২০২১ সালের এক তপ্ত দুপুর। সংসারের নিত্যদিনের কেনাকাটা করতে রাজধানীর উত্তরার একটি সুপারশপে ঢুকেছিলেন আনসার আলী। হরেক রকমের ফলের ভিড়ে হঠাৎ তার চোখ আটকে গেল অদ্ভুত আকৃতির একটি আমের ওপর। কৌতূহল নিয়ে হাত বাড়িয়ে নেড়েচেড়ে দেখতেই পাশে এসে দাঁড়ালেন শপের এক কর্মী। মার্জিত স্বরে বললেন, স্যার এটা ব্যানানা ম্যাংগো। দাম প্রতি কেজি মাত্র ৭৫০ টাকা!
দামটা শুনে মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়ালেন আনসার আলী। মধ্যবিত্তের পকেটে যেন এক অদৃশ্য চপেটাঘাত। তবে দমে যাওয়ার পাত্র তিনি নন। সুপার শপে দাঁড়িয়েই মনে মনে এক কঠিন সংকল্প করলেন—এত দাম দিয়ে আম কিনে খাব না। নিজে উৎপাদন করব, তারপর বুক ফুলিয়ে আম খাব!
যেমন ভাবনা, তেমন কাজ। জীবিকার তাগিদে ঢাকায় থাকা আনসার আলী ফিরে গেলেন নিজের শিকড়ে, দিনাজপুরের বিরল উপজেলার পশ্চিম রাজা রামপুর গ্রামে। ২০২২ সালে শুরু হলো তার সে স্বপ্নের যাত্রা। সাড়ে চার বছরের ব্যবধানে সে জেদ আজ বাস্তবে রূপ নিয়েছে। আনসার আলী এখন আর ক্রেতা নন, তিনি একজন সফল আমচাষি ও পুরোদস্তুর কৃষি উদ্যোক্তা।
পাঁচ একরের জমিতে বিশ্বভ্রমণ
বর্তমানে ১৫ বিঘা (পাঁচ একর) জমিতে ডালপালা মেলেছে আনসার আলীর স্বপ্ন। সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হলো, তার বাগানের দুয়েকটি জাত ছাড়া বাকি সবই বিদেশি জাতের আম। এগুলোর নাম যেমন জটিল, তেমনি নজরকাড়া। তার বাগানে ঝুলছে ভিয়েতনামের বিখ্যাত ‘সূর্যের ডিম’ (মিয়াজাকি) ও রেড মিয়াজাকি। ডালজুড়ে আছে অস্ট্রেলিয়ার আর-২ ও ই-২, থাইল্যান্ডের দমকাই, চিনামাই ও কেসোআই এবং আমেরিকার পুষা উরমিন ও রেড পালমার।
জানা যায়, ছেলের নামে গড়া ‘শাহরিয়ার এনাম অ্যাগ্রোফার্ম’-এর সুনাম এখন দেশের সীমানা ছাড়িয়ে গেছে। দেশীয় বাজারে তিনি এসব দুর্লভ আম প্রতি কেজি ২০০ থেকে ২৫০ টাকায় বিক্রি করলেও তার মূল বাজার এখন লন্ডনে। তবে বিদেশের বাজারে আম পাঠানো বেশ ব্যয়বহুল। গাছ থেকে পাড়া ও প্যাকেজিংয়ে খরচ হয় কেজিপ্রতি ৩০০-৩৫০ টাকা আর বিমান ভাড়া দিতে হয় ৫৮০ টাকা। সব মিলিয়ে খরচ দাঁড়ায় ৯০০ টাকার মতো। লন্ডনে এ আম বিক্রি হয় প্রতি কেজি আট পাউন্ডে।
জাতীয় ফল মেলায় এসে তৃপ্তির হাসি হেসে আনসার আলী আমার দেশকে বলেন, আজকের শিশু-কিশোর ও সাধারণ মানুষ রঙিন জিনিস পছন্দ করে। আমার সব আম ফুডগ্রেডেড। দেশি আম পাকার পর দু-তিনদিনের বেশি রাখা যায় না, কিন্তু এ বিদেশি আমগুলো সাত-আটদিন অনায়াসেই রেখে খাওয়া যায়।
কেআইবি চত্বরে ফলের মহোৎসব
রাজধানীর কেআইবি চত্বরে শুরু হয়েছে ১৮ থেকে ২০ জুন তিন দিনব্যাপী জাতীয় ফল মেলা। প্রায় ১০০ স্টলে সাজানো হয়েছে দেশি-বিদেশি ফলের চোখধাঁধানো পসরা। মেলা ঘুরে দেখা গেল উদ্যোক্তা ও ক্রেতাদের মেলবন্ধনের দৃশ্য।
গ্রিন কালচার ও নিরাপদ আম
কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন শিক্ষার্থীর উদ্যোগে গড়ে উঠেছে ‘গ্রিন কালচার’। এর কর্ণধার ওমর ফারুক জানালেন, তারা মূলত রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে আম সংগ্রহ করেন। চাষের শুরু থেকে ফল পাকা পর্যন্ত চলে কঠোর পর্যবেক্ষণ। মাটি ও পানি পরীক্ষা থেকে শুরু করে বিষমুক্ত জৈব বালাইনাশক ব্যবহারে তারা শতভাগ সতর্ক। গাছ থেকে আম পাড়ার অন্তত ১০-১৫ দিন আগে সব ধরনের স্প্রে বন্ধ করে দেওয়া হয়।
আম থেকে আচার ও বিস্কুট
নওগাঁর পোরশা থেকে আসা মোহাম্মদ মাসুদ পারভেজ শোনালেন এক অভিনব গল্প। সাধারণ চাষিরা যেখানে ১৮-২০ বার কীটনাশক দেন, তারা দেন সর্বোচ্চ ১০ বার। আর ঝড়ে বা কোনো কারণে যে আম মাটিতে পড়ে যায়, তা নষ্ট না করে তৈরি করা হয় আমের পিঠা, বিস্কুট, মিষ্টিসহ ১৬ ধরনের জিভে জল আনা আচার!
ব্যানানা ম্যাংগো ও সাম্মামের পুষ্টিগুণ
দিনাজপুরের ‘আহমেদাল্লাহ অ্যাগ্রোফার্ম’-এর মুরাদ শেখ জানালেন, তাদের ১১৮ বিঘা জমির সেরা আকর্ষণ সে ‘ব্যানানা ম্যাংগো’। মেলায় তারা এটি বিক্রি করছেন মাত্র ১৩০ টাকা কেজিতে।
হবিগঞ্জের বদু মিয়া তার স্টলে সাজিয়েছেন ‘সাম্মাম’ ফল। ৭০ দিনে উৎপাদিত তিন থেকে সাড়ে তিন কেজি ওজনের এ ফলটি ডায়াবেটিস রোগীদের ক্লান্তি ও শারীরিক দুর্বলতা দূর করতে দারুণ কার্যকর।
এছাড়া নাটোরে লালপুর থেকে আসা ‘আনশি ফুড’-এর স্টলে মিলছে হাতে ভাজা মুড়ি, খাঁটি ঘি আর আমসত্ত্ব। অন্যদিকে নরসিংদীর হাবিবুর রহমান নিয়ে এসেছেন তার বাগানের কলম্বো লেবু, লটকন এবং বিখ্যাত ‘রাবানের আনারস’ ও সাগর কলা। মতিঝিলের ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম ২০০ টাকায় একডজন কলা আর ১০০ টাকায় একটি আনারস কিনে হেসে বললেন, বিক্রেতার মুখের কথায় বিশ্বাস করে কিনলাম, বাসায় গিয়ে খেয়ে বুঝব আসল জাদুটা কী!
মেলাপ্রাঙ্গণে নিজ স্টলে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) মহাব্যবস্থাপক কৃষিবিদ ড. মোহাম্মদ ইসবাত আমার দেশকে বলেন, দেশি-বিদেশি ১৫০ প্রজাতির চারা উৎপাদন করে আমরা নামমাত্র মূল্যে কৃষকদের দিচ্ছি। আজকের মেলার এ সাফল্য সরকারের সে ইতিবাচক উদ্যোগেরই সুফল।
কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ নিজের দৃঢ়প্রত্যয় ব্যক্ত করে বলেন, বিলুপ্তপ্রায় দেশি জাত ও নতুন বিদেশি জাতের ফল ফিরিয়ে আনতে আমরা কৃষকদের সব ধরনের সহায়তা দিচ্ছি। এ মেলার মূল উদ্দেশ্যই হলো, দেশের মানুষের কাছে এসব পুষ্টিকর ফলের পরিচিতি গড়ে তোলা।
সুপারশপের ৭৫০ টাকার আমের দাম দেখে যে জেদ চেপেছিল আনসার আলীর মনে, আজ তা ছড়িয়ে পড়েছে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়ায়। ফল মেলা যেন কেবল ফলের প্রদর্শনী নয়, এটি আনসার আলীদের মতো হাজারো স্বপ্নবাজ কৃষকের নীরব বিপ্লবের জীবন্ত দলিল।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

