পেশিশক্তি, অবৈধ অর্থ আর ধর্মের অপব্যবহারের কারণে আগামী সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়া নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটি বলছে, বাংলাদেশে মবের বিষয়টি শুরু হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের ভেতর থেকে। সরকার পরিচালনার কেন্দ্রস্থল সচিবালয়, সেখানে থেকে কিন্তু মবের উৎপত্তি। সরকার মবকে ক্ষমতায়িত করেছে। মবের কারণে সরকারের নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়েছে। নিয়ন্ত্রণ না করলে এই মব আগামী ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে প্রভাব ফেলবে। অন্তর্বর্তী সরকারের রাষ্ট্র ও আইন সংস্কারের উদ্যোগ নাজুক অবস্থায় রয়েছে।
সোমবার সকালে রাজধানীর ধানমন্ডির মাইডাস সেন্টারে টিআইবি কার্যালয়ে ‘কর্তৃত্ববাদ পতন-পরবর্তী দেড় বছর : প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি’ শীর্ষক একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান।
অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন ও তার আগে সংঘটিত অপরাধ, মানবাধিকার লঙ্ঘনের তদন্ত ও বিচার, সংস্কার, রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক পুনর্গঠন ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, নির্বাচন সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনসংক্রান্ত কার্যক্রম, রাষ্ট্র পরিচালনা, বিভিন্ন খাতে নিয়মিত কার্যক্রম (আর্থিক, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, স্থানীয় সরকারব্যবস্থা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, পরিবেশ, বৈদেশিক কর্মসংস্থান, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক), অনিয়ম-দুর্নীতি প্রতিরোধ ও অর্থ পাচার রোধ নিয়ে গবেষণা করেছে টিআইবি। টিআইবি জানিয়েছে, গুমের ক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর জড়িত সদস্যদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সরকারের দুর্বল অবস্থান লক্ষ করা গেছে।
ইফতেখারুজ্জামান জানান, সংখ্যাগরিষ্ঠদের মতামতকে প্রাধান্য দেওয়ার রীতি বিশ্বব্যাপী প্রচলিত আছে। তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এমনটি হবে কি না, সেটি দেখার বিষয়। গণভোটের রায় ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে গেলে সে ক্ষেত্রে যারা সরকারে যাবে, তাদের সদিচ্ছার ওপর সংস্কার বাস্তবায়ন নির্ভর করবে। বিশেষভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয় আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার বা ‘মব’ প্রবণতা নিয়ে। গণপিটুনিতে মৃত্যুর ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, রাজনীতিবিদ ও আমলাতন্ত্র জুলাই আন্দোলন থেকে কোনো শিক্ষা গ্রহণ করেনি। তারা তাদের স্বার্থ বজায় রাখতে চায়। এ কারণে ঐকমত্য কমিশনে জনগণের কাছে জবাবদিহি সরকারব্যবস্থার জন্য যে পদ্ধতিগুলো উপস্থাপন করা হয়েছিল, প্রতিটি ক্ষেত্রে তাদের আপত্তি ছিল।
টিআইবি জানায়, নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা এবং সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে আলামত নষ্টের অভিযোগ সত্ত্বেও সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় সরকার নিয়ে আসতে পারেনি। গুমের বিচারে ধীরগতির অভিযোগ করেছে। গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ও দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি সত্ত্বেও ১০ জন সেনা কর্মকর্তার বিদেশে পলায়ন রোধের ক্ষেত্রে ব্যর্থতা, গুমে জড়িত আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও সেনা কর্মকর্তাদের একাংশের বিচার শুরু হলেও মূলহোতাদের অনেকেই বিচারের বাইরে রয়েছে। মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় হত্যাকাণ্ডের মামলায় অভিযুক্ত ১৫ জন সেনা কর্মকর্তাকে বৈষম্যমূলক দৃষ্টান্ত স্থাপন করে সেনা কর্তৃত্বাধীন সেনানিবাসের অভ্যন্তরে সাবজেল বা উপকারাগারে রাখা হয়েছে, যা এটিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। ২০২৫ সালে এক হাজার ৭৮৫টি (হত্যা মামলা ৮৩৭টি) মামলা হয়েছে। এর মধ্যে চার্জশিট হয়েছে ১০৬টিতে। যার মধ্যে ৩১টি মামলায় সাবেক সরকারের মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য ১২৮ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন। গণঅভ্যুত্থানে হত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগে পুলিশের বিরুদ্ধে ৭৬১টি মামলা হয়েছে। এসব মামলার আসামি এক হাজার ১৬৮ জন, তাদের মধ্যে ৬১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
টিআইবি আরো জানায়, একটি মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মৃত্যুদণ্ড, রাজসাক্ষী হওয়ায় পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শকের পাঁচ বছরের কারাদণ্ড; আরেকটি মামলায় তিন পুলিশ কর্মকর্তার মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দুটি বেঞ্চে মোট ১২টি মামলা বিচারাধীন, ১০৫ জনের বেশি অভিযুক্ত হয়েছে। গণঅভ্যুত্থানে আহতদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ, সন্তোষজনক চিকিৎসা ও জুলাই গণঅভ্যুত্থান অধিদপ্তর ও জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন কাজের পরিধি নিয়ে প্রশ্ন এবং সমন্বয়ের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। অনুদান দেওয়ার কিছু ক্ষেত্রে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। পাশাপাশি জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর নির্মাণে সরকারি ক্রয় নীতিমালা অনুসরণে ঘাটতি রয়েছে।
টিআইবির গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, গ্রেপ্তার ও রিমান্ডে পুরোনো ধারা বহাল রয়েছে। অযৌক্তিক মামলা, বিনা বিচারে আটক, জামিনযোগ্য মামলায়ও দীর্ঘদিন জামিন না দেওয়া এবং ক্ষেত্রবিশেষে সরকারি প্রভাবের অভিযোগ উঠে এসেছে। এমনকি সাংবাদিক ও পেশাজীবীদের হত্যা মামলায় আসামি করার ঘটনাও ঘটেছে।
টিআইবি জানায়, আসন্ন সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরের ৩৬ দিনে সারা দেশে অন্তত ১৫ জন রাজনৈতিক নেতাকর্মী হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে সহিংসতায় বিএনপির সম্পৃক্ততার সংখ্যা ৫৫০টি, শতাংশের হিসাবে যেটি ৯১.৯ ভাগ। আর আওয়ামী লীগ ১২৪ ঘটনায় (২০.৭ শতাংশ) এবং জামায়াতে ইসলামী ৪৬ ঘটনায় (৭.৭ শতাংশ) সম্পৃক্ত ছিল। এনসিপি জড়িত ছিল ৭ ঘটনায়। ২০২৫ সালে ৪০১টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ১০২ জন নিহত হয়েছেন। একই সময়ে নিখোঁজ হয়েছে এক হাজার ৩৩৩টি আগ্নেয়াস্ত্র। থানা থেকে লুট হওয়া বিপুল পরিমাণ অস্ত্র এখনো উদ্ধার না হওয়া এবং নতুন করে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়ায় সহিংসতার ঝুঁকি আরো বেড়ে গেছে।
টিআইবি জানায়, গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের ৪৮টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন উপাচার্য ও উপ-উপাচার্য নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল ভাগাভাগি করেছে। পাশাপাশি ‘জনতা’র চাপে শিক্ষক নিয়োগ, পদায়ন ও অপসারণের ঘটনা ঘটেছে অহরহ। চাপে পড়ে পাঠ্যপুস্তক সংশোধন ও পরিমার্জন এবং আদিবাসী সংশ্লিষ্ট গ্রাফিতির ছবি মুছে দেওয়ার ঘটনা দেখা গেছে। দেশের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে এখনো দলীয় লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি চলমান। দুটি খাতের সংস্কার এ সরকারের যথাযথ মনোযোগও পায়নি। পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকারকে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের অংশীজনদের সব মতামতকে অগ্রাহ্য করার প্রবণতা বেশি দেখা গেছে।
টিআইবি আরো জানায়, অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যম থেকে ১৮৯ জন সাংবাদিককে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। একই সঙ্গে ৮টি সংবাদপত্রের সম্পাদক ও ১১টি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের বার্তা প্রধানকে বরখাস্ত করা হয়েছে। এছাড়া ২৯ গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পর্যায়ে রদবদল এবং একটি অনলাইন নিউজ পোর্টালের মালিকানায় পরিবর্তন আনা হয়েছে। গণমাধ্যমের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাব তৈরির চেষ্টা থাকলেও মব সহিংসতার মাধ্যমে গণমাধ্যম কার্যালয়গুলোতে চাপ সৃষ্টি, সাংবাদিক, লেখক ও মানবাধিকারকর্মীদের ওপর হামলা ও হয়রানির ঘটনা অব্যাহত রয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে এ সময় আরো উপস্থিত ছিলেন টিআইবির নির্বাহী কমিটির উপদেষ্টা ড. সুমাইয়া খায়ের, পরিচালক (কমিউনিকেশন) মোহাম্মদ তাওহিদুল ইসলাম ও পরিচালক (গবেষণা) মো. বদিউজ্জামান।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

