীর সাবেক প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) এজি মাহমুদ বক্তব্য দেন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

