নয়াদিল্লির বিএসএফ সদর দপ্তরে এক চাপা উত্তেজনা। ঘড়ির কাঁটা ধরে ৮ জুন বাংলাদেশ সময় অনুযায়ী যখন ৫৭তম সীমান্ত সম্মেলনের পর্দা উঠল, তখন দুই পক্ষের চোখেই যেন অদৃশ্য স্নায়ুযুদ্ধের আগুন। একদিকে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মুহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী, অন্যদিকে ভারতীয় প্রতিনিধিদলের সেনাপতি বিএসএফ প্রধান প্রবীণ কুমার। এই বৈঠকের প্রেক্ষাপট এমনিতেই ছিল বারুদমাখা। সম্প্রতি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর এক বিস্ফোরক দাবি—প্রায় ৫ হাজার বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীকে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে—এই বৈঠককে এক অন্য মাত্রার থ্রিলারে পরিণত করেছে। চার দিনব্যাপী এই সম্মেলনের শুরুতেই টেবিল চাপড়ে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে বাংলাদেশ।
ভারত থেকে তথাকথিত বাংলাদেশিদের জোরপূর্বক বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর বা ‘পুশইন’-এর চেষ্টার বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ উগড়ে দিয়েছে বিজিবি। বিনা উসকানিতে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ এবং সীমান্তে একের পর এক বাংলাদেশি নাগরিককে হত্যার মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলো তুলে ধরে নয়াদিল্লির মাটিতে কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছে তারা। বিজিবির পক্ষ থেকে অত্যন্ত কড়া ভাষায় মন্তব্য করা হয়েছে, “আমরা ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি সীমান্ত পয়েন্টে এই ধরনের অবৈধ অনুপ্রবেশ ও পুশইন প্রচেষ্টা অত্যন্ত সফলভাবে রুখে দিয়েছি। বিএসএফের হাতে এই ধরনের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না, অবিলম্বে তা পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে।” এই জোরালো তাগিদ যেন সম্মেলনের আবহকে আরো উত্তপ্ত করে তোলে।
তবে ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নয় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীও। বিজিবির এই আক্রমণের পাল্টা জবাব দিতে রণকৌশল সাজিয়েছিলেন বিএসএফ প্রধান প্রবীণ কুমার। বিএসএফের তরফ থেকে সরাসরি আঙুল তোলা হয়েছে ভারতে অনুপ্রবেশ, রাতের অন্ধকারে সীমান্ত এলাকার বেড়া কাটা এবং বিএসএফ জওয়ান ও নিরীহ ভারতীয় নাগরিকদের ওপর হামলার মতো আন্তঃসীমান্ত অপরাধগুলোর দিকে। বিএসএফের পক্ষ থেকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, “সীমান্তে আমাদের জওয়ানদের ওপর হামলা এবং অবৈধ অনুপ্রবেশ আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এক বিরাট হুমকি। বেড়া কাটা বা চোরাচালানের মতো আন্তঃসীমান্ত অপরাধ ঠেকাতে এবং নিজেদের রক্ষার্থে আমাদের জওয়ানরা বাধ্য হয়েই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করে।” দু’পক্ষের এই পাল্টাপাল্টি যুক্তি আর হুঙ্কারে সম্মেলন কক্ষের তাপমাত্রা যেন মুহূর্তেই কয়েক ডিগ্রি বেড়ে যায়।
এই তীব্র বাদানুবাদের মধ্যেও শেষ পর্যন্ত কূটনীতির চেষ্টা বজায় থেকেছে। উত্তেজনার পারদ কিছুটা নামিয়ে উভয় বাহিনী মানবপাচার, মাদক ও অস্ত্র চোরাচালানের মতো অন্ধকার জগতের কারবার রুখতে একযোগে কাজ করার বিষয়ে সম্মত হয়েছে। আন্তর্জাতিক সীমান্তের নিয়ম লঙ্ঘন করে দেড়শ গজের মধ্যে অবৈধ নির্মাণকাজ বন্ধ করার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে টেবিলে। টানটান উত্তেজনার এই মহারণে শেষ পর্যন্ত সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার লক্ষ্যে পারস্পরিক সমন্বয় ও যোগাযোগের ওপর জোর দিয়েছে দুই দেশ। তবে পর্দার আড়ালের এই স্নায়ুযুদ্ধ যে এত সহজেই থামার নয়, তা নয়াদিল্লির এই রুদ্ধদ্বার বৈঠকের পরতে পরতেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
শূন্যরেখা থেকে ১০ জনকে সরিয়ে নিল বিএসএফ
অবশেষে ৭০ ঘণ্টা পর পঞ্চগড় বড়বাড়ি সীমান্তের শূন্যরেখা থেকে ১০ জনকে সরিয়ে নিয়েছে বিএসএফ। পঞ্চগড় সদর উপজেলার হাঁড়িভাসা ইউনিয়নের দক্ষিণ প্রধানপাড়া সীমান্তে নারী ও শিশুসহ ১০ জনকে পুশইনের চেষ্টাকে ঘিরে জটিলতার অবসান হয়েছে। রোববার গভীর রাতে তাদের সেখান থেকে সরিয়ে নেয় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। সোমবার সকালে সীমান্ত এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, যেখানে গত কয়েক দিন ধরে ওই ১০ জন অবস্থান করছিলেন, সেখানে আর কাউকে দেখা যায়নি। আগের মতো বিজিবি ও বিএসএফের অতিরিক্ত সদস্যদের উপস্থিতিও ছিল না। উভয় বাহিনী নিজ নিজ অবস্থান থেকে সরে গেছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, শুক্রবার ভোর থেকে নারী, পুরুষ ও শিশুসহ ১০ জন ব্যক্তি সীমান্ত সংলগ্ন একটি কৃষিজমিতে অবস্থান করছিলেন। বাংলাদেশে পুশইনের চেষ্টাকে ঘিরে তৈরি হওয়া এই পরিস্থিতিতে তারা দীর্ঘ সময় খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবন কাটান। রোদ, বৃষ্টি ও প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেও তাদের জন্য কোনো ধরনের আশ্রয়ের ব্যবস্থা ছিল না।
স্থানীয় বাসিন্দা আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, আমরা বিজিবির সঙ্গে সীমান্ত এলাকায় পাহারা দিচ্ছিলাম। রাত ১২টার দিকে বিএসএফ তাদের সীমান্তের লাইট বন্ধ করে দেয়। পরে রাত প্রায় আড়াইটার দিকে তারা কাঁটাতারের গেট খুলে ওই লোকজনকে সেখান থেকে নিয়ে যায়।
নীলফামারী বিজিবি ৫৬-ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, বিএসএফ আমাদের সঙ্গে কথা বলে রাত আড়াইটার দিকে তাদেরকে সেখান থেকে নিয়ে গেছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


এ বছরও হচ্ছে না স্থানীয় সরকারের তিন নির্বাচন