গুম সংক্রান্ত কমিশনের প্রতিবেদনের বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেছেন, একটি বড় ফাইন্ডিং হলো, অনেক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য এইসব কর্মকাণ্ডে যুক্ত হয়েছেন শুধুমাত্র পদোন্নতি বা পুরস্কারের লোভে—যেমন পিপিএম/বিপিএম পাওয়া, ঢাকায় পোস্টিং পাওয়া ইত্যাদি। অনেকে এই কাজে জড়াতে চাননি, এমনকি কেউ কেউ চিঠি দিয়ে জানান যে তারা এই অপারেশনে থাকতে চান না। এমন দুটি চিঠির উল্লেখও কমিশনের প্রতিবেদন থেকে পাওয়া গেছে।
বুধবার রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন তিনি।
প্রধান উপদেষ্টার কাছে গুম সংক্রান্ত কমিশনের দ্বিতীয় অন্তর্বর্তীকালীন প্রতিবেদন জমার বিষয়ে শফিকুল আলম বলেন, প্রফেসর ইউনুস এই প্রতিবেদন শুনে কয়েকটি দিক নির্দেশনা দেন। তিনি বলেন, যারা গুমের শিকার হয়েছেন, তাদের কাছ থেকে আসুকরণীয় বিষয়ে দ্রুত মতামত নিতে হবে, যাতে আইন মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারে।
তিনি বলেন, আজকের আলোচনার মূল বিষয় ছিল—গুমের পেছনে কারা ছিলেন, কীভাবে ভিকটিমদের নির্যাতন ও হত্যা করা হতো। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফাইন্ডিং হচ্ছে—র্যাবের ইন্টেলিজেন্স ইউনিট এই ঘটনায় প্রধান ভূমিকা রেখেছে।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব বলেন, কমিশনের তথ্যমতে, অনেক ভিকটিমকে নৌকায় করে নির্জন স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়, সেখানে হত্যা করে পেটে সিমেন্ট ভরে নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। কাউকে গুলি করে, কাউকে ইনজেকশন দিয়ে হত্যা করা হয়, আবার কারও মরদেহ বস্তায় ভরে ট্রেনলাইনে ফেলে দেওয়া হয় যাতে ট্রেন চলার সময় তা ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। আবার কাউকে চলন্ত গাড়ির সামনে ফেলে দিয়ে হত্যা করা হয়।
তিনি বলেন, এই সব তথ্য ভিকটিমদের স্বজন ও কিছু পার্পেট্রেটরের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে উপস্থাপন করা হয়েছে। এই ভয়াবহ ঘটনার বিবরণ এতটাই হৃদয়বিদারক যে প্রফেসর ইউনুস বলেছেন, এগুলো সংরক্ষণের জন্য ‘হরর মিউজিয়াম’ স্থাপন করা প্রয়োজন। গণভবনে যে জুলাই গণভূত্থান স্মরণে একটি মিউজিয়াম করা হচ্ছে, সেখানে এসব নৃশংসতার দলিল থাকবে।
একজন সাংবাদিক জানতে চান, যতগুলো অভিযোগ এখন পর্যন্ত জমা পড়েছে, তার মধ্যে র্যাবের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ এসেছে। সেই র্যাব সদস্যরা কি মূলত পুলিশ থেকে নিয়োগপ্রাপ্ত, নাকি বিজিবি বা সেনাবাহিনী থেকে এসেছিলেন?
এই প্রশ্নে প্রেস সচিব বলেন, যেসব অভিযোগ জমা পড়েছে, তার বিশ্লেষণ কমিশন করছে। চূড়ান্ত রিপোর্টে এসব বিষয় বিস্তারিতভাবে থাকবে—কে কোন বাহিনী থেকে এসেছিলেন এবং কীভাবে সংশ্লিষ্ট ছিলেন।
৩০০’র বেশি মানুষ মিসিং। তাদের জীবিত না মৃত—এই বিষয়ে কি সরকার কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে? এরকম প্রশ্নে প্রেস সচিব বলেন, এটি কমিশনের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। কমিশন যেটা করছে—ভিকটিমদের কাছ থেকে তথ্য নিচ্ছে, কিভাবে তাদের অপহরণ করা হয়েছে, কোথায় রাখা হয়েছিল, কিভাবে টর্চার করা হয়েছে এবং কারা এতে জড়িত ছিলেন। সেই তথ্যের ভিত্তিতে সম্ভাব্য অপরাধীদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। র্যাব, পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট বাহিনীর সদস্যদের ইন্টারভিউ নেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, আমরা ইতোমধ্যে কিছু ‘আয়নাঘর’-এর সন্ধান পেয়েছি। কিন্তু ৩০০’র বেশি মিসিং ব্যক্তির বর্তমান অবস্থা—তারা বেঁচে আছেন কি না, কোথায় আছেন, কেউ মারা গেলে তার লাশ কোথায়—এই বিষয়গুলো জানার জন্য আমরা নিরলস চেষ্টা করছি। প্রধান উপদেষ্টা আজকেও বলেছেন, ‘এরা আমাদের ভাই, বোন। তাদের সন্ধান আমরা যেভাবেই হোক পেতেই হবে।’ যতদিন পর্যন্ত শেষ নিখোঁজ ব্যক্তিরও সন্ধান না পাওয়া যায়, ততদিন এই কমিশন কাজ চালিয়ে যাবে।
প্রধান উপদেষ্টা কি কমিশনকে কোনো নির্দিষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন বিচার বিষয়ে এরকম প্রশ্নে প্রেস সচিব বলেন, ‘অবশ্যই, যারা গুমের সঙ্গে জড়িত তাদের বিচার বাংলাদেশের মাটিতেই হবে। এখন পর্যন্ত ১,৮৫০টি কেসের মধ্যে ১,৩৫০টি স্ক্রুটিনাইজ করা হয়েছে। অনুমান করা হচ্ছে, প্রায় সাড়ে তিন হাজার গুম হয়েছে। আমাদের কাজগুলো অনেক সময়সাপেক্ষ এবং ডিটেইলে করতে হচ্ছে। কিন্তু আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ, যারা জড়িত তাদের বিচার হবে।’
৯ জুন প্রধান উপদেষ্টার যুক্তরাজ্য সফর
ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুক প্রধান উপদেষ্টা ইউনুসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন জানিয়ে প্রেস সচিব বলেন, ‘আগামী ৯ থেকে ১৩ জুন পর্যন্ত প্রধান উপদেষ্টা যুক্তরাজ্য সফরে যাচ্ছেন, যেখানে তিনি কিং চার্লস থার্ডের কাছ থেকে ‘হারমোনি অ্যাওয়ার্ড’ গ্রহণ করবেন। এটি একটি সম্মানজনক আন্তর্জাতিক পুরস্কার।
এছাড়া, তিনি প্রাইভেট অডিয়েন্সে কিং চার্লসের সঙ্গে একান্ত বৈঠক করবেন এবং যুক্তরাজ্যের শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গেও বৈঠক হবে। সেই সফরে প্রফেসরের সঙ্গে থাকবেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান আব্দুল মোমেন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

