বৃষ্টির অজুহাতে লাগামহীন নিত্যপণ্যের বাজার

বৃষ্টির অজুহাতে লাগামহীন নিত্যপণ্যের বাজার

টানা বৃষ্টি ও বন্যার প্রভাবে দেশের নিত্যপণ্যের বাজারে অস্থিরতা চলছে। সবজি, মাছ, মুরগি, ডিম থেকে শুরু প্রায় সব পণ্যের দামই বেড়েছে। যার প্রভাব পড়েছে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের জীবনযাত্রায়।

রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, ১০০ টাকার নিচে সবজি পাওয়াই এখন কঠিন। বেগুন বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা কেজিতে, করলা ১২০, ঝিঙা ও চিচিঙ্গা ৮০-১০০, শসা ও গাজর ১০০-১৪০ এবং টমেটো বিক্রি হচ্ছে ১২০-১৬০ টাকায়। তুলনামূলক সস্তায় মিলছে শুধু পেঁপে ৪০ টাকা ও পটল ৬০ টাকা। এক সপ্তাহের ব্যবধানে পেঁয়াজের দামও লাফিয়ে বেড়েছে। কয়েকদিন আগের ৩৫-৪০ টাকার পেঁয়াজ এখন ৫৫-৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

তবে সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে কাঁচামরিচে। এক মাস আগে যে মরিচ ১০০-১২০ টাকায় মিলত, তা এখন দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে ২৬০-৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কারওয়ান বাজারে তুলনামূলক কম দামে মিললেও অভিজাত এলাকার খুচরা বাজারে দাম আরো বেশি।

কারওয়ান বাজারে সবজি কিনতে আসা ক্রেতা নাজমা বেগম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বৃষ্টির অজুহাতে প্রতিদিনই নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছে, ফলে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। সবজি বিক্রেতা শাহানাজ বেগম জানান, সরবরাহ কমে যাওয়া ও চাহিদা বেশি থাকায় আড়ত থেকে বেশি দামে কিনে বিক্রি করতে হচ্ছে; বৃষ্টি না থামলে দাম আরো বাড়তে পারে।

কেরানীগঞ্জ মডেল টাউনের বিক্রেতা এরফান আলী জানান, কৃষকের ক্ষেতে পানি জমে ফসল নষ্ট হওয়ায় সবজির সরবরাহ কমেছে, ফলে পাইকারি বাজারে সরবরাহ কমেছে।

শুধু সবজি নয়, দাম বেড়েছে ডিম, মুরগি ও মাছেরও। ফার্মের মুরগির ডিম ডজনপ্রতি ১৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা কয়েক দিন আগেও ছিল ১২০ টাকা। ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ১৯০-২১০ টাকা কেজিতে, এক সপ্তাহ আগে যা ছিল ১৮০-১৮৫ টাকা। সোনালি মুরগির দাম বেড়ে হয়েছে ৩৩০-৩৫০ টাকা কেজি। গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে ৭৫০-৮০০ টাকা এবং খাসির মাংস ১২৫০ টাকা কেজিতে।

মাছের বাজারও একই চিত্র। সাত দিন আগেও ৩৫০-৩৭০ টাকায় মেলা রুই মাছ এখন ৪০০-৪৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তেলাপিয়া ২৪০-২৬০ টাকা, পাঙাশ ২২০-২৫০ টাকা, চাষের চিংড়ি ৯০০-১২০০ টাকা এবং পাবদা ৪০০-৪৫০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। এক কেজি ওজনের ইলিশ কিনতে এখন গুনতে হচ্ছে ২৪০০-২৬০০ টাকা, যা আগের তুলনায় প্রায় ২০০-৩০০ টাকা বেশি।

নয়াবাজারে পণ্য কিনতে আসা দিনমজুর মাসুদ রানা বলেন, বাজারে ঘুরেও তিনি কী কিনবেন বুঝে উঠতে পারছেন না, কারণ প্রায় সবকিছুরই দাম অনেক বেশি।

ভোক্তা অধিকার সংগঠনগুলো বলছে, বন্যার প্রকৃত প্রভাব বাজারে পড়ার আগেই অস্বাভাবিকভাবে দাম বাড়ানো হয়েছে। কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন বলেন, এক শ্রেণির ব্যবসায়ী দীর্ঘদিন ধরে একই কৌশলে দাম বাড়িয়ে ক্রেতাকে ঠকাচ্ছেন, অথচ সরকারের তরফে কোনো স্থায়ী পদক্ষেপ বা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা নেই।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, বাজারে নিয়মিত অভিযান চলছে এবং অসাধু উপায়ে দাম বাড়ানো ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. জামাল উদ্দিন আমার দেশকে বলেন, টানা বৈরী আবহাওয়ায় সবজিক্ষেত নষ্ট হয়ে গেছে; ফলে সবজির দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গেছে। তবে আবহাওয়া স্বাভাবিক হয়ে নতুন সবজি বাজারে এলে দাম কিছুটা কমতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

শুধু কাঁচাবাজার নয়, নিত্যব্যবহার্য কিছু পণ্যেও দাম বেড়েছে। মুদি ব্যবসায়ী তানজিম উদ্দিন জানান, লাক্স, কেয়া, তিব্বত ও মেরিল সাবানের দাম ১০-২০ টাকা বেড়েছে এবং হুইল ও সার্ফএক্সেল ওয়াশিং পাউডার কেজিতে ২০ থেকে ৩০ টাকা বেড়ে ২২০-২৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে চাল, আটা, তেলসহ প্রধান মুদিপণ্যের বাজার তুলনামূলক স্থিতিশীল আছে। চাঁদপুর রাইস এজেন্সির স্বত্বাধিকারী বাচ্চু মিয়া জানান, চালের পাইকারি বাজারে বস্তায় ৩০-৫০ টাকা বাড়লেও সরবরাহ ঠিক থাকায় বাজার এখনো নিয়ন্ত্রণে আছে। তবে পোলাও চালের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে এখন ২০০ টাকারও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।

সব মিলিয়ে, বন্যা-পরবর্তী সরবরাহ সংকট, অতিবৃষ্টিতে ফসলের ক্ষতি এবং একশ্রেণির ব্যবসায়ীর অসাধু তৎপরতা—এই তিনের মিশেলে সাধারণ ক্রেতার নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে নিত্যপণ্য। বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে আবহাওয়ার উন্নতি ও কার্যকর তদারকির ওপরই নির্ভর করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন