গত ৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ বৃহস্পতিবার লন্ডনের ওয়েস্টমিনিস্টার এলাকায় ওভারসিজ ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউট কার্যালয়ে বৃটেনভিত্তিক থিংক ট্যাংক সংস্থা দ্য ফিউচার ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে “একটি উন্নততর বাংলাদেশের রুপকল্প” শীর্ষক কর্মকৌশল ও নীতি প্রতিবেদনের প্রকাশনা অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। স্থানীয় সময় বিকেল পাঁচটায় আরম্ভ হওয়া এ অনুষ্ঠানে চব্বিশের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী নতুন বাংলাদেশের ভবিষ্যত রুপরেখা হিসেবে তিন শতাধিক পৃষ্ঠার দীর্ঘ এই প্রতিবেদনটি উপস্থাপন ও পর্যালোচনা করা হয়।
লন্ডন-ভিত্তিক দ্য ফিউচার ইনস্টিটিউট একটি অরাজনৈতিক এবং অলাভজনক আন্তর্জাতিক সংস্থা হিসেবে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এবং বিশেষত মুসলিম সমাজের নানা বিষয় নিয়ে গবেষণা, কর্মকৌশল প্রনয়ণ ও পরামর্শমূলক কর্মকান্ড পরিচালনা করে।
ফ্যাসিবাদের পতনের পর নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের পথচলায় দেশটি বর্তমানে একটি যুগসন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, এই কর্ম-ধারণাকে ভিত্তি হিসেবে নিয়ে এবং আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে “ভিশন ফর এ বেটার বাংলাদেশ: এ পলিসি রোডম্যাপ ফর এ নিউ, ডিফারেন্ট গভর্মেন্ট” নামের এ দীর্ঘ পরিকল্পনাপত্রটি লেখা হয়েছে। ছয়টি দেশ থেকে ইনস্টিটিউটের সাথে সংশ্লিষ্ট বিশজনেরও বেশি বিশেষজ্ঞ গবেষক এ প্রতিবেদন রচনার কাজে যৌথভাবে অংশগ্রহণ করে।
ফিউচার ইনস্টিটিউটের উপদেষ্টা পরিষদের সহ-সভাপতি এবং কৃতি ব্রিটিশ আইন-বিশেষজ্ঞ ড. মুহাম্মদ আবদুল আজিজের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই প্রকাশনা অনুষ্ঠানে ইনস্টিটিউটের গবেষণা বিষয়ক পরিচালক রাইয়ান আজমী পরিকল্পনাপত্রটির সারসংক্ষেপ উপস্থাপন করেন।
এই পরিকল্পনাপত্রের উদ্দেশ্য সম্পর্কে তিনি বলেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই একটি দেশে নতুন একটি সরকার নির্বাচনী পরিকল্পনায় তাদের মূল শক্তি ব্যয় করার পর সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে যথার্থ এবং উপযুক্ত পরিকল্পনা ছাড়াই দেশ পরিচালনার প্রাথমিক কাজকর্ম শুরু করে। এর ফলে সংস্কারে বিলম্ব ঘটে এবং পাশাপাশি নীতিমালা সংশ্লিষ্ট শুন্যস্থান পূরণে সরকারের বাইরের অদৃশ্য শক্তিগুলোর প্রভাব বিস্তারের সুযোগ ঘটে। এর ফলে শেষ পর্যন্ত গণতান্ত্রিক দায়বদ্ধতার ক্ষেত্রেও ঘাটতি তৈরি হয়। এ কারণেই বাংলাদেশের নতুন সরকারের জন্য পরামর্শমূলক নীতিমালা হিসেবে এই প্রমাণ-ভিত্তিক পরিকল্পনাপত্রটি প্রনয়ণ করা হয়েছে যেখানে জনগণের আকাঙ্খা এবং অধিকারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হয়েছে।
ইনস্টিটিউটের পক্ষ থেকে উল্লেখ করা হয়, সংস্থাটি প্রত্যাশা করে এই পরিকল্পনাপত্রটি বাংলাদেশের সকল রাজনৈতিক দলের জন্য সহায়ক একটি প্রতিবেদন হিসেবে কাজ করবে। তারা জানান, প্রতিবেদনটি রচনায় এবং ভবিষ্যতের রুপরেখা পরিকল্পনায় বাংলাদেশের জনগণের নিজস্ব সামাজিক মূল্যবোধ এবং ঐতিহ্যকে কেন্দ্রীয় উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
পরিকল্পনাপত্রটিকে মৌলিকভাবে পাঁচটি প্রতিপাদ্যের উপর গঠন করা হয়েছে। এই মূল প্রতিপাদ্যগুলো হলো ন্যায়ভিত্তিক ভারসাম্য ও আস্থার পুনঃপ্রতিষ্ঠা, জাতীয় সমৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় রুপরেখা, কূটনীতি ও প্রতিরক্ষার সমন্বয়ে জাতীয় সার্বভৌমত্বের সুসংহতি, স্থিতিশীল সমাজের লক্ষ্যে অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং অন্তভূক্তিমূলক সংস্কৃতির বিকাশ।
এই পাঁচটি মূল প্রতিপাদ্যের ভিত্তিতে মোট সতেরোটি নির্দিষ্ট বিষয়ে এই প্রতিবেদনে পরিস্কার ভাষায় নীতিমালা, পরিকল্পনা এবং ব্যাখ্যা উপস্থাপন করা হয়েছে। এ বিষয়গুলোর মাঝে আছে দুর্নীতি দমন, প্রশাসনিক সংস্কার, অর্থনৈতিক নীতিমালা, জনসংখ্যা বিষয় নীতিমালা, প্রযুক্তি, কূটনীতি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি এবং খাদ্য নিরাপত্তা, পরিবেশ, পরিবহন ও যোগাযোগ, সংস্কৃতি, নারী অধিকার, গণমাধ্যম সহ আরো বিভিন্ন ক্ষেত্র।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত অতিথিদের পর্যালোচনা পর্বে লন্ডন স্কুল অফ ইকনমিক্স গ্রানথাম রিসার্চ ইনস্টিটিউটের অতিথি অধ্যাপক এবং ওভারসিজ ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউটের উপপরিচালক প্রফেসর হ্যানস পিটার লান্কেস এ প্রতিবেদনটিকে একটি বাস্তবসম্মত, সমন্বিত এবং ব্যবহারিক রুপকল্প হিসেবে অভিহিত করেন। একজন উন্নয়ন-বিষয়ক অর্থনীতিবিদ হিসেবে তিনি বাংলাদেশের জ্বালানী খাতের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেন। এছাড়াও প্রশ্নোত্তর পর্বে তিনি তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত ছড়িয়ে যাওয়া দুর্নীতির প্রতিকারের ক্ষেত্রে ই-গভর্নেন্স পদ্ধতি ব্যবহারের সফলতায় পোল্যান্ড এবং জর্জিয়ার উদাহরণ আলোচনা করেন।
তুরস্কের ক্ষমতাসীন জাস্টিস এন্ড ওয়েলফেয়ার পার্টির সাবেক বৈদেশিক সম্পর্ক বিষয়ক সহ-সভাপতি, প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা এবং ফিউচার ইনস্টিটিউটের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য প্রফেসর ইয়াসিন আকতাই সামাজিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে অনুপ্রেরণামূলক উপাদানের গুরুত্ব প্রসঙ্গে সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবারের তত্ত্বের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, নৈতিক মূল্যবোধের উপস্থিতিহীন রাজনীতি এমন এক অভিজাত শ্রেণী তৈরি করে যারা একটি দেশে সুশাসনের জন্য অন্তরায় হিসেবে সক্রিয়ভাবে কাজ করে। প্রফেসর আকতাই এই প্রয়োজনীয় আঙ্গিকটিতে গুরুত্ব দেয়ার জন্য ফিউচার ইনস্টিটিউটের পরিকল্পনা প্রতিবেদনটির প্রশংসা করেন।
অতিথিদের আলোচনার পর উপস্থিত সকল অভ্যাগতদের অংশগ্রহণে প্রশ্নোত্তর এবং পর্যালোচনা পর্বের মাধ্যমে এই প্রকাশনা অনুষ্ঠান সমাপ্ত হয়। তিনশ দুই পৃষ্ঠার দীর্ঘ এ পরিকল্পনাপত্রটি সবার ডাউনলোড এবং পাঠের সুবিধার্থে সংস্থাটির ওয়েবসাইটে (https://tfiuk.org/news/vision-bd-2026) উন্মুক্ত করে দেয়া হয়েছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

